পার্কসার্কাস চার নম্বর ব্রিজের নীচে বস্তির ঝুপড়ি ঘরে থাকে মেয়েটি। বছর তেইশ বয়স। চামড়ার জুতোয় ফিতে লাগানোর কাজ করে। বছর দেড়েক আগে পর্যন্ত ইঞ্জেকশনে মাদক নিয়ে পড়ে থাকত এখানে-সেখানে। একটা ইঞ্জেকশনই তার সঙ্গে ভাগ করে নিত ওই কারখানার আরও কয়েকটি মেয়ে। এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা তাঁদের নিয়ে আসে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ‘ওপিঅয়েড সাবস্টিটিউশন থেরাপি সেন্টার’-এ। ছোট করে যাকে বলা হয় ওএসটি সেন্টার। উদ্দেশ্য, মাদকের অভ্যাস থেকে বার করে তাঁদের এইচআইভি-আক্রান্ত হওয়ার হাত থেকে বাঁচানো।

মাদকের সঙ্গে এইচআইভি-র সম্পর্ক কী? ওএসটি সেন্টারে কী ভাবে ওই কাজ করা হয়?

আসলে মাদক নয়, এইচআইভি-র সম্পর্ক হল মাদক নেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ইঞ্জেকশনের সঙ্গে। ইঞ্জেকশন শরীরের ভিতর ফুটিয়ে মাদক নেওয়া হয়। একই সিরিঞ্জে একাধিক লোক মাদক নিলে এক জনের দেহ থেকে অন্য জনের দেহে সংক্রমণ সহজে ছড়াতে পারে। সেই ভাবে এইচাইভি-ও ছড়ায়। এইচআইভি আক্রান্তদের একটা বড় অংশই হল এই ইঞ্জেকশনের মাধ্যমে মাদক নেওয়া গোষ্ঠীর লোকজন। এঁদেরকে বলা হয় ‘হাই রিস্ক গ্রুপ।’ এঁদের এইচআইভি থেকে বাঁচানোর প্রথম ধাপ হিসাবে ওএসটি সেন্টার থেকে এঁদের প্রত্যেককে আলাদা আলাদা সিরিঞ্জ সরবরাহের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে রোগের সংক্রমণ অনেকটা কমে। প্রাথমিক ভাবে এই প্রক্রিয়ায় তাঁদের খানিকটা নিরাপদ অবস্থানে এনে তারপর এঁদের মাদক ছাড়ানো ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও করে সরকার।

ঠিক এই প্রক্রিয়াতেই পার্কসার্কাসের বস্তির ওই তেইশ বছরের মেয়েটি এখন মাদকের অভ্যাস থেকে মুক্ত। সেইসঙ্গে এইচআইভি হওয়ার আশঙ্কা থেকেও তাঁকে বাঁচানো গিয়েছে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ওএসটি সেন্টারে অন্য কর্মীদের সঙ্গে সেই মেয়েটিও এখন অন্য মাদকাসক্তদের কাউন্সেলিং করেন।


অঙ্কন: অরিজিৎ বসু।

ওএসটি সেন্টার মূলত জাতীয় এডস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা বা ‘ন্যাকো’-র প্রকল্প। এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে এই রকম সাতটি কেন্দ্র রয়েছে। ন্যাশনাল, মুর্শিদাবাদ মেডিক্যাল কলেজ, উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ, দার্জিলিং জেলা হাসপাতাল, কার্সিয়াং হাসপাতাল, মিরিক হাসপাতাল, কালিম্পং হাসপাতাল। সবগুলিতেই ইঞ্জেকশনের সিরিঞ্জ বিতরণ ও ধাপে ধাপে মাদকাসক্তদের মাদক ছাড়িয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে। কিন্তু রাজ্য এডস নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা বা স্যাক্স-এর এক বড়কর্তার কথায়: ‘‘অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ভাল কাজ করছে না। টাকাপয়সাও নয়ছয় করছে। তাই এই পুরো কাজটা রাজ্য সরকার নিজেই পরিচালনা করবে ঠিক করেছে।’’

পাইলট প্রকল্প হিসাবে রাজ্য সরকার বছরখানেক আগে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের ওএসটি সেন্টারটিতে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে সরিয়ে নিজেরা সিরিঞ্জ দেওয়া শুরু করেছিল। স্যাক্স-এর এক কর্তা জানালেন, আলাদা সিরিঞ্জ দেওয়ার পরের ধাপ হল, মাদকাসক্তদের সিরিঞ্জের বদলে ওরাল ড্রাগ নেওয়া অভ্যাস করানো। তার পরের ধাপে তাদের মাদক ছাড়ানোর কাজ হয় এবং উইথড্রয়াল সিম্পটমের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং হয়। শেষ ধাপ হল তাঁদের পুনর্বাসন। এই কাজে মনোচিকিৎসকদের সাহায্য নেওয়া হয়।

ন্যাশনালে ওএসটি সেন্টারটি পাভলভ মানসিক হাসপাতালে অবস্থিত। ফলে সেখানকার মনোচিকিৎসকদের সাহায্য নিয়েছেন স্যাক্সের কর্মীরা। ফলও মিলেছে। ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে পার্কসার্কাসের ওই তরুণীর মতো মোট ৬ জনকে গত এক বছরে মাদক ছাড়ানো গিয়েছে। পরোক্ষ ফল হিসাবে তাঁদের এইচআইভি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা কেটেছে। এখন ওই সেন্টারে কলকাতার ১৮৫ জন মাদকাসক্তের নাম নথিভুক্ত রয়েছে। নিয়মিত সেন্টারে আসছেন ৯১ জন। ন্যাশনালের কাজ পর্যবেক্ষণ করে গিয়ে প্রশংসা করে চিঠি লিখে পাঠিয়েছেন ন্যাকোর কর্তারাও। সারা ভারতে এটিকে মডেল করার কথাও বলেছেন তাঁরা। আপাতত আরও কিছু জীবনকে এইচআইভি থেকে দূরে সরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন কেন্দ্রের কর্মীরা।