E-Paper

ওষুধ নাকি সংস্থার ছাপ

জেনেরিক মেডিসিনের কার্যকারিতা নিয়ে কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?

কোয়েনা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩১

মধ্যবিত্ত পরিবারে মাসের অধিকাংশ টাকাই খরচ হয় ওষুধপত্রের পিছনে। ডায়াবিটিস, হৃদ্‌রোগ, রক্তচাপের ওষুধ... হিসেবের টাকায় সংসার চালিয়ে সেখানে প্রতি মাসে ওষুধের খরচ জোগানোই দুশ্চিন্তার। সে ক্ষেত্রে নামী-দামি ব্র্যান্ডের ওষুধের বদলে, জেনেরিক ওষুধ খরচ বাঁচায় অনেকটাই।

পাড়ার মোড়ে মোড়ে এখন জেনেরিক ওষুধের দোকান তৈরি হচ্ছে। প্রেসক্রিপশন হাতে সেখানে গেলে অনেক সময়েই শোনা যায়— “এই একই ওষুধের জেনেরিক ভার্শন আছে, দাম অনেক কম।” প্রস্তাবে সায় দেন না অনেকেই। সংকোচ বোধ করেন, ‘ওষুধটা আদৌ কাজ করবে তো?’, ‘এর কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই তো?’ ইত্যাদি। জেনারেল ফিজ়িশিয়ান সুবীর মণ্ডল বলছেন, “ড্রাগ রেগুলেটরি বোর্ডের তরফ থেকে পরীক্ষা করে তবেই জেনেরিক মেডিসিনকে বাজারে আসার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তাই সে ওষুধ খেয়ে ক্ষতি হবে না, এটুকু ভরসা রাখা যায়।”

জেনেরিক মেডিসিন কী?

কোনও নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের মূল ওষুধের পেটেন্ট শেষ হওয়ার পরে একই সক্রিয় উপাদান, একই ডোজ়, একই রুটে দেওয়া যে ওষুধ বাজারে আসে, তাকে জেনেরিক মেডিসিন বলা হয়। ডা. সৌমিত্র ঘোষ বলছেন, “একটি নতুন ওষুধ আবিষ্কার করলে সংশ্লিষ্ট সংস্থা কিছু বছর সেই ওষুধের উপরে পেটেন্ট পায়। এই সময়ে অন্য কোনও কোম্পানি একই ওষুধ তৈরি করতে পারে না। পেটেন্টের মেয়াদ শেষ হলে অন্যান্য কোম্পানিও সেই একই উপাদান ব্যবহার করে ওষুধ তৈরি করতে পারে— সেটিই জেনেরিক মেডিসিন।” এগুলোকে মূল ব্র্যান্ডেড ওষুধের ‘কপি’ বলা যায়। কিন্তু তার গুণমান, কার্যকারিতা মানদণ্ড মেনে অনুমোদিত হয়। ডা. ঘোষ বলছেন, “স্বাস্থ্যব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান খরচের মধ্যে জেনেরিক মেডিসিন এখন বিশ্ব জুড়েই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে উঠে এসেছে।”

কার্যকারিতা কতটা?

জেনেরিক ওষুধের কার্যকারিতা মূল ওষুধের সমানই হওয়ার কথা। এই ওষুধ বাজারে আনার অনুমোদন পেতে হলে, তা যে শরীরে ব্র্যান্ডেড ওষুধের মতোই কাজ করবে, তার প্রমাণ দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে মূল ওষুধের থেকে এই জেনেরিক ওষুধের রং বা আকৃতি, প্যাকেজিং ইত্যাদি আলাদা হতে পারে। কখনও কখনও সহায়ক উপাদানেরও সামান্য হেরফের থাকে। তবে এই উপাদানগুলি সাধারণত ওষুধের মূল কাজকে প্রভাবিত করে না। তবে এ কথাও ঠিক, জেনেরিক মেডিসিন সকলের ক্ষেত্রে এক ভাবে কাজ করে না। মূল ওষুধের যে ডোজ়ে একজনের কাজ হয়ে যেত, জেনেরিক ওষুধে কখনও কখনও সেই ডোজ়ের পরিবর্তনও প্রয়োজন পড়ে। সে ক্ষেত্রে উপায়?

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত রোগীকে সপ্তাহখানেক ব্র্যান্ডেড ওষুধ দিয়ে শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করানো হয়। তার পরে সমগোত্রীয় জেনেরিক ওষুধ দেওয়া হয় একই সময়ের জন্য। সে ওষুধ খাওয়ার পরে ফের পরীক্ষা করানো হয়। দুই রিপোর্ট মিলিয়ে দেখে তখন জেনেরিক ওষুধের মাত্রার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রয়োজনে তখন ডোজ় একটু বাড়িয়েও দেওয়া হয়। জেনেরিক মেডিসিন অনেক সময়েই সাধারণ ওষুধের তুলনায় একটু ধীরে কাজ করে। কিন্তু চিকিৎসকদের কথায়, এ দেশে অধিকাংশ মানুষই নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির। মাসে নিয়মিত শুধু ওষুধের পিছনে টাকা খরচ করলে হয়তো অন্যান্য সংসার খরচে টান পড়বে। সে ক্ষেত্রে অর্থের অভাবে ওষুধ বন্ধ রাখার চেয়ে জেনেরিক মেডিসিন ভাল। তার ডোজ় সাধারণ ওষুধের চেয়ে একটু বাড়াতে হোক কিংবা একটু ধীরে কাজ করুক, মানুষটা অন্তত সুস্থ থাকবেন। রোগও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

