১৮২১ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মকাল। লন্ডনের ৫ ডেভনশায়ার স্ট্রিটে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। নামলেন কেতাদুরস্ত এক ভদ্রলোক। বয়স তিরিশ ছুঁইছুঁই। তিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক উইলিয়াম হার্শেল। শনি এবং ইউরেনাস গ্রহের উপগ্রহ আবিষ্কারের জন্য যিনি পরে বিখ্যাত হয়েছেন। তিনি এসেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিতের অধ্যাপক চার্লস ব্যাবেজের বাড়িতে। হাতে তাড়া তাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণা সম্পর্কিত কাগজপত্র। যার একটিরও হিসাবে ভুল হলে আবিষ্কারের গতিপ্রকৃতিই বদলে যাবে। এত হিসেব মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাতেও ভুলভ্রান্তিও হচ্ছে বিস্তর। সেই ভুল শুধরোতেই জন ও চার্লসের মাথায় আসে যন্ত্রগণকের ভাবনা। পরবর্তীতে চার্লস ব্যাবেজ ও আরও কয়েক জনের বুদ্ধিতে তৈরি হয় কম্পিউটার। ঢাউস মনিটর, সিপিইউয়ের সে কম্পিউটার প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে। সে জায়গা দখল করেছে ছিমছাম স্মার্ট কম্পিউটার বা ল্যাপটপ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) যুগে এ হেন স্মার্ট প্রযুক্তিতেই এখন নাক সিঁটকাচ্ছে জেন জ়ি। সাইবার দুনিয়ার উল্টো পথে হেঁটে তাঁদের নতুন আবিষ্কার ‘সাইবারডেক’।
সাইবার দুনিয়ার বিপরীত স্রোত ‘সাইবারডেকিং’
চকচকে স্ক্রিন, ততোধিক পাতলা গড়ন, তাতে এআইয়ের ঝলকানি। ল্যাপটপ, ট্যাব এখন স্লিক-স্মার্ট। ইন্টারনেটের সুবাধে গোটা পৃথিবীটাই যেন হাতের মুঠোয়। তাতে আবার ইন্ধন জোগাচ্ছে চ্যাটবট। মেল লেখা থেকে ছোটদের হোমওয়ার্ক করা, ওষুধপত্রের খবরাখবর থেকে প্রযু্ক্তিগত তথ্য— চাইলেই আলাদিনের প্রদীপের মতো লহমায় হাজির করবে চোখের সামনে। এই যে এত আরাম, না চাইতেই এত সুবিধা, তাতেই ঘোর আপত্তি জানিয়েছে জেনারেশন জ়েড। তারা ফিরে যেতে চাইছে, সে খটাখট টাইপিংয়ের যুগে যেখানে মাথা খাটিয়ে পরিশ্রম করে অজানাকে জানার চেষ্টা হত। এ থেকেই সাইবারডেকের উদ্ভাবন। কোনও প্রযুক্তি নয়, স্রেফ নিজের হাতে জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা এমন এক কম্পিউটার যার পুরোটাই অগোছালো। ভাঙা বা আধভাঙা কি-বোর্ড, খুদে স্ক্রিন, তারের জটলা, জয়স্টিক, জ্বলজ্বলে এলইডি লাইট এবং পুরোনো গেমিং কনসোলের ভাঙাচোরা অংশ। ছন্নছাড়া এই যন্ত্রে থাকবে না এআইয়ের আস্ফালন, থাকবে না ডার্ক ওয়েবের নজরদারিও।
সাইবারডেট আদতে কী? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
‘সাইবারডেক’ শব্দটি প্রথম জনপ্রিয় হয় ১৯৮৪ সালে উইলিয়াম গিবসনের বিখ্যাত উপন্যাস নিউরোম্যান্সার’ থেকে। বইটিতে হ্যাকাররা সাইবারস্পেসে ঢোকার জন্য এক ধরনের কম্পিউটার ব্যবহার করত, যা জেন জ়ি-র তৈরি ‘পোর্টেবল’ কম্পিউটারের মতোই অগোছালো। সেই কল্পবিজ্ঞানের প্রযুক্তিকেই বাস্তব রূপ দিচ্ছে জেন জ়ি।
সাইবারডেক মনে করিয়ে দেবে পুরনো সময়ের কম্পিউটারের কথা।
প্রযুক্তির দাস নয়, নিয়ন্ত্রক সাইবারডেক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জ্ঞানভান্ডার থেকেই শিখছে, জানছে ও ততোধিক বুদ্ধিদীপ্ত হয়ে উঠছে। আর দুশ্চিন্তার জায়গাটা হল এটাই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বল্গাহীন আচরণের সম্ভাবনা। এখনই সে মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাব, ল্যাপটপে সেঁধিয়ে নজরদারি করছে মানুষজনের ব্যক্তিগত জীবনে। তার গোপন তথ্যে। ইমেল থেকে ফোন নম্বর, সমাজমাধ্যমের প্রোফাইল থেকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট— সর্বত্রই সে নজর রেখে রয়েছে। সাইবারডেক এই নজরদারি থেকে মুক্ত। জেন জ়ি যেমন আপন ছন্দে জীবনকে সাজাতে ভালবাসে, তাই তাদের তৈরি কম্পিউটারও কারও ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলাবে না। এর অপারেটিং-সিস্টেম এমন হবে যা ব্যক্তিগত তথ্যে নজরদারি চালাবে না। এতে না থাকবে সাইবার অপরাধের ভয়, না ডিজিটাল অ্যারেস্ট হওয়ার আশঙ্কা। পুরনো দিনের কম্পিউটারের মতোই তা নিরাপদ।
খুদে স্ক্রিন, ছোটখাটো কম্পিউটার।
সাইবারডেকেও ইন্টারনেট থাকবে। ওয়াই-ফাই, ব্লু-টুথ, সবই ব্যবহার করা যাবে। মোবাইলের সঙ্গে হটস্পটও সংযোগ করা যাবে। গুগল ক্রোম বা ফায়ারফক্সের মতো ব্রাউজ়ারে থাকবে অবাধ গতি। ওয়েবসাইট দেখা, নতুন তথ্য জানা, উইকিপিডিয়া ঘাঁটা বা মেল পাঠানো, সবই করা যাবে।
সাইবারডেকের আরও কিছু সুবিধা থাকবে। সাধারণ ল্যাপটপ বা ফোনে কর্পোরেট সফটঅয়্যার থাকে, যা সারা ক্ষণ ‘ডেটা ট্র্যাক’ করে এআই-চালিত বিজ্ঞাপন দেখায়। সাইবারডেকে সেটি হওয়ার নয়। ট্র্যাকিং ও এআই নজরদারি মুক্ত ইন্টারনেট ব্যবহারের স্বাধীনতা দেবে।
সাইবারডেকে চাইলেই ইন্টারনেট বন্ধ করে রাখা যাবে, যাতে ফেসবক-ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবের নোটিফিকেশনের গোলকধাঁধাঁয় নাজেহাল না হতে হয়। নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করা, লেখালিখির কাজ করা যাবে। চাইলে অফলাইনের কিছু পুরনো গেমও খেলা যাবে। আবার যন্ত্রটি যদি বিগড়ে যায়, তা হলে সারিয়ে নেওয়া যাবে নিজেই। রাখঢাক করে কথা না বলা, প্রচলিতকে প্রশ্ন করা, প্রথাকে চ্যালেঞ্জ করা... এ সবই জেন জ়ির বৈশিষ্ট্য। তাই প্রযুক্তিকেও নিজেদের মতো করেই গড়ে নিতে চাইছে তারা।