মূত্রনালির সংক্রমণ বা ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে, বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে। এই জন্য স্কুলে ছোট থেকে টয়লেট ব্যবহার শেখানোর কথা বলা হচ্ছে। তবে ইউরিন ইনফেকশন শুধু নীচের ট্র্যাক্টের ইউটিআই-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মূত্রনালি সংক্রমণের একটা ধরন এই পাইলোনেফ্রাইটিস, তবে এর চরিত্র অনেকটা আলাদা।
পাইলোনেফ্রাইটিস থেকে সেরে ওঠা সম্ভব এবং আগাম কিছু পদক্ষেপ এর থেকে সুরক্ষাও নিশ্চিত করা যায়। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হলে কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেকটাই। পাইলোনেফ্রাইটিস থেকে সেরে ওঠার পরে আবার যাতে না হয়, সে ব্যাপারে সচেতন না হলে বারবার হতে পারে এই রোগ, যা বেঁচে থাকার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। পাইলোনেফ্রাইটিসে পুরুষদের চেয়ে মধ্যবয়সি মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার হারই বেশি।
পাইলোনেফ্রাইটিস কী?
পাইলো কথার অর্থ কিডনির ভিতরের একটা অংশ, কিডনির ভিতরে ইউরিন তৈরি হওয়ার জায়গাগুলোকে বলে পাইলো ক্যালিসিয়াল সিস্টেম যেখান থেকে ফিল্টারেশন হয়ে ইউরিন বা মূত্র ইউরেথ্রা বা মূত্রনালির মধ্য দিয়ে নীচের দিকে নেমে এসে ব্লাডারে জমে। ব্লাডার ভরে গেলে মূত্র নির্গত হওয়ার জন্য বেগ আসে। এই হল স্বাভাবিক অবস্থা। অস্বাভাবিকতা শুরু হয় ব্লাডারে সংক্রমণ হলে। তখন মূত্র নির্গত হয় ঘনঘন। এটি ইউটিআই-এর চেনা লক্ষণ। কিন্তু পাইলোনেফ্রাইটিসের ক্ষেত্রে এই উপসর্গ না-ও থাকতে পারে। নেফ্রোলজিস্ট ডা. অর্পিতা রায়চৌধুরী বললেন, ‘‘পাইলোনেফ্রাইটিসের সমস্যা নীচের ট্র্যাক্টে নয়, হয় উপরে। এই সংক্রমণ ব্লাডারে সীমাবদ্ধ না থেকে ইউরেথ্রারের মাধ্যমে উল্টো পথে বয়ে গিয়ে কিডনিকে আক্রান্ত করে। পাইলোনেফ্রাইটিস যাতে না হয়, তার জন্য বিভিন্ন মেকানিজ়ম আছে শরীরে। বয়সজনিত কারণে সেই মেকানিজ়ম অনেকের ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার জন্মগত কারণেও দুর্বল হতে পারে। মহিলাদের মেনোপজ়ের পরে হরমোনজনিত সুরক্ষা আর পাওয়া যায় না। যত দিন ঋতুচক্র চলে, তত দিন ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোন নির্গত হয়, যা অনেকটা সুরক্ষাকবচের মতো কাজ করে। এর ফলে আপার ইউরিনারি ট্র্যাক্ট সুরক্ষিত থাকে। এই দু’টি হরমোন কমে যাওয়ার ফলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বেড়ে যায়।”
পুরুষদের ক্ষেত্রে বয়সজনিত কারণে প্রস্টেটের আকার বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, রক্তে সেপ্টিসেমিয়া ইত্যাদি কারণেও পাইলোনেফ্রাইটিস হতে পারে। এ ছাড়া ইমিউনোসাপ্রেস্যান্ট, ক্যানসারের ওষুধ নিয়মিত খেলেও প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। তখন সংক্রমণ নীচের ইউরিনারি ট্র্যাক্টে সীমাবদ্ধ না থেকে উপরে চলে যায়। একেই বলে পাইলোনেফ্রাইটিস। এটা কিন্তু সাধারণ সমস্যা নয়, ইউটিআই-এর চেয়ে সিরিয়াস অসুখ। এ ছাড়া জন্ম থেকে কিডনির রিফ্লাক্স মেকানিজ়মে সমস্যা থাকলে, ব্লাডার নেক অবস্ট্রাকশন থাকলে, কিডনিতে স্টোন হলে, সিস্ট থাকলে, এই ধরনের সংক্রমণকে ত্বরান্বিত করে। কিডনিতে টিবিও, ক্রনিক পাইলোনেফ্রাইটিসের একটি কারণ।
কী করে বোঝা যাবে
পাইলোনেফ্রাইটিসে বারবার প্রস্রাবের বেগ পাবে তা নয়, সংক্রমণের জ্বালা না-ও থাকতে পারে। মূলত, জ্বর, বমি হয়। যেখানে কিডনি থাকে, সেখান থেকে পিঠের দিকে ব্যথা বাড়লে সজাগ হতে হবে। জ্বর অনেক অসুখেরই উপসর্গ। কিন্তু এ ক্ষেত্রে জ্বরের সঙ্গে বারবার বমি হয়। রক্ত পরীক্ষা করলে দেখা যাবে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন বেশ বেড়ে আছে। জন্মগত কারণে কিডনির গঠনগত ত্রুটি থাকলে ও মূত্রনালিতে কোনও সমস্যা থাকলে এই রোগ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় থাকাকালীনও মহিলাদের পাইলোনেফ্রাইটিস হতে পারে।
চিকিৎসা
পাইলোনেফ্রাইটিস বারবার হতে পারে। এর জন্য কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। ‘‘ওষুধ দিয়ে সারানো সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে ডায়ালিসিসের প্রয়োজন পড়তে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ইন্ট্রাভেনাস ওষুধ দিতে হয়। তবে কয়েকটা ব্যাপারে আগাম সতর্ক হওয়া প্রয়োজন, বিশেষত মহিলাদের মেনোপজ়ের পরে। টয়লেটের ব্যবহার অনেক স্বাস্থ্যসম্মত হওয়া দরকার। নারীপুরুষ নির্বিশেষে যাঁরা ডায়াবেটিক, তাঁদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা উচিত,’’ বললেন ডা. রায়চৌধুরী।
সুরক্ষিত থাকতে বাড়ির বাইরে ‘টয়লেট সিট স্যানিটাইজ়ার’ ব্যবহার করা যায় বা টিসু দিয়ে সিট কভার মুছে বসতে হবে। অপরিচ্ছন্ন শৌচাগার এড়াতে অনেকেই মূত্র চেপে রাখেন, যা স্বাস্থ্যের পক্ষে বেশি ক্ষতিকারক। এতে শুধু ইউটিআই হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে না, কিডনি স্টোনও হতে পারে, যা পাইলোনেফ্রাইটিসের অন্যতম কারণ। অনেকেই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া ঘনঘন পেনকিলার বা অন্য ওষুধ খান, তা থেকেও বিরত থাকুন।
মডেল: স্নেহা বসু,সায়ন্তনী গুহঠাকুরতা
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)