E-Paper

শট-এর শেষে এসে জড়িয়ে ধরলেন

কী বিস্তীর্ণ ‘রেঞ্জ’ ছিল তাঁর গলায়! তার সঙ্গে সব রকম গানের ও সুরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উৎসাহ। গজল, ঠুমরি, ‘ক্যাবারে সং’—সবেতেই সমান স্বচ্ছন্দ। বেছে বেছে গাইব, শুধু ‘কমফার্ট জ়োনে’ কাজ করব—এমনটা নয়।

শর্মিলা ঠাকুর

শেষ আপডেট: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৬:৫২
আশা ভোঁসলে।

আশা ভোঁসলে। — ফাইল চিত্র।

‘দিওয়ানা হুয়া বাদল/ শাওন কি ঘটা ছায়ি’—‘কাশ্মীরি কি কলি’ ছবিতে আশা ভোঁসলে-মহম্মদ রফির ‘ডুয়েট’ এই গানটির শুটিং সেরে লেক থেকে সবে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছি। মুম্বইয়ে সেটাই ছিল আমার প্রথম গানের শট। শুধু ডাল লেকেই নয়, নেহরু পার্কেও গানটির শুট হয়। ওই সময় ছবিটির ফ্লোরে (ইনডোর এবং আউটডোর) প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন আশাজি। আমি উঠে এসেছি জল থেকে, বেশ নার্ভাস, বুঝতে পারছি না কেমন হল। উনি এসে প্রথমেই আমায় জড়িয়ে ধরলেন, চিবুকে হাত রেখে আদর করে দিলেন। সেই সঙ্গে প্রভূত প্রশংসা!

তখন আশাজি খ্যাতির মধ্যগগনেই বলা যায়, আমি একেবারেই ‘নিউ কামার’। অনেক পরে বুঝেছি, আমাকে সাহস দিতে, আমার মনের জোর বাড়াতেই সে দিন এত উষ্ণতা দেখিয়েছিলেন উনি। শুধুমাত্র মুখে, ‘ভাল হয়েছে’ বলতে পারতেন বা বড়জোড় করমর্দন করলেই তো চলত, আলিঙ্গন না করলেও পারতেন। সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও তো আগ বাড়িয়ে নতুন কারও সম্পর্কে এতটা উচ্ছ্বাস দেখাতে পারি না। আজ ওঁর চলে যাওয়ার দিনে সেই প্রথম দেখা হওয়ার কথাটাই মনে পড়ছে বার বার। ভাবতে ভাল লাগছে, আলিঙ্গনের সেই গভীর উষ্ণতা আজীবন আমাদের মধ্যে বজায় ছিল।

আমাদের মধ্যে দেখা-সাক্ষাৎ শেষ কয়েক মাস হয়নি ঠিকই, কিন্তু আশাজি নিয়মিত টেক্সট মেসেজ করতেন। হয়তো কোনও টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানে আমায় দেখলেন ইন্টারভিউ দিচ্ছি বা অনেক দিন পর নতুন হিন্দি ছবি করলাম—উনি সঙ্গে সঙ্গে মেসেজ করে জানাতেন। যা ভাল লেগেছে, যা ভাল লাগেনি, সবই জানাতেন মন খুলে। আমার সঙ্গে সম্পর্কে কোনও পর্দা ছিল না ওঁর। আর শুধু আমার নয়, ওঁর স্বভাবেই কোনও জটিলতা ছিল না। সব সময় হাসিখুশি, চারপাশের সকলকে উৎসাহ দেওয়া এবং অসম্ভব এক ‘এনার্জি’র স্রোত ওঁর মধ্যে বয়ে যেতে দেখেছি দশকের পর দশক। আশাজির শ্রোতারাও নিশ্চয়ই মঞ্চে ওঁর অনুষ্ঠানে এবং ওঁর নানা রকমের গানে সেই এনার্জির আঁচ পেয়েছেন।

কী বিস্তীর্ণ ‘রেঞ্জ’ ছিল তাঁর গলায়! তার সঙ্গে সব রকম গানের ও সুরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উৎসাহ। গজল, ঠুমরি, ‘ক্যাবারে সং’—সবেতেই সমান স্বচ্ছন্দ। বেছে বেছে গাইব, শুধু ‘কমফার্ট জ়োনে’ কাজ করব—এমনটা নয়। আমার আর শাম্মীজির ‘অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস’ ছবিতে ওঁর গাওয়া ‘জুবি জুবি জেলাম্বু আ গ্যয়ে শুকরিয়া’ গানটি তো একেবারেই ক্যাবারে ধাঁচের গান। আবার সেই মানুষটিই যখন গাইছেন, ‘দিল চিজ় কেয়া হ্যায় মেরি জান লিজিয়ে’ ‘উমরাও জান’ ছবিতে, চমৎকৃত হয়ে শুনি। এই দুই গানের সময়ের ব্যবধান প্রায় পনেরো বছরের। কিন্তু দক্ষতার হেরফের হয়নি দশকের পর দশক কেটে গেলেও। এতটা বৈচিত্রপূর্ণ গায়নশৈলীর পিছনে ছিল তাঁর নিয়মিত অনুশীলন এবং নিরলস পরিশ্রম। প্রত্যেক দিন রেওয়াজ করতেন, অনুষ্ঠানে ওঠার আগেও রেওয়াজ করে উঠতেন। গাইতেন যখন, কি অনায়াস সেই ভঙ্গি! কিশোর কুমারকেও দেখেছি, তাঁর অবশ্য রেওয়াজের দিকটা কিছু দেখিনি। আসতেন, আসনের মতো করে বসতেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে, গান গাইতেন, প্রায়শই এক টেক-এ ‘ওকে’। টাকা নিয়ে চলে যেতেন! আমরা মজা করে বলতাম, এ তো বেশ ব্যবস্থা! এ দিকে আমরা দিনের পর দিন গলদঘর্ম হয়ে খেটে মরেউপার্জন করছি!

পুরস্কারের অনুষ্ঠানে আশাজির সঙ্গে দেখা হত। সম্ভবত শেষ দেখা হয়েছিল কলকাতাতেই, অন্নু কপূরের কোনও অনুষ্ঠানে। মুম্বইয়ে থাকতেনও ‘প্রভু কুঞ্জে’ আমার বাড়ির কাছে। আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে বরাবরই একটা তুলনার বিষয় রয়েছে লতাজি এবং আশাজিকে নিয়ে। দু’জনেই কিংবদন্তি প্রতিভা। তবে আমার মনে হয়, আশাজির যেমন বৈচিত্রের প্রতি ঝোঁক ছিল, গলায় যেমন লাস্যের আবেদন ছিল, সেটা লতাজির হয় ছিল না, নয়তো উনি চাইতেন না সেটা আনতে। ‘পিয়া তু, অব তু আজা’ গানটিতে যে আবেদন হেলেনের নাচের সঙ্গে স্বরক্ষেপনে ফুটিয়ে তুলেছিলেন আশাজি, যা আজও পুরনো হওয়ার নয়।

আজ অনেক কথা মনে ভিড় করে আসছে। বিষণ্ণ লাগছে। ওঁর প্রাণবন্ত ব্যক্তিত্ব আর অপূর্ব কণ্ঠ আমার সঙ্গে থেকে যাবে। শুধু ওঁর মোবাইল থেকে মেসেজ আর আসবে না।

(অনুলিখন: অগ্নি রায়)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Singer Legend

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy