Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

কাদম্বরী অবশেষে উদ্ধার পেলেন বটতলার গ্রাস থেকে

১৫ মে ২০১৫ ০০:০১

এই কবিপক্ষের সবচেয়ে মধুর বার্তাটি বয়ে আনল সুমন ঘোষের ছবি ‘কাদম্বরী’।

যখন রবি ও নতুন বৌঠানকে উদ্ঘাটন ও ঔপন্যাসিকতার দোহাই পেড়ে প্রায় শয্যাসঙ্গী করে এনেছে বঙ্গীয় লেখক-প্রকাশককুল, তখন সুমনের এই ছবি— প্রাপ্ত তথ্য ও কল্পনার সুস্থ সন্নিবেশে— জাহাজের জ্বলন্ত ডেকে একক কাসাবিয়াঙ্কার মতো হয়েছে। ইতিহাস ও কল্পনার সংস্রবে এক সূক্ষ্ম লক্ষ্মণরেখা টেনে নিয়েছেন সুমন, কাদম্বরীর আখ্যায়িকাকে বটতলায় গ্রাস হতে দেননি।

ইতিহাসের মানুষ ও সময়কে ধরতে দৃশ্য, ধ্বনি, লিখিত-পঠিত-কথিত শব্দের প্রয়োগ ও বিন্যাস ‘কাদম্বরী’তে; তাতে যেমন গবেষণার ছাপ, তেমনই চলচ্চিত্রায়ণে একটা চেম্বার মিউজিকের মেজাজ। তাঁর ‘চারুলতা’ ছবি (যার কাহিনি ‘নষ্টনীড়’‌য়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ও বৌঠানের সম্পর্কের এক মার্জিত ব্যাখ্যান রেখেছেন বলে মনে করা সম্ভব) নিয়ে বলতে গিয়ে সত্যজিৎ রায় বার বার মোৎজার্টের সঙ্গীতের প্রসঙ্গ এনেছেন। একটা বড় পরিবারের মধ্যে কাদম্বরীর (চারুলতারও) একাকীত্ব ও নির্জনতার সুরটা ধরতে কাহিনিরও একটা সাঙ্গীতিক ওঠা-পড়া, বিস্তারের প্রয়োজন ছিল। ‘কাদম্বরী’তে ‘চারুলতা’র অনুসরণ আছে বললে ভুল হয় না মনে হয়।

Advertisement

‘কাদম্বরী’র শুরু কাদম্বরীর মৃত্যু দিয়ে। সিনেমার মতো (‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’র শুরুই যেমন লরেন্সের মৃত্যু দিয়ে) এটা উপন্যাসেরও টেকনিক। ১৮৮৪-র ১৯ এপ্রিল কাদম্বরী অধিকমাত্রায় আফিম খেয়ে আত্মহত্যা করেন। সম্ভবত ২০ বা ২১ এপ্রিল প্রত্যুষে তিনি প্রয়াত হন।

এই মৃত্যু নিয়ে ‘জীবনস্মৃতি’তে ‘মত্যুশোক’ অধ্যায়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘‘ইতিপূর্বে মৃত্যুকে আমি কোনও দিন প্রত্যক্ষ করি নাই। কিন্তু আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয়।’’

এই ‘স্থায়ী পরিচয়’‌য়ের আগের ক’টা বছরের টুকরো টুকরো উপাখ্যান নিয়েই ‘কাদম্বরী’ ছবি। আর টুকরো টুকরো প্রণয়ের ছোঁয়া, রাগ-অনুরাগ ও অভিমান দিয়েই কাদম্বরী মানুষটিও গড়া। যে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’ উপন্যাসে নির্ভর করেছেন সুমন, তিনি লিখছেন, ‘নতুন বউঠানের অভিমান অতি সাঙ্ঘাতিক। এই অভিমানে তিনি চেঁচামেচি করেন না, কাঁদেন না, তাঁর বিযাদে মগ্ন হয়ে যান। সেই সময় তিনি কথা বলতে চান না কিছুতেই। কিছু দিন আগে এই রকম এক অভিমানের সময় নতুন বউঠান আত্মহত্যা করতে গিয়েছিলেন।’

কঙ্কনা সেনশর্মার মতো এক অতি অসাধারণ অভিনেত্রীকে দিয়ে এই অভিমানী কাদম্বরীকে চিত্রিত করার চেষ্টা করেছেন সুমন। রবি ও বৌঠানের মধ্যেকার কথা, চাল ও চলন কী হতে পারে, তা তো এখন লাখকোটি টাকার প্রশ্ন। এবং সেখানেও সেরা রেফারেন্স ‘নষ্টনীড়’ কাহিনি, ‘চারুলতা’ ছবি ও পাঠক-দর্শকের কল্পনা। নিপুণ ভারসাম্য রেখে মৃত কাদম্বরীর থেকে একটু একটু পিছিয়ে (বলা ভাল এগিয়ে ও পিছিয়ে) একটা পূর্ণ, প্রিয়, রক্তমাংসের কাদম্বরীতে পৌঁছনো গিয়েছে। অন্তত চেষ্টা হয়েছে।



জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে বিবাহ হয়ে নিতান্ত বালিকা বয়সে ঠাকুরবাড়িতে এসে তার বিচিত্রকর্মা স্বামীর সঙ্গে দূরত্ব ক্রমশ কাটিয়ে উঠেছিলেন দেবর রবির সঙ্গে সখ্য ও নৈকট্য দিয়ে। নাট্যরচনা ও অভিনয়, সঙ্গীতচর্চা,‘ভারতী’ প্রকাশ ইত্যাদির পাশাপাশি পাট-নীল ও জাহাজের ব্যবসা নিয়ে তাঁর স্বামী যখন আত্মহারা, তখন নিঃসন্তান কাদম্বরীর বাড়ির তেতলার ছাদে বাগান করা, পশুপাখি পালন করায় নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। মাঝখানে কিছু দিন স্বর্ণকুমারী দেবীর ছোট মেয়েকে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছেন। হঠাৎ করে মেয়েটির মৃত্যুতে সেই খড়ের কুটোটুকুও গেল।

তখন ঠাকুরবাড়ি বলতে কাদম্বরীর রইল শুধু রবি। এই সম্পর্কের গড়ে ওঠা নিয়েই ‘কাদম্বরী’। রবি কবি হয়ে উঠেছেন। আর কাদম্বরী তাঁর তন্নিষ্ঠ শ্রোতা, পাঠিকা, ‘মিউজ’ বা প্রেরণাদাত্রী দেবী। কাদম্বরীর এই প্রেরণাদাত্রী স্বরূপকে মাথায় রেখেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁর উপন্যাসে গঙ্গার ধারে ব্যর্থ বনভোজনের দৃশ্যে রবিকে দিয়ে অস্ফুটে বলিয়েছেন, ‘দেবী, দেবী!’

সুমন তাঁর ছবিতে বর্ষণমুখরিত বনানীতে বৌঠানের আব্দারে রবিকে দিয়ে গাইয়েছেন বিদ্যাপতির বাণী ‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর’। প্লে-ব্যাক করিয়েছেন উস্তাদ রাশিদ খানকে দিয়ে। অপূর্ব। দৃশ্য ও ধ্বনি মিলে এক ভাবের বৃষ্টি, যা এক নতুন জীবনের স্বাদ দেয় কাদম্বরীকে।

কাদম্বরীর জীবনসঙ্গীতে বাদী স্বরের মতো হলেন রবি। তাঁর রাগ-অনুরাগের প্রধান সুর। অথচ সে সুর কেটে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা পদে পদে। জ্ঞানদানন্দিনী, স্বর্ণকুমারীরা সুন্দরী, মার্জিতা এবং জটিল স্বভাবা। রবি সবারই আহ্লাদের পাত্র। কিন্তু তাঁর চোখের মণি কাদম্বরী। মেয়েলিপনা ও কূটকচালিতে ঠাকুরবাড়িও যে বৃহত্তর বঙ্গসমাজ থেকে কিছুই আলাদা নয়, তা সুন্দর ফুটিয়েছেন সুমন। সেখানে তিতাস চৌধুরীর জ্ঞানদানন্দিনী ও সেঁজুতি মুখোপাধ্যায়ের স্বর্ণকুমারী চমৎকার কাজে দিয়েছে।



নায়িকা-প্রধান ছবিটির অন্য দুটি প্রধান চরিত্রই পুরুষ। রবি (পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়), এবং জ্যোতিদাদা (কৌশিক সেন)। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে বাঁধা ছবিটির বহির্গমন হয় (ফ্রঁসোয়া ত্রুফো যে আউটডোরিং-কে বলেছেন ‘ভেন্টিলেশন’) এই দু’জনের সঙ্গী হয়ে কাদম্বরীর নৌকাবিহারে যাওয়া, চন্দননগরে বসবাস করা এবং নাটক দেখতে গিয়ে কর্তার প্রিয় নায়িকা বিনোদিনীকে দেখে ফেলা। কী রকম দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে জীবন কাটে বৌঠানের তার চমৎকার কাউন্টারপয়েন্ট ওই বহির্দৃশ্যগুলো, যা সিনেমাটোগ্রাফার বরুণ মুখোপাধ্যায় তুলেছেন শিল্পীর মতো। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলেও তাঁর ক্যামেরার চলাচল তুলির মতো। শিল্পনির্দেশনায় তন্ময় চক্রবর্তী এবং দৃশ্যের রং নির্মাণে দেবজ্যোতি ঘোষের কাজ চমৎকার। যে কারণে ছবিটির জন্য বিশেষণে আর একটি শব্দ এসে পড়ে— নয়নাভিরাম।

