E-Paper

অবহেলা নয় পালমোনারি এমবলিজ়মকে

শ্বাসকষ্ট, সঙ্গে বুকের মাঝে চাপ লাগা... এই লক্ষণ দেখলে কী করবেন? রইল বিশেষজ্ঞের পরামর্শ

ঐশী চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৪৯

অফিস থেকে দিনকয়েকের জন্য ছুটি নিয়ে সপরিবার লং-ড্রাইভে গিয়েছিলেন শোভন। মাঝপথে অবশ্য আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁর স্ত্রী রিমি। শ্বাসকষ্ট, সঙ্গে বুকের মাঝে চাপ লাগা আর কাশির সঙ্গে রক্ত। এমন লক্ষণ দেখা মাত্র দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাঁকে। চিকিৎসকেরা জানান, পালমোনারি এমবলিজ়মে ভুগছেন রিমি।

কী এই রোগ?

পালমোনোলজিস্ট ডা. অনির্বাণ নিয়োগী জানাচ্ছেন, ফুসফুস এবং হৃৎপিণ্ডর মাঝে থাকা পালমোনারি ধমনির মধ্যে কোনও কারণে রক্ত জমাট বেঁধে গেলে শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যেতে পারে। এর ফলে হতে পারে পালমোনারি এমবলিজ়মের মতো মারাত্মক অবস্থা।

যাঁদের হয়

সাধারণত এই সমস্যা দেখা দেয় এমন রোগীদের মধ্যে যাঁদের হিপ বা হাঁটু প্রতিস্থাপনের মতো বড় কোনও অস্থিসংক্রান্ত অস্ত্রোপচারের পরে দীর্ঘ দিন শয্যাশায়ী থাকতে হচ্ছে। যাঁদের দীর্ঘক্ষণ এক ভাবে শুয়ে-বসে থাকতে হয়, তাঁদেরও এই রোগের ঝুঁকি থাকে। এ ছাড়াও, শরীরের বড় অংশ পুড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও এই আশঙ্কা থেকে যায়। দীর্ঘ দিন ধরে ক্যানসারে ভুগলেও শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। সম্প্রতি প্রয়াত হয়েছেন ‘হোম অ্যালোন’-খ্যাত অভিনেত্রী ক্যাথরিন ও’হারা। ২০২৫ সাল থেকে রেক্টাল ক্যানসারে ভুগছিলেন তিনি। ক্যাথরিনের মৃত্যুর কারণগুলির মধ্যে অন্যতম সমস্যা হিসেবে উল্লেখ রয়েছে পালমোনারি এমবলিজ়মের। একই সমস্যা হতে পারে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত বা প্যারালিসিসের রোগীদেরও।

আসলে এই রোগের উৎস পায়ের শিরা থেকে। অনেক সময়ে হাঁটুর পিছন দিকের পেশিতে থাকা শিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে পারে। চিকিৎসার পরিভাষায় একে ‘ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস’ বলে। যদি শিরার মধ্য দিয়ে জমাট বাঁধা রক্তের কোনও ছোট টুকরোও কোনও ভাবে ছিটকে গিয়ে ফুসফুসের ধমনিতে আটকে যায়, তা হলে সেটিই গুরুতর আকার নিতে পারে।

কমবয়সি, শারীরিক ভাবে সুস্থ ব্যক্তির পালমোনারি এমবলিজ়মে আক্রান্ত হওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা থাকে না। তবে কিছু সময়ে জন্মগত কোনও রক্তের সমস্যার কারণেও এই রোগ দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসক প্রসূনকুমার মিত্রের মতে, বর্তমান জীবনধারার কারণেও এই রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়। অনেকেই এখন দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করেন। লং ড্রাইভে গেলে বা দীর্ঘক্ষণ বিমান সফর করতে হলেও এমন সমস্যার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কাজেই ২০-৩০ বছর বয়সিদের মধ্যে যদি কারও পায়ের কাফ পেশি অর্থাৎ হাঁটু এবং গোড়ালির মধ্যবর্তী পেশিতে যন্ত্রণা হতে থাকে, তা হলে অবশ্যই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

উপসর্গকে উপেক্ষা নয়

চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, পায়ে (বিশেষত কোনও একটি পায়ের কাফ পেশিতে) প্রচণ্ড ব্যথা বা ফুলে যাওয়া, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া, কাশির সঙ্গে রক্ত আসা কিংবা বুকে ব্যথা হলে লক্ষণগুলি উপেক্ষা করা ঠিক নয়। সাবধান হতে হবে যদি মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। ডা. মিত্রর কথায়, “এই রোগ নীরবে কখন শরীরে বাসা বাঁধে, তা বোঝা মুশকিল। দ্রুত চিকিৎসা শুরু না করলে হতে পারে মৃত্যুও।”

নির্ণয় জরুরি

ডা. নিয়োগী জানাচ্ছেন, ডিপ ভেন থ্রম্বোসিসের ক্ষেত্রে ডি ডাইমার পরীক্ষা করানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিটি পালমোনারি অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফি (সিটিপিএ), ভেনাস ডপলারের মতো কিছু বিশেষ ধরনের পরীক্ষাও এই ক্ষেত্রে ভীষণ কার্যকর। এ ছাড়াও, ইসিজি, ইকোকার্ডিয়োগ্রামের মাধ্যমে দেখে নেওয়া যায় কোনও ব্যক্তি পালমোনারি এমবলিজ়মে ভুগছেন কি না।

চিকিৎসা সম্ভব

পালমোনারি এমবলিজ়মের চিকিৎসা দ্রুত শুরু না করলে দীর্ঘ দিন শ্বাসকষ্ট কিংবা ক্রনিক পালমোনারি হাইপারটেনশনের মতো সমস্যা থেকে যেতে পারে। হতে পারে মৃত্যুও। চিকিৎসকেদের পরামর্শ, অ্যান্টি কোয়াগুল্যান্ট অর্থাৎ রক্ত পাতলা করার ওষুধ এই রোগের চিকিৎসায় অন্যতম। এর ফলে রক্তে জমাট বাঁধার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় না। কিছু ক্ষেত্রে সারা জীবন রোগীকে এই ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা। হেপারিনের মতো বেশ কিছু ধরনের ইঞ্জেকশনও এই রোগের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

এ ছাড়াও, ডা. প্রসূনকুমার মিত্রের মতে, যদি অতিরিক্ত তেল-মশলা-মিষ্টি খাবার না খেয়ে, নিয়মিত শারীরচর্চা করে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল খাওয়া হয়, তা হলে এই রোগের ঝুঁকি অনেকটা কম থাকে। পাশাপাশি, লং ড্রাইভে বা অনেকক্ষণ বিমানে বসে থাকতে হলে মোজা পরা কিংবা ডেস্ক জবের ক্ষেত্রে কিছুক্ষণ পর পর উঠে একটু হাঁটাচলা করলেও উপকার মিলতে পারে। পা ঝুলিয়ে বেশিক্ষণ না বসে, পায়ের নীচে একটা টুল রাখুন।

চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন, লক্ষণগুলো দেখে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা। পালমোনারি এমবলিজ়মের ক্ষেত্রে যদি দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা শুরু করা যায়, তা হলে দ্রুত উপকার মিলতে পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Chest pain lungs

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy