ইনসুলিন হল এমন এক হরমোন যা দিবারাত্রি নিজের কাজ যথাযথ ভাবে করে চলেছে বলেই সুস্থ হয়ে বেঁচেবর্তে রয়েছে শরীর।
এই যে দিনভর নানা রকমের মিষ্টি, ময়দাজাত খাবার বা অন্য যে কোনও শর্করা জাতীয় খাবার খাওয়া হয়েই চলেছে, তা ভেঙে শক্তিতে পরিণত করার কাজ করছে ওই ইনসুলিনই। তাতে শরীরের ক্ষতি আটকানো যাচ্ছে বটে, তবে দিনরাত কাজ করতে করতে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমতে থাকছে ধীরে ধীরে। একটা সময়ের পরে শরীর এতটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে ইনসুলিনে, যে আর তাতে কাজ হচ্ছে না কোনও। ফলে শর্করা যথাযথ ভাবে ভাঙছে না। শরীর পাচ্ছে না তার প্রয়োজনীয় শক্তি। খাবার হজম হতেও সমস্যা হচ্ছে। ব্যাহত হচ্ছে সুস্থ থাকার গোটা প্রক্রিয়াটিই। এই যে ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতা কমে যাওয়ার পরিস্থিতি, একেই চিকিৎসার দুনিয়ায় বলা হয় ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স। কারও শরীরে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স হলে নানা রকম রোগ হতে পারে। যার অধিকাংশই দীর্ঘমেয়াদি এবং দীর্ঘস্থায়ী। অনেক ক্ষেত্রে যে রোগের সম্পূর্ণ প্রতিকারও নেই।
সাধারণত শরীরে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হলে টাইপ-২ ডায়াবিটিস বাসা বাঁধে বলে আমজনতার ধারণা। যা নানা রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে দেয়। তবে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্সের ফলে ডায়াবিটিস ছাড়াও আরও বেশ কিছু মারাত্মক রোগে বাসা বাঁধতে পারে শরীরে।
১। হৃদরোগ
ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্সের ফলে রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইডের (ক্ষতিকারক চর্বি) মাত্রা বাড়ে এবং ভাল কোলেস্টেরল-এর মাত্রা কমে যায়। এর ফলে রক্তচাপ উর্ধ্বমুখী হতে শুরু করে, যা থেকে হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোকের মতো মারণ রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
২। ফ্যাটি লিভার
ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি হলে অর্থাৎ ইনসুলিন তার কাজ না করতে পারলে রক্তে ইনসুলিনের মাত্রা বা ঘনত্ব বাড়তে থাকে। এর ফলে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ওই রোগকে বলা হয় ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজ়িজ়’। সঠিক চিকিৎসা না হলে যা থেকে লিভারে প্রদাহ এবং শেষে স্থায়ী ভাবে লিভার ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে।
৩। পিসিওএস
মহিলাদের ক্ষেত্রে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স হরমোনের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট করে দেয়। ফলে ‘পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম’ বা পিসিওএস-এর মতো রোগ দেখা দেয়। অনিয়মিত ঋতুস্রাব, হরমোনের জটিলতা এমনকি, বন্ধ্যত্বের মতো জটিল পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে ওই রোগ থেকে।
৪। মাইগ্রেন
যাঁরা মাইগ্রেনের রোগী, তাঁরাই জানেন এ রোগ কত বড় ‘অভিশাপ’! মাইগ্রেনের অ্যাটাক হলে অনেক সময় ২-৩ দিন পর্যন্ত অসহ্য মাথা ব্যথায় কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন অনেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যথার ওষুধে তার নিরাময় হয় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স থেকে ওই মাইগ্রেনের প্রকোপ এবং তীব্রতা বাড়তে পারে।
৫। স্থূলত্ব ও মারণ রোগের ঝুঁকি
শর্করা ভেঙে শক্তিতে পরিণত করার কাজ ব্যাহত হলে শরীরে মেদ জমতে থাকে। বিশেষ করে পেটের চর্বি বাড়ে। যা শুধু স্থূলত্বের সমস্যা বৃদ্ধি করে না, শরীরে এক ধরনের মৃদু এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি করে, যা ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
কী ভাবে সাবধান হবেন?
শরীরে যাতে ইনসুলিন রেজ়িস্ট্যান্স তৈরি না হয়, তার জন্য জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা সবার আগে দরকার। এর জন্য প্রথমেই চিনি বা ময়দা জাতীয় সিম্পল কার্বোহাইড্রেট খাদ্যতালিকা থেকে বাদ দিতে হবে। প্রতি দিন পর্যাপ্ত ভিটামিন, প্রোটিন এবং ফাইবার যুক্ত খাবার খেতে হবে। সেই সঙ্গে হাঁটাহাঁটির মতো ন্যূনতম কিছু শরীরচর্চার অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত ঘুমও অত্যন্ত জরুরি।