ইমপা-য় আদৌ কি বদল আসবে? লক্ষ টাকার এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে শুক্রবারও টানাপড়েন অব্যাহত। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই সংগঠনের সভাপতি পিয়া সেনগুপ্তের পদত্যাগ চেয়েছেন বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা। শুক্রবার উভয় পক্ষের বৈঠকের পর পিয়ার সিদ্ধান্ত, ‘‘আদালত আমি এবং আমার কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করলেই পদত্যাগ করব।’’
বুধবার দিনভর চাপানউতরের পর উভয়পক্ষ ঠিক করেছিলেন, শুক্রবার মুখোমুখি বসবেন তাঁরা। সেইমতো এ দিনের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন প্রিয়া সিনেমাহলের মালিক অরিজিৎ দত্ত। এ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পরিবেশক ও হলমালিক শতদীপ সাহা, বিরোধীপক্ষের প্রযোজক রতন সাহা, পীযূষ সাহা, কৃষ্ণ দাগা, মিলন ভৌমিক-সহ ১২ জন সদস্য। পিয়ার পাশে এ দিনও দেখা যায় কমিটির সদস্য বনি সেনগুপ্ত, প্রযোজক বিভাগের চেয়ারম্যান ঋতব্রত ভট্টাচার্য, কমিটির সম্পাদক-সহ ১২ জনকে। মোট ২৪ জন সদস্য দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেন। আলোচনা চলাকালীন বাগ্বিতণ্ডাও শোনা যায়।
বৈঠকশেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের পিয়া বলেন, ‘‘যাঁরা আমাদের বিরোধীপক্ষ বলে দাবি করছেন, আমরা কিন্তু তাঁদের এই পরিচয় দিইনি। ওঁদের দাবি, আমি এবং আমাদের কমিটি অবৈধ। আদালতের উপস্থিতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে আমি এবং আমার কমিটি নির্বাচিত হয়েছি। আমরা তাই আদালতে যাব।’’ ইম্পা সভাপতির আরও দাবি, ‘‘আজকেই আমায় পদত্যাগ করার জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হয়। আদালত যদি আমাকে এবং আমার কমিটিকে অবৈধ ঘোষণা করে, সেই মুহূর্তে পদত্যাগ করব। কমিটি ভেঙে দেব।’’
আরও পড়ুন:
পিয়ার আরও অভিযোগ, ২২ মে সমস্ত সদস্যকে নিয়ে সাধারণ বৈঠক ডাকা হয়েছে। তার আগে পর্যন্ত বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা সংগঠনের অফিসে এসে হুজ্জতি করবেন, এমন হুমকিও নাকি দিয়েছেন। বিরোধীপক্ষের চলনে-বলনে এতটাই ঔদ্ধত্য প্রকাশ পেয়েছে যে, তিনি ক্ষুব্ধ। পিয়া এ কথাও জানাতে ভোলেননি।
পিয়ার আক্ষেপ, তাঁর মাথায় একরাশ অন্যায় অপবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে — তিনি অবৈধ, বহিরাগত ভোটারদের দিয়ে ইমপার ভোট করিয়েছেন; ছবিমুক্তির জন্য অর্থ নিয়েছেন; নিজের ছেলে বনিকে যাঁরা ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ দেবেন, সেই সব প্রযোজককে আইনক্স হল পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এবং ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’ অরূপ ও স্বরূপ বিশ্বাসের সহযোগিতায় সংগঠনকে তৃণমূল কংগ্রেসের আখড়ায় পরিণত করেছেন। অথচ, এখনও পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে আনা কোনও অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি কেউ। এই জায়গা থেকেই পিয়ার দাবি, ‘‘কার্যত ২০২৭ সাল পর্যন্ত আমিই সভাপতি। তাই মিথ্যা অভিযোগ মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করব না।’’
যদি আদালত তাঁকে অবৈধ ঘোষণা না করে এবং বিরোধীপক্ষের করা অভিযোগ সত্য প্রমাণিত না হয়, তা হলে কী করবেন পিয়া? তাঁর সাফ জবাব, ‘‘তা হলে যে ভাবে কাজ করছি, সে ভাবেই কাজ করে যাব। আমার কমিটিও থাকবে।’’ তাঁর পাল্টা অভিযোগ, নির্বাচনের সময় বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা মনোনয়ন না দিলে সেই সমস্যা কি পিয়ার? একই ভাবে তাঁর ছেলে বনিকেও ‘ইলেক্টেড নয়, সিলেক্টেড’ বলে দাবি করেছেন বিরোধী প্রযোজকেরা। বনি জানান, তিনিও নির্বাচনের মাধ্যমেই কমিটিতে যুক্ত হয়েছেন।
পিয়ার পদত্যাগ না করার সিদ্ধান্তে স্পষ্টতই অখুশি বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা। তাঁদের পক্ষ থেকে শতদীপ সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আজকেই পদত্যাগের জন্য তৈরি হয়েছিলেন পিয়াদি। ফের মত বদলে নিলেন। উনি বিষয়টি নিয়ে অযথা জলঘোলা করছেন।’’ তিনি আরও জানান, পিয়া বা তাঁর কমিটির সঙ্গে কোনও ব্যক্তিগত বিরোধ নেই তাঁদের। সংগঠন এবং বাংলা ছবির দুনিয়াকে রাজনীতি এবং দুর্নীতিমুক্ত রাখতেই পিয়ার পদত্যাগ চাইছেন তাঁরা।
শতদীপ সাহা, মিলন ভৌমিক এবং বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা। নিজস্ব চিত্র।
পিয়া বিরোধীপক্ষকে আদালত দেখিয়েছেন। বিরোধীপক্ষ কি আদালতের রায় শোনার অপেক্ষায়? শতদীপ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই পিয়ার বিরুদ্ধে মামলা চলছে আদালতে। তাঁর আরও অভিযোগ, ‘‘অবৈধ আর্থিক লেনদেন ছাড়া আর কোনও কাজই করেননি পিয়াদি এবং তাঁর কমিটি। আমার দুটো সিনেমাহল খোলার কথা। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে পিয়াদি ইচ্ছাকৃত ভাবে আমায় ঘোরাচ্ছেন।’’ শতদীপের অভিযোগ, যাঁরা প্রকৃত প্রযোজক, তাঁদের পিয়া ‘একঘরে’ করেছেন স্রেফ নিজের হুকুম, নিজের দাপট বজায় রাখবেন বলে। শতদীপ এ-ও জানান, এ দিন প্রিয়া সিনেমাহলের মালিক অরিজিৎ-ও পিয়াকে সসম্মানে পদত্যাগ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। কারও কথাই শুনছেন না পিয়া।
শতদীপ কথাপ্রসঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, ‘‘পরিবর্তন সর্বত্রই কাম্য। তা হলে ইমপা-তেও সেটা হবে না কেন? কিসের টানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো কিছুতেই ‘গদি’ ছাড়তে চাইছেন না পিয়াদিও?’’ তাই নতুন সভাপতি নিয়ে এখনও কিছু ভাবতে পারেননি বিরোধীপক্ষের প্রযোজকেরা। তবে শতদীপের আশ্বাস, ‘‘আমাদের একবার সুযোগ দিয়ে দেখা হোক। কাজ করতে না পারলে নিজেরাই কমিটি ভেঙে দিয়ে চলে যাব।’’
ইমপা-র ‘হেভিওয়েট’ সদস্য-প্রযোজকেরা কোথায়? কেন একবারও অফিসে আসছেন না শ্রীকান্ত মোহতা, নিসপাল সিংহ রানে, প্রদীপ নন্দী, নীলরতন দত্ত, ফিরদৌসল হাসান, নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো খ্যাতনামী প্রযোজকেরা? তাঁরা কী বলছেন? আনন্দবাজার ডট কম-এর প্রশ্নের জবাবে শতদীপ জানান, সবাই বিরোধীপক্ষের পাশে আছেন। তাঁদের স্বাগত জানিয়েছেন।