বাঙালি রান্নাঘরে রাঁধুনিরা সাধারণত ঘি, সাদা তেল, সর্ষের তেল ইত্যাদিই ব্যবহার করেন রান্নায়। এ ব্যাপারে তাঁরা খানিক রক্ষণশীল মনোভাব নিয়েও চলেন। নিজেদের তেলের স্বাদ, ঝাঁঝ, গন্ধ এবং স্বাদ নিয়ে খানিক গর্ববোধও আছে বাঙালি খাদ্যরসিকদের। তা বলে কি বঙ্গজনেরা অলিভ অয়েলকেও আপন করে নেয়নি? খাবার ব্যাপারে উদার এ রাজ্যের মানুষজন স্বাস্থ্যের প্রয়োজনে হোক কিংবা প্রিয় বিদেশি খাবারের খাঁটি স্বাদ বাঁচিয়ে রাখতে ঘি-সর্ষের তেল ছেড়ে অলিভ অয়েলও চেখে এবং মেখে দেখছে। আর সেই বিশ্বপ্রেমী বাঙালির দরবারেই এখন হাজির হয়েছে কুকিং স্প্রে।
কুকিং স্প্রে আসলে কী?
খুব সহজভাবে বলতে গেলে, কুকিং স্প্রে হলো একটি অ্যারোসল ক্যান যাতে তেল ভর্তি থাকে। এই ক্যানের ভেতরে তেলের সঙ্গে থাকে কিছু ‘ইমালসিফায়ার’, যেমন— লেসিথিন এবং এক ধরণের প্রপেলান্ট বা গ্যাস যা চাপ দিলে তেলকে শিশিরের মতো সূক্ষ্ম বিন্দুতে ছড়িয়ে দেয়। বাজারে এখন সর্ষের তেল, অলিভ অয়েল, এমনকি মাখনের গন্ধের কুকিং স্প্রে-ও পাওয়া যাচ্ছে। রান্না না করে তেমন স্প্রে খাবারের উপর ছড়িয়ে দিলে তাতে মাখনের স্বাদ এবং গন্ধ— উভয়ই পাওয়া যাবে।
এটি কি রান্নায় তেলের বিকল্প?
কুকিং স্প্রে আসলে তেলই। সেই তেল রান্নায় ব্যবহারের পদ্ধতিটি ভিন্ন। সাধারণ রান্নায় কড়াইয়ে তেল ঢেলে দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কড়াই বা প্যানে তেল স্প্রে নিতে হববে। তবে সব ধরনের রান্নায়, বিশেষ করে ভাজাভুজি এবং কষিয়ে রান্না করা যে সব খাবারে বাঙালি জিভ অভ্যস্ত, তা কুকিং স্প্রে দিয়ে রান্না করা সম্ভব নয়। যে মন লুচি বা বড়া ভাজার মতো ডুবো তেলে ভেজে রান্না করা খাবার তৈরি করতে হলে এটি কাজে লাগবে না। একই ভাবে কষা মাংস রান্নাও করা যাবে না কুকিং স্প্রে দিয়ে।
কী ধরনের রান্নায় কুকিং স্প্রে ব্যবহার করা যাবে?
বেকিংয়ের জন্য এই স্প্রে বেশ কাজের। কেক টিন গ্রিজ করতে, প্যাটিসের মতো খাবার বানাতে এমনকি, এয়ার ফ্রায়ারে কিছু রান্না করতে চাইলেও এই স্প্রে কাজে লাগবে। আবার অমলেট, প্যানকেক বানাতে চাইলে বা হালকা সঁতে করে কোনও রান্না করতে চাইলেও কুকিং স্প্রে খুব অল্প তেলে একই রকম স্বাদ এনে দেবে।
তেলের থেকে কুকিং স্প্রে কোথায় আলাদা?
বেশ কিছু তফাত রয়েছে। তার মধ্যে একটি অবশ্যই খাঁটিত্বের অন্যটি ক্যালোরির।
খাঁটি নয় সব সময় : মাখন বা ঘিয়ের গন্ধযুক্ত কুকিং স্প্রেতে আসল মাখন বা ঘি দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ তা জমে যাবে এবং স্প্রে করা যাবে না। তাই মাখন বা ঘিয়ের পরিবর্তে তাতে ব্যবহার করা হয় ক্যানোলা তেল, পাম অয়েল বা সয়াবিনের তেলের মতো কোনও বেস অয়েল। তার সঙ্গে মেশানো হয় কৃত্রিম গন্ধ এবং প্রাকৃতিক রংও।
ক্যালোরি মাপা যায়: এক চামচ তেলে প্রায় ১০০-১২০ ক্যালরি থাকে। কিন্তু একবার স্প্রে করলে যে পরিমাণ তেল বেরোয়, তাতে ক্যালরির পরিমাণ থাকে নামমাত্র। আর যেহেতু স্প্রে পুরো পাত্রে সমানভাবে ছড়িয়ে যায়, তাই খুব সামান্য তেলেই রান্না সেরে ফেলা সম্ভব হয়।
কতটা স্বাস্থ্যকর?
১। যারা ওজন কমাতে চাইছেন বা হার্টের সমস্যার কারণে তেল মেপে খান, তাদের জন্য এটি কার্যকরী। কারণ তাঁরা ক্যালোরি কমাতে পারবেন। কিন্তু কৃত্রিম গন্ধ এবং স্বাদযুক্ত কুকিং স্প্রেতে পাম অয়েল ব্যবহার করা হয়। গন্ধের জন্য ব্যবহার করা হয় কিছু রাসয়নিকও। সে ক্ষেত্রে বিষয়টি হার্টের রোগীর জন্য মোটেই ততটা স্বাস্থ্যকর হবে না।
২। এই তেলে প্রপেলান্ট হিসেবে কিছু রাসায়নিক থাকে। যদিও তা রান্নায় খুব সামান্যই মেশে, তবুও যারা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক খাবার পছন্দ করেন, তারা কুকিং স্প্রে এরিয়ে চলুন অথবা ‘নন-অ্যারোসল’ পাম্প স্প্রে ব্যবহার করতে পারেন। এতে প্রপেলান্ট গ্যাস থাকে না।
৩। বাজারচলতি কিছু স্প্রে-তে থাকা সয়লেসিথিন অনেক সময় নন-স্টিক প্যানের আবরণের ক্ষতি করতে পারে।
কোনটি বেছে নেবেন?
বাঙালি রান্নাঘর এবং বাঙালি খাদ্যরসিকের কথা ভাবলে বলতে হবে, কী রান্না করছেন, তার উপর নির্ভর করছে পুরোটা। ঝোল, ঝাল বা কষা মাংসের রান্নায় সর্ষের তেলের যে স্বাদ, তা স্প্রে দিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। তবে রোজকার ওমলেট, পরোটা, প্যানকেক, চিল্লা ইত্যাদি বানাতে চাইলে স্বাস্থ্য সচেতনেরা ভাল মানের কুকিং স্প্রে বেছে নিতে পারেন। বাঙালি যেমন ঐতিহ্যের হাত ধরে রেখেছে বরাবর তেমনি আধুনিকতার সঙ্গেও তাল মিলিয়ে চলেছে। তাই সে দিক থেকে দেখলে স্বাস্থ্যসচেতন বাঙালি হেঁশেলে তেলের বোতলের পাশাপাশি একটি কুকিং স্প্রেও রাখা যেতেই পারে।