রবি হিসেবে পরমব্রত সত্যিই একটা আবিষ্কার। কাহিনি ও সিনেমার খ্যাতিতে ওকে বেশ একটু নরম, বাক্প্রবণ, কবি-কবি ও বৌঠান-নির্ভর হতে হয়েছে। স্বল্প কিন্তু স্পষ্টবাক, আত্মনিরত রবীন্দ্রনাথ ওই বয়সে কেমন ছিলেন, তা প্রায় স্থির হতে চলেছে ‘চারুলতা’র অমল-সৌমিত্রর দ্বারা। সেটুকু মেনে নিলে ‘কাদম্বরী’ ও ‘চারুলতা’ দুই-ই তো কাল্পনিক— পরমব্রতর রবিকে খুবই গোছানো ও লেটার মার্কস পাওয়ার মতো মনে হবে।

জ্যোতিদাদা হিসেবে কৌশিকের অভিনয় খুবই ভাল। কিন্তু জ্যোতিদাদার অনেক সংলাপই ঠিক বিশ্বাসযোগ্য ঠেকল না যে। অবশ্য উনিও যে ওই বয়সে কেমন, তা-ও তো আমরা জানি না। স্ত্রীর থেকে যে ক্রমশ দূরে সরে যাওয়া তাঁরও একটা ট্র্যাজেডির আভাস, সেটা থাকলে হত না কি?

সঞ্জয় নাগের দেবেন্দ্রনাথকে, শ্রীকান্ত আচার্যের সত্যেন্দ্রনাথের থেকে কমবয়সি লাগল যেন!

সব শেষে হলেও ‘কাদম্বরী’র সবচেয়ে বড় মূলধনের কথা বলি। সঙ্গীত নির্দেশনা। ব্রিলিয়ান্ট! বিশেষ করে উস্তাদ আমজাদ আলি খান-এর অতুলনীয় সরোদবাদন দিয়ে প্রয়োজন মতো ছবিকে ভাসিয়ে দেওয়া। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’-এর পর এত সুন্দর সরোদ বাজতে শুনিনি সিনেমায়। টাইটেল কার্ডের প্রথমাংশেই তো একটা চাঞ্চল্যকর কাণ্ড ঘটিয়েছেন উস্তাদজি। রবিশঙ্করের করা ‘পথের পাঁচালী’ ছবির অবিস্মরণীয় থিম মিউজিকটা সরোদে শুনিয়ে দিয়েছেন। তার পর যখন যে সিকোয়েন্সে সরোদ এসেছে, একটা স্নিগ্ধ আলোড়ন ঘটেছে মনে।

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে কোনও ছবিতে বড় সমস্যাই হয়তো সঙ্গীতায়োজন করা। ‘কাদম্বরী’তে কবির ১৮-১৯ বছর বয়সের রচনাগুলোর ব্যবহার অতি সময়োচিত। শেষ দৃশ্যে বাবুল সুপ্রিয়র কণ্ঠে অতি সুগীত ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’ আমাদের অশ্রুরচনার জন্য ভেসে ওঠে।

সৌমিত্রর ‘কাদম্বরী’ দর্শন

তবে অনেকাংশেই ভাল লেগেছে ‘কাদম্বরী’। খুবই পেশাদারি ছবি। সেটা একটা প্রশংসার জায়গা।

ঠাকুর পরিবারের এই বিষয় নিয়ে পূর্বতন লেখক-লেখিকারা, কথাকারেরা তাঁদের গল্পে, উপন্যাসে এই তিনটি চরিত্রকে যে ভাবে দাঁড় করিয়েছেন তাতে অনেকাংশে অসত্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই ছবিতে সেই অসত্য নেই। সেই তুলনায় রবীন্দ্রনাথ, কাদম্বরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে নিয়ে সুমন ঘোষের ‘কাদম্বরী’ ছবিটি অনেক বেশি মাটি ছুঁয়ে থাকে। বাস্তব মানুষ হিসেবে তাঁদেরকে দেখাবার চেষ্টা করেছে পরিচালক। সব থেকে বড় কথা হিউম্যান কোয়ালিটি আছে ছবিটার। আছে লিরিকাল কোয়ালিটিও। তাতে ছবিতে প্রেমের সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে। সব থেকে বড় কথা এ ছবির ক্যামেরার কাজ অসাধারণ। অসাধারণ সব দৃশ্যবিন্যাস করেছেন সিনেমাটোগ্রাফার বরুণ মুখোপাধ্যায়। এমন সব দৃশ্য রচনা করেছেন যার ফলে ছবিটার ভেতর থেকে লিরিকাল কোয়ালিটি বেরিয়ে এসেছে। ‘কাদম্বরী’ পরিচালক সুমন ঘোষের আগের ছবিগুলো থেকে টেকনিক্যাল দক্ষতায় অনেক বেশি পরিণত।

আনাচে কানাচে

একদিন তিরানব্বই: গত কাল ছিল জন্মদিন। তার আগে মৃণাল সেন উদ্বোধন করলেন
নিজের ছবি মুদ্রিত স্ট্যাম্প। ছবি সৌজন্য: দীপাঞ্জন ঘোষ ও প্রতাপ দাশগুপ্ত।

আরও পড়ুন

Advertisement