মানসিকতার পার্থক্য

ডা. সুবীর মণ্ডল বলছেন, “ওষুধের কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে রোগীর মানসিক অবস্থার উপরে। আমাদের দেশে বিভিন্ন আর্থিক অবস্থার মানুষ রয়েছেন। তাঁদের মানসিকতাও আলাদা হয়। সাধ্যে কুলোতে কষ্ট হলেও, অনেকেরই কম দামি ওষুধে ভরসা হয় না। তা ডাক্তার যতই আশ্বাস দিক। সে ক্ষেত্রে ওষুধও কিন্তু তখন শরীরে ঠিকঠাক কাজ করে না। আবার অনেকেই ডাক্তার ওষুধ দিয়েছেন, এই ভরসাতেই অর্ধেকটা সুস্থ হয়ে যান। সে ক্ষেত্রে জেনেরিক মেডিসিন হোক কিংবা ব্র্যান্ডেড ওষুধ অনেক দ্রুত কাজ করবে।” সুতরাং রোগীর চাহিদা, সাধ্য, শারীরিক অবস্থা ইত্যাদি বিচার করে জেনেরিক মেডিসিন ও তার ডোজ় নির্ধারণ করা হয়।

দাম এত কম কেন?

কোনও নতুন ওষুধ আবিষ্কারের সময় গবেষণা, তার পরীক্ষানিরীক্ষা ইত্যাদিতে একটি ব্র্যান্ডকে বিপুল টাকা খরচ করতে হয়। মার্কেটিংয়ের জন্যও অনেক খরচ হয়। ডা. সৌমিত্র ঘোষ বলছেন, “কিন্তু জেনেরিক কোম্পানিগুলির সে সব খরচ নেই। বাজারচলতি ওষুধকেই তারা নতুন করে বানাচ্ছে। ফলে ওষুধের মূল্য তারা কম রাখতেই পারে। বাজার ধরতে জেনেরিক কোম্পানিগুলি ব্র্যান্ডেড ওষুধের মতো বড় মাপের মার্কেটিংও করে না। ফলে ওষুধ তৈরির খরচ অনেকটাই কমে যায়। সঙ্গে একই ওষুধ অনেক কোম্পানি তৈরি করায় তাদের নিজেদের প্রয়োজনেই দাম কম রাখা হয়।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে কী?

সাধারণত জেনেরিক মেডিসিনের তেমন অতিরিক্ত কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকে না। তবে অনেক সময়েই অ্যালার্জি, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, পেটের সমস্যা হতে পারে। একই গোত্রের ব্র্যান্ডেড ওষুধের ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। এর মূল কারণ ওষুধে থাকা সক্রিয় উপাদানগুলি, ব্র্যান্ড বা জেনেরিক নয়। সমস্যা আর একটিও রয়েছে— সহায়ক উপাদানগুলি একই হলেও, ওষুধের রং বা তার বাহ্যিক আবরণ আলাদা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সেই রং বা বাহ্যিক আবরণটি অনেকের সহ্য হয় না। তা থেকে অ্যালার্জি হতে পারে।

সতর্কতা প্রয়োজন

জেনেরিক ওষুধ নিরাপদ ঠিকই। তবে খেয়াল রাখবেন চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজের মতো করে আচমকা সে ওষুধ ব্য়বহার শুরু করবেন না। একই উপাদান হলেও ডোজ়ে পার্থক্য হতে পারে। আবার আগে অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা বা অ্যালার্জি থাকলে সব জেনেরিক মেডিসিন এক ভাবে কাজ করবে না। জেনেরিক ওষুধের পরিচয়ে বাজারে নকল ওষুধও অনেক সময়ে চলে আসে। সাধারণ মানুষের পক্ষে নাম শুনে তা বোঝা কঠিন। তাই ওভার দ্য কাউন্টার জেনেরিক মেডিসিন কেনার বদলে বরং ডাক্তারকেই প্রেসক্রাইব করে দিতে বলা ভাল। পরিচিত ও নির্ভরযোগ্য ফার্মেসি বা জনঔষধি ইত্যাদিসরকার অনুমোদিত কেন্দ্র থেকে কিনলে ঝুঁকি কমে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মান নিয়ন্ত্রণে থাকলে জেনেরিক মেডিসিন চিকিৎসার ক্ষেত্রে নিরাপদ, কার্যকর এবং অর্থনৈতিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। চিকিৎসকের পরামর্শ, ঠিক ডোজ় এবং বিশ্বস্ত উৎস— এই তিনটি বিষয় মেনে চললে জেনেরিক ওষুধ অনেক মানুষের চিকিৎসা সহজ করে তুলতে পারে।

মডেল: সায়ন্তনী গুহঠাকুরতা; ছবি: অমিত দাস

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

medicines

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy