Advertisement
E-Paper

জেন জ়ি-দের যাপন ও সংস্কৃতিতে তো বিশ্বের ছাপ! তাদের কাছে পৌঁছোতে সঙ্গীতকেও তাল মেলাতে হবে: পূর্বায়ন

পূর্বায়নের বেড়ে ওঠাও একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে, যেখানে তাঁকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শুদ্ধতা ও ব্যাকরণকে সম্মান করতে শেখানো হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সঙ্গীতধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে করতে তিনি উপলব্ধি করেন, সঙ্গীত আসলে শিল্পীর ভাবনার প্রকাশ।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ০৮:৫২
পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায়।

পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায়। ছবি: সংগৃহীত।

শিল্পের মাধ্যমে শিল্পীর মনের ভাব প্রকাশ হতে হবে। প্রয়োজনে সে ক্ষেত্রে ব্যাকরণেও সামান্য বদল আনা যেতে পারে। শাস্ত্রীয় সঙ্গীত নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এমনই জানালেন সেতারবাদক পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায়।

ধ্রুপদী সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রায়ই নিয়মের কিছু কথা বলা হয়। পূর্বায়নের বেড়ে ওঠাও একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবেশে, যেখানে তাঁকে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের শুদ্ধতা ও ব্যাকরণকে সম্মান করতে শেখানো হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সঙ্গীতধারার শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করতে করতে তিনি উপলব্ধি করেন, সঙ্গীত আসলে শিল্পীর ভাবনার প্রকাশ। সম্প্রতি ভৌগোলিক গণ্ডি পেরিয়ে তেমনই একটি কাজ করেছেন পূর্বায়ন। পাঁচ বারের গ্র্যামি পুরস্কারজয়ী গিটারবাদক মার্ক লেটিয়েরির সঙ্গে জুটি বেঁধে প্রকাশিত হয়েছে পূর্বায়নের অ্যালবাম— ‘ফেদার্ড ক্রিয়েচার্স’। ন’টি গানের অ্যালবামে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, জ্যাজ়-ফাঙ্ক, রক এবং আধুনিক ইলেকট্রনিক সাউন্ডের মেলবন্ধন।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীত ও পাশ্চাত্য সঙ্গীতের এই মেলবন্ধন প্রসঙ্গে পূর্বায়ন জানান, সঙ্গীতের বিবর্তন হবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, “আসলে সঙ্গীতও মানুষের ডিএনএ-র মতো। ডিএনএ যেমন বিবর্তিত হয়, সঙ্গীতও সেই ভাবেই এগোতে থাকে। হিন্দুস্থানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতেও পারস্যের প্রভাব রয়েছে বলেই সেতার বাদ্যযন্ত্রটি এসেছে। এই যন্ত্রটি তৈরি করেছিলেন আমির খুসরু। পারস্যের ‘সেহতার’ ও ভারতের বাদ্যযন্ত্র ‘বীণা’র মেলবন্ধনেই তৈরি হয়েছে সেতার।” সারা বিশ্বেই বিভিন্ন ঘরানার মধ্যে সাঙ্গীতিক আদানপ্রদানের মাধ্যমেই সঙ্গীতের বিবর্তন হয় বলে মনে করেন পূর্বায়ন। সঙ্গীতের তথাকথিত নিয়মকানুনে বদল আনার ক্ষেত্রে নমনীয় তিনি। এই প্রসঙ্গেই তিনি আরও বলেন, “ধ্রুপদী সঙ্গীতের নিয়ম ভেঙেই কিন্তু শুরু হয়েছিল জ্যাজ় সঙ্গীতের সফর। আসলে মনের কথা ফুটিয়ে তুলতে হবে। আমার মনের মধ্যে যেমন ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, জাপানের প্রভাব আছে। কারণ, আমি দীর্ঘদিন এই জায়গাগুলিতে থেকেছি। মনের কথা বলতে গেলে নিজেকে তো একটু ভাঙতে হবেই।”

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সঙ্গে নতুন প্রজন্ম আত্মস্থ হতে পারে কি না, এই নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। তাঁরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে কী ভাবে গ্রহণ করছেন, সেই প্রশ্নও ওঠে। পূর্বায়ন মনে করেন, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তাই প্রয়োজন। তাঁর কথায়, “মানুষ যেন যোগ তৈরি করতে পারে সঙ্গীতের সঙ্গে। জেন জ়ি-দের জীবনযাপন ও সংস্কৃতিতে পুরো বিশ্বের ছাপ রয়েছে। তাঁদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে তো তাল মেলাতেই হবে।”

ভারতের মধ্যে কলকাতা, পুণে, মুম্বই, দিল্লি এবং দক্ষিণ ভারতের অনুষ্ঠান করতে বিশেষ ভাবে পছন্দ করেন পূর্বায়ন। তবে বিশ্বের প্রত্যেক স্থানেরই ভিন্ন বিশেষত্ব রয়েছে বলে মনে করেন। সময়, স্থান এই বিষয়গুলিকেও একজন শিল্পীর গুরুত্ব দেওয়া উচিত, জানান পূর্বায়ন। তাঁর কথায়, “আসলে সব কিছুই এখন বাণিজ্য দ্বারা চালিত। কলিযুগে সব কিছুই বাণিজ্য-নির্ভর। মানুষ যোগ তৈরি করতে পারবে, এমন সঙ্গীতই নির্মাণ করতে হবে আমাদের। তার মধ্যেই এমন কিছু করতে হবে, যাতে আমাদের স্বতন্ত্র পরিচয়ও তৈরি হয়।”

রিলের মাধ্যমে সঙ্গীত শোনার প্রবণতা বাড়ছে, এই আলোচনা প্রায়ই উঠে আসে। যেখানে ধৈর্যের সীমা অত্যন্ত কম। এমন মাধ্যমে শোনার অভ্যাস হলে কি দীর্ঘ সময় ধরে কোনও রাগসঙ্গীত শোনার ইচ্ছা থাকে? পূর্বায়ন জানান, তিনি গোটা বিষয়টি খুব ইতিবাচক ভাবে দেখেন। তাঁর কথায়, “রিলের মাধ্যমে কোনও সুপ্ত প্রতিভাও কিন্তু সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মালদহের কোনও শিল্পীর গান সুদূর বিদেশেও পৌঁছে যেতে পারে। এ ভাবেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। যাঁরা মন দিয়ে গান শোনেন, তাঁরা কিন্তু রিল থেকে খোঁজ পেলে পরে ইউটিউব বা স্পটিফাই-তে গিয়ে গান শোনেন। ধৈর্য কমছে মানুষের ঠিকই, কিন্তু দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছোনোও যাচ্ছে।”

সাধারণত বেশিরভাগ শ্রোতারা আজও কণ্ঠশিল্পীকেই সবচেয়ে গুরুত্ব দেন। তাই বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের জন্য শ্রোতাদের সঙ্গে যোগ তৈরি করার পথ কিছুটা ভিন্ন। সেতারবাদক বলেন, “পণ্ডিত রবিশঙ্কর ও অন্য আরও নামী শিল্পীদের জন্য সেতার যন্ত্রটার একটা আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। গানে কথা থাকলে শ্রোতারা সহজে বোঝেন। কিন্তু কথা না থাকলেও সুরেরও আবেগ থাকে। কণ্ঠের সবচেয়ে বেশি নমনীয়তা থাকে। যন্ত্র দিয়ে তাই আবেগকে ফুটিয়ে তুলতে কিছুটা অতিরিক্ত প্রয়াস লাগে। তবে যন্ত্রের যে হেতু কোনও ভাষা নেই, যে কোনও দেশের মানুষের কাছে সহজেই পৌঁছনো যায়।”

শঙ্কর মহাদেবন থেকে কৌশিকী চক্রবর্তীর সঙ্গে বিভিন্ন কাজ করেছেন পূর্বায়ন। বাদ্যযন্ত্রশিল্পী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আসলে দু’রকমের কণ্ঠশিল্পী হন। শঙ্কর মহাদেবন, কৌশিকী-সহ আরও বহু শিল্পী আছেন যাঁরা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু এমন শিল্পীও আছেন যাঁরা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের আজও ‘হ্যান্ডস্‌’ ভাবেন। কণ্ঠশিল্পী যত বড়ই হোন, বাদ্যযন্ত্র ছাড়া মানুষ কি গান শোনেন? বলিউড থেকে শুরু করে দেশ বিদেশের বিখ্যাত গান, বাদ্যযন্ত্র ছাড়া সেগুলি সম্ভবই হত না।”

সঙ্গীতেরও বিবর্তন হয়।

সঙ্গীতেরও বিবর্তন হয়। ছবি: সংগৃহীত।

‘ধুরন্ধর’ থেকে শুরু করে দক্ষিণের বহু ছবির শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ব্যবহার ক্রমশ বেড়েছে। সেখানেও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের মধ্যে নতুনত্বের ছোঁয়া আনা হয়েছে বলে মনে করেন পূর্বায়ন। বর্তমানে বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গীত নিয়েও কথা বলেন তিনি। শিল্পীর কথায়, “সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে একসময় যথেষ্ট রাগসঙ্গীতের ব্যবহার হয়েছে। আসলে বাঙালিদের মধ্যে একটা মিষ্টি ভদ্রতা রয়েছে। সেগুলো চলে গেলে পরিচিতিটাই হারিয়ে যাবে। বাংলা ছবির সবচেয়ে বড় স্বতন্ত্র রয়েছে তার ‘মেলোডি’-তে। সলিল চৌধুরীর সময় থেকে জটিলেশ্বর মুখোপাধ্যায়, প্রত্যেকের গানেই সুর প্রাধান্য পেয়েছে। বর্তমানে যেমন ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত, বিক্রম ঘোষ ও জয় সরকারের সুর খুবই ভাল লাগে। প্রত্যেকেরই রাগসঙ্গীতের তালিম রয়েছে। কিন্তু ওঁদের সৃষ্টিতে সুর প্রাধান্য পায়।”

ধ্রুপদী সঙ্গীত নিয়েই তাঁর কাজ। কিন্তু যা কিছু নতুন, তা অনায়াসে গ্রহণ করতে ভালবাসেন পূর্বায়ন। যে কাজে মেধা ও প্রতিভা রয়েছে, তা উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন বলেও মত তাঁর।

Interview Sitar Player
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy