ডিনার করার পর অন্তত একটা মিষ্টি চাই-ই। নিদেনপক্ষে কিছু মুচমুচে নোনতা বা মুখরোচক খাবার। এমন ইচ্ছে কিন্তু মোটেই ‘নিষ্পাপ ইচ্ছে’ নয়। এর পিছনে যথেষ্ট কারণ আছে। আর সেই সব কারণের নেপথ্যে রয়েছে যুক্তিও। তবে সেই সব যুক্তি মাথায় রেখেও বলতে হয়, অভ্যাসটি স্বাস্থ্যকর নয় মোটেই। নিয়মিত চলতে থাকলে এই অভ্যাস নানা রোগ ডেকে আনতে পারে শরীরে। প্রশ্ন হল, এমন একটি ‘বিশ্রী’ ইচ্ছে হলে নিজেকে সামলাবেন কী ভাবে?
সমাধান খুঁজতে হলে আগে সমস্যার গভীরে যাওয়া জরুরি। আর এ সমস্যার মূলে রয়েছে কিছু হরমোনের কারিকুরি আর কিছু ভুল সিদ্ধান্ত।
সমস্যার মূলে কী কী?
১। ঘেরলিন
এ ক্ষেত্রে দোষ দেওয়া যেতে পারে ঘেরলিন নামে একটি হরমোনকে। খিদে পায় ওই হরমোনের কারণেই। আর রাত যত বাড়ে তত এই হরমোনের উপদ্রব বাড়তে থাকে।
২। পুরস্কার
মাঝ রাতে এটাসেটা খাওয়ার ইচ্ছে, যাকে ‘মিডনাইট ক্রেভিং’ বলেও অনেকে চেনেন, তা অনেক ক্ষেত্রেই ঘটে নিজেকে নিজের পুরস্কার দেওয়ার ইচ্ছে থেকে। ধরুন, সারা দিন প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। তার পরে আপনার মনে হল, রাতে নিজেকে একটু পুরস্কার দেওয়া যেতেই পারে। আর সেই পুরস্কার হিসাবেই নিজেকে মিষ্টি, ভাজাভুজির মতো মুখরোচক খাবার খাওয়ার অনুমতি দেন নিজেই। শরীরের ক্ষতি হবে জেনেও ওই পুরস্কৃত করার ইচ্ছে থেকে নিজেকে আটকে রাখা যায় না।
৩। ডোপামিন
অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যার কারণেও মিষ্টি খাওয়ার তীব্র ইচ্ছে তৈরি হয়। কারণ, সারাদিনের মানসিক চাপ এবং বিষণ্ণতা কাটানোর জন্য মস্তিষ্ক ‘ডোপামিন’ বা ফিল-গুড হরমোনের জোগান চায়। মিষ্টি বা কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার দ্রুত ডোপামিন নিঃসরণ করে সাময়িক আনন্দ দেয়।
৪। পুষ্টির জোগান
নৈশাহারের থালায় এমন খাবার থাকা দরকার যা শুধু পেট ভরাবে না, রক্তে শর্করার মাত্রাও স্থিতিশীল রাখবে। কারণ রক্তে শর্করার মাত্রা আচমকা বেড়ে গেলে আরও বেশি করে মিষ্টি বা ভাজাভুজি খাওয়ার ইচ্ছা জাগে।
‘ক্রেভিং’ কমানোর টোটকা
১। প্রোটিন জাতীয় খাবার পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখুন। প্রোটিন খেলে ঘেরলিনের কার্যকারিতা কমে। শর্করার বদলে রাখুন ফাইবার। কারণ, ফাইবার পেট ভরিয়ে রাখে। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর ফ্যাট, যেমন অলিভ অয়েল বা ঘি মেশাতে পারেন খাবারে। কারণ, ফ্যাটও ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণে উপযোগী।
২। ডিনারের শেষ পাতে ২-৩ চামচ চিনি ছাড়া টক দই খান। এটি প্রোবায়োটিক হিসেবে কাজ করে এবং মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা বা ‘সুগার ক্রেভিং’ কমিয়ে দেয়।
৩। ডিনারের ৩০ মিনিট পর এক কাপ চিনি ছাড়া ক্যামোমাইল চা বা পুদিনা পাতা দিয়ে চা পান করুন। এটি স্নায়ু শিথিল করে। মুখরোচক কিছু খাওয়ার ইচ্ছেও ভুলিয়ে দেয়।
৪। ডিনারের ঠিক পরেই দাঁত মেজে ফেলুন। টুথপেস্টের মিন্ট ফ্লেভার মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায় যে ‘খাওয়ার পর্ব শেষ’। দাঁত মাজার পর কিছু খাওয়ার ইচ্ছে এমনিতেই হয় না।
৫। রাত যত বাড়ে, শরীরে ‘ঘেরলিন’ বা খিদে বৃদ্ধির হরমোন তত বাড়তে থাকে। সেই সঙ্গে কমতে থাকে ‘লেপটিন’-এর মাত্রা, যা কি না মনে তৃপ্তিবোধ আনে। তাই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে পারলেই বহু সমস্যার সমাধান হবে।
৬। অনেক সময় মস্তিষ্ক খিদে বোধ এবং পিপাসা বোধের সংকেত গুলিয়ে ফেলে। নৈশাহারের পর মিষ্টি-নোনতা খাওয়ার ইচ্ছে হলে এক গ্লাস জল খেয়ে দেখুন। ১৫ মিনিট পরেই দেখবেন খাওয়ার ইচ্ছে অনেকটা কমে গেছে।
৭। যদি রাতে খুব বেশি মুচমুচে কিছু খেতে ইচ্ছে করে, তবে ভাজা চিপস না খেয়ে মাখনা শুকনো খোলায় ভেজে সামান্য নুন-গোলমরিচ দিয়ে খেতে পারেন। এটি লো-ক্যালোরি হওয়ায় শরীরের কোনও ক্ষতি করে না। মিষ্টির বদলে দু’টি কিশমিশ আর দু’টি আমন্ড খেতে পারেন।
৮। দুধ খেতে সমস্যা না থাকলে রাতের খাবার খাওয়ার পরে এক কাপ দুধে হলুদ-আদা-গোলমরিচ আর ভাল জাতের মধু সামান্য পরিমাণে মিশিয়ে খেতে পারেন। তাতেও মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছে কমবে।