ওজন ঝরানোর উদ্যম হঠাৎ করেই থেমে যায় অনেকের মধ্যে, বিশেষ করে যখন তাঁরা আবিষ্কার করেন বেশ কিছুটা ওজন কমার পরে আর কাঁটা নড়ছে না। অথচ রোজ জিমে গিয়ে শারীরচর্চায় ফাঁকি নেই। আবার অনেক সময় দেখা যায় প্রস্থে কমলেও ওজন সে তুলনায় কমেনি। কিছু ক্ষেত্রে আবার একটা বয়সের পরে ওজন কমতে সময় নেয়। বিশেষত চল্লিশোর্ধ্ব মহিলাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা যায়। এ নিয়ে অনাব্যশক চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। শারীরিক গঠন, হরমোনের কারণেও অনেক সময়ে ওজন ধীর গতিতে কমে।
নিয়মিত শারীরচর্চা করলে ফ্যাট মাসলে রূপান্তরিত হয়, মাসলের বৃদ্ধি হয়— এ ক্ষেত্রে দেখা যাবে শরীরের মাপে ইঞ্চি কমছে, কিন্তু ওজন কমছে না। এটি কিন্তু ইতিবাচক দিক। কারণ পেশি তৈরি হতে শুরু করলে ওজন হ্রাসের গতি কমে। ওজন কমানোর অর্থ শরীরের মেদ ঝরানোর সঙ্গে মাংসপেশিও মজবুত করা। যাতে সার্বিক ভাবে সুস্থ থাকা যায়। যাঁরা দ্রুত ১০-১৫ কেজি কমিয়ে ফেলেন, তাঁদের পেটে-হাতে ও শরীরের একাধিক জায়গার চামড়া ঝুলে যায়, এগুলো আসলে লুজ় ফ্যাট।
ফিটনেস বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ ঘোষালের কথায়, “রোজ অনেকটা সময় ধরে লো ইমপ্যাক্ট অ্যারোবিক এক্সারসাইজ় করলে শরীরের ওজন কমে কিন্তু শক্তি বাড়ে না, পেশি মজবুত হয় না। তার জন্য ব্যায়ামের প্রথমেই কার্ডিয়ো নয়। আগে স্ট্রেংথ ট্রেনিং, রেজ়িস্ট্যান্স ট্রেনিং করতে হবে। তার পরে কার্ডিয়ো যেমন সাইক্লিং, ট্রেডমিল ইত্যাদি। স্কোয়াট, ডেডলিফট, গ্লুট ব্রিজ, স্টেপ আপ, ডাম্বল রো, কেটল বেলস... করুন। জিম করছি মানেই বাকি দিনটা শুয়ে-বসে কাটালে চলবে না। তাতে ওজন হ্রাসে বাধা পড়বে, তাই শরীর সচল রাখতে হবে।”
শুধু জিমে গিয়ে শারীরিক কসরত নয়, অতিরিক্ত ওজন হ্রাসের সঙ্গে জড়িয়ে বেশ কিছু বিষয়। তার মধ্যে অন্যতম হল ডায়েট এবং জীবনযাপন। ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে কম খাওয়া বা বেশি খাওয়া নয়, প্রয়োজন ঠিক খাদ্যাভ্যাস। শারীরচর্চার সঙ্গে ডায়েট মেনে না চললে পরিশ্রমের ফল পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। রোজ সময়মতো পুষ্টিকর সুষম খাবার খাওয়ার অভ্যেস করা জরুরি। “ওজন হ্রাসের জন্য ডায়েটে ক্যালরি কমিয়ে প্রোটিন বাড়াতে হবে। রাখতে হবে গুড ফ্যাট এবং খনিজ পদার্থে ভরপুর খাবার। খাওয়াদাওয়ার সময়ও নির্দিষ্ট রাখতে হবে। সকলের শরীর এক নয়, তাই পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিয়ে ডায়েট চার্ট করে নিতে পারলে ভাল,” বললেন অরিজিৎ।
অনেকেই আছেন যাঁরা শারীরচর্চা করলেও পাতে মুখরোচক খাবার চাই। এ ক্ষেত্রে অরিজিতের পরামর্শ, “যাঁরা সারা দিনে চারটে মিল নেন, তাঁরা একটা মিল ভাল করে খেলেন। বাকি তিনটে মিল স্মুদি খেলেন। আর চারটে মিলই খেতে চাইলে প্রতিটি থেকে কিছুটা ক্যালরি কমিয়ে দিয়ে ডায়েট তৈরি করতে হবে।” খেয়াল রাখতে হবে, যে খাবার খাওয়া হচ্ছে তা যেন হজম হয়। অনেকে হয়তো জানেন না তাঁদের দুধ, আটা ইত্যাদি সহ্য হয় না, অথচ খেয়ে যান। খাবার হজম না হলে পেট ফাঁপে, যা ওজন হ্রাসের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। খেয়াল রাখতে হবে গাট হেলথেরও।
প্রথমেই কড়া ডায়েটে নিজেকে না বেঁধে চিনি, ময়দা, ভাজাভুজি জাতীয় খাবার বাদ দিন। দেখবেন তাতে কাজ দেবে। মোটিভেশন পেয়ে গেলে পরবর্তী ধাপে ডায়েট থেকে আরও ক্যালরি কমানোর চেষ্টা করুন।
সুষম খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি শরীরকে আর্দ্র রাখাও জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় কম জল পান করলে শরীর জলশূন্য হয়ে পড়ে। তখন জল বেরিয়ে যাওয়া রোধ করতে শরীরের কোষ ও পেশিগুলো জল ধরে রাখে। শরীরে জল বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবে ওজন কমে না। “যাঁরা যথেষ্ট শারীরচর্চা করেন তাঁদের নুন-চিনির জল বা ইলেক্ট্রোলাইট জাতীয় পানীয়ও খেতে হবে। এতে শরীরে সোডিয়াম, পটাশিয়ামের ভারসাম্য ঠিক থাকে। ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকবে,” বললেন অরিজিৎ।
এর পাশাপাশি জরুরি জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। তার জন্য প্রয়োজন মানসিক শান্তি, পর্যাপ্ত ঘুম। সাত-আট ঘণ্টা ঘুম সকলের জন্য জরুরি। রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকা, মোবাইল দেখা কিন্তু পরোক্ষে ওজনের উপরে প্রভাব ফেলে। ভাল ঘুম হলে সকালে শরীর ঝরঝরে লাগে, ব্যায়ামের সময়ে এনার্জির ঘাটতি হয় না।
ওজন হ্রাস শুধু শারীরচর্চার উপরে নয়, মানসিক স্থিতির উপরেও নির্ভর করে। অশান্ত মন, নিরন্তর নেতিবাচক চিন্তা, হতাশা কর্টিসলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই হরমোন বেড়ে গেলে শরীরের মেটাবলিক রেট কমে যায়। তাই ওজন কমাতে মন ও শরীর দুইয়ের যত্নই প্রয়োজন। তবে সব কিছুর পরেও ওজন না কমলে, চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)