সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

১৫ অগস্ট বললে আর এক পনেরোই মনে পড়ে

১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট ঢাকার ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে শেখ মুজিবর রহমান এবং তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ ১৬ জনকে হত্যা করে সেনার কতিপয় অফিসার। লিখছেন সেবন্তী ঘোষ

Independence
প্রতীকী চিত্র।

Advertisement

আমি অন্তত এমন একজনকে চিনতাম যিনি এই অগস্টের পনেরো তারিখে অভুক্ত থাকতেন। অরন্ধনের প্রয়োজন ছিল না কারণ মানুষটি ছিলেন পুরুষ ও অকৃতদার। খ্যাতনামা কবি ভাইপোর পরিবারে শেষ জীবনের অনেকটা সময় কাটান তিনি। কবির পরিবার তাঁর এই দুঃখময় বর্জনকে গ্রহণ করেননি কিন্তু দেশভাগে বিপর্যস্ত মানুষটির সমব্যথী ছিলেন। ১৫ আগস্ট দেশের স্বাধীনতার দিন, তাকে যে কেউ কালা দিবস ভাবতে পারে বা পালন করতে পারে, স্বাধীনতার কুড়ি বছর পর নিরাপদ দেশে জন্মানো আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না।

স্বাধীনতা জাতীয়তা দেশাত্মবোধ এ সব আলাদা করে ভাবার মতো পরিপক্বতাও ছিল না। ছোটবেলায় এই দিনটায় দেখতাম, পতাকা উত্তোলন, উদ্দীপ্ত গান আর আলোচনা, বড়দি অমিয়া সেনগুপ্তর ভাষণ দিয়ে শেষ। ওই তো ছুটি হয় অর্ধেক, ক্লাস হয় না! আশপাশ জুড়ে শুচিশুভ্র শ্রদ্ধা আর বেশ পুজো পুজো ভাব। পাশের সরকারি অফিসগুলোয়, কলেজে, বাঘাযতীন ক্লাবে পতাকা উড়লেও ঘরে ঘরে পতাকা ওড়ার ধুম ছিল না। স্বদেশী নামে থিম অনুযায়ী রঙিন খাদি পরার চল ছিল না। এমনিতেই সাদা ধুতির দেখা মিলত পথে-ঘাটে। পনেরোই অগস্টে সাদা শাড়িতে এখনও ভরে থাকে চারপাশ, ধুতি কিন্তু এখন বিরল।

আমার শৈশবের বড়রা তো প্রত্যেকই দেশের পরাধীনতা আর স্বাধীনতা দেখেছেন। ঠাকুমা খুলনা যশোরে তাঁর ‘গাঁধিজি’কে দেখার স্মৃতি উল্লেখ করলে, তাঁর দ্রুত হাটার কথা বলতেন। বাবার পছন্দের গল্প ছিল শৈশবে কার্শিয়াং বাসকালে টয়ট্রেনে সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখার আর কথা বলার স্মৃতি। ঠাকুর্দা বলেছিলেন ইউনিয়ন জ্যাক নামানোর সময় অনেক বাঙালিবাবুর চোখে জল এসেছিল। দীর্ঘকাল পাহাড়ে বাস করা আমার বাবার বাড়ির মতো উদার ছিল না মায়ের বাড়ি। দেশভাগের বলি আমার দিদিমা স্বামী আর অল্পবয়েসী গুটি পাঁচেক সন্তান সহ পরাশ্রয়ে, প্রায় বিনা চিকিৎসায় মারা যান। বরিশালে থাকতে তিনি নাকি অনুশীলন সমিতির সভ্য ছিলেন। লাঠি, ছোরা খেলা, চুল দিয়ে লোহা তোলা এমন সব কসরত জানতেন। মা এখনও পনেরোই অগস্ট পালন করে সেই বহু কষ্টার্জিত স্বাধীনতার স্মৃতিতে। যাতে আক্ষরিক অর্থেই সর্বস্বান্ত হতদরিদ্র অবস্থায় বরিশালের লঞ্চের খোলা ডেকে বসে এসে শিয়ালদহ হয়ে রবীন্দ্র সরোবরের পরিত্যক্ত আর্মি ব্যারাকে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। মায়ের মুখে ব্রতচারীর গান বা সুভাষ বসু ও তাঁর আজাদ হিন্দ ফৌজ, ক্ষুদিরাম, ভগত সিংহ বাঘা যতীনের বীরত্বই ছিল আমার স্বাধীনতা অর্জনের প্রথম পাঠ। গিদ্দাপাহাড়ে শরৎচন্দ্র বসুর বাড়িতে সুভাষের অন্তরীণ অবস্থার স্মৃতিচিহ্ন, পাঙ্খাবাড়ি রোডে শের-এ বাংলা ফজলুল হকের বাড়ি, দার্জিলিং-এ চিত্তরঞ্জন দাশের স্টেপ অ্যাসাইড (যে বাড়িতে ভাওয়াল রাজার বিতর্কিত মৃত্যু হয়)-এমন সব কিছুই ছিল স্বাধীনতা দিবসের স্মৃতিচারণ।

১৫ অগস্ট বললে আর এক পনেরোই মনে পড়ে। ১৯৭৫ সালের পনেরোই অগস্ট ঢাকার ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে বাংলাদেশের জনক শেখ মুজিবর রহমান ও তাঁর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ ষোলো জনকে হত্যা করে সেনাবাহিনীর কতিপয় অফিসার। পৃথিবীর একমাত্র বাংলাভাষি দেশটি চলে যায় সামরিক শাসনে। মুজিবের অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে দেখি মাউন্টব্যাটেনের ভারত ভাগের গল্প। তখন ‘হিন্দুস্তান পাকিস্তান’ ঘোষণা হয়ে গেছে। চলছে শহর ভাগাভাগি। লর্ড মাউন্টব্যাটেনের ইচ্ছা তিনি ভারত ও পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়ে বসবেন। জিন্নাহ রাজি হলেন না। লর্ড ক্ষেপে গিয়ে পাকিস্তানের সর্বনাশ করার চেষ্টা করলেন। মানে পাকিস্তানের প্রাপ্য স্থানগুলি ভারতে ঢুকিয়ে দিলেন। ‘ইংরেজ তখনও ঠিক করে নাই কলকাতা পাকিস্তানে আসবে, না হিন্দুস্তানে থাকবে।’’ এই বইতে আরও চিত্তাকর্ষক ব্যাপার আছে। একজন ইংরেজ গভর্নর হয়ে ঢাকা আসতে রাজি হচ্ছিলেন না, কারণ ঢাকায় খূব গরম আবহাওয়া। তার উত্তরে মাউন্টব্যাটেন যে চিঠি দিয়েছিলেন, তাতে লেখা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানে দুনিয়ার অন্যতম পাহাড়ি শহর, থাকার কষ্ট হবে না। অর্থাৎ দার্জিলিং যাচ্ছিল আর একটু হলেই!

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৪৬ সালে যুক্তরাজ্যের সরকারি অর্থভাণ্ডার নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়কার সদ্য নির্বাচিত লেবার সরকার মনে করে ক্রমে অস্থির হয়ে ওঠা ভারতের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্রিটেনের জনসাধারণের সমর্থন পাওয়া যাবে না। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সাহায্য পাওয়াও দুষ্কর হবে। ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট অ্যাটলি ঘোষণা করেন ১৯৪৮-এর জুনে ব্রিটিশ সরকার পূর্ণ স্বাধীনতা দেবে। ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেন নাকি দাঙ্গা থামাতে অসমর্থ ব্রিটিশ বাহিনীর অক্ষমতার কথা মাথায় রেখে ক্ষমতা হস্তান্তরের তারিখটি সাত মাস এগিয়ে আনেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পণের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির তারিখ ১৫ অগস্ট বাছেন। সরকারি ভাবে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ বাস্তুহারা হন। যার অভিঘাত এখনও চলছে। ১৯২৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয়। কংগ্রেস ভারতীয়দের মধ্যে জাতীয়তাবাদ জাগিয়ে তুলতে আর ব্রিটিশ সরকারকে স্বাধীনতা অনুমোদনে বাধ্য করার জন্য ২৬ জানুয়ারি তারিখটিতে স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হয়। ১৯৩০ থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ২৬ জানুয়ারি তারিখটি কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল। গাঁধিজি মনে করতেন, এই দিনটিতে সভার পাশাপাশি চরকা কাটা ছাড়া অস্পৃশ্যদের সেবা বা হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতির আয়োজন করা দরকার। স্বাধীনতার এমন অর্থই ছিল সেদিনের ভারতের প্রার্থনা।

সারা পৃথিবী জুড়ে কতো রকম টুরিস্ট সার্কিট নতুন করে চালু হয়েছে। কালিম্পং কার্শিয়াং মংপু ঘুম তিনধারিয়া যে সব জায়গায় মনীষীদের স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে, সে সব নিয়ে আর ডুয়ার্সের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নামাঙ্কিত এলাকা বা বক্সা ফোর্ট নিয়ে একটা টুরিস্ট সার্কিট তৈরি হতেই পারে। উত্তরে তো শুধু কাঞ্চনজঙ্ঘা নেই, মানুষ ও তার কীর্তিও আছে। 

অঙ্কন: শেখর রায়

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন