পেটের সঙ্গে মনের যোগ চিরন্তন। ভাল খাবারের স্বাদ মন ভাল করে দিতে পারে। কিন্তু এই ভাল খাবারটা ঠিক কী? যাঁরা খাদ্যরসিক তাঁরা বলবেন, ঘি-মাখন বা মাছ-মাংস-ডিম যতটা মন চাইবে খেয়ে ফেলা। কারও কাছে আবার ভাল খাবার মানে হল স্বাস্থ্যকর খাওয়াদাওয়া, সেখানে চর্ব-চোষ্যের জায়গাই নেই। খেতে ভালবাসলে ডায়েট ঠিক করা যায় না। একবেলা উপোস দিয়ে বা আধপেটা খেয়ে ওজন কমানোর পন্থা যতই সরস মনে হোক না কেন, তাতে ইতি টানতে হয় কিছু দিন পরেই। কিটো, মেডিটেরিনিয়ান, ভিগান, ড্যাশ ডায়েটের মতো ওজন কমানোর যে সব ডায়েটের নাম হালে শোনা যায়, সেগুলি যেমন ভাল, তেমনই সঠিক ভাবে করতে না পারলে পুষ্টির ঘাটতিও থেকে যায়। শরীরকে যথাযত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন ও ফ্যাট দিতেই হবে। তা না হলে তার কলকব্জা একসময়ে গিয়ে বিগড়ে যাবে। সে জন্য প্রয়োজন সুষম আহার। মাছ, মাংস বা ডিম এবং ঘি-মাখন খেয়েও ওজন কমানো যায়। তারই উপায় হল ফ্লেক্সিটেরিয়ান ডায়েট।
ভোজনরসিকদের ওজন কমানোর নয়া পন্থা
খেয়েদেয়ে ওজন কমানোর কোনও উপায় যদি থাকে, তা হলে ফ্লেক্সিটেরিয়ানের নাম প্রথমেই আসবে। পুষ্টিবিদ শম্পা চক্রবর্তীর মতে, পছন্দের কোনও খাবার বাদ দিতে হবে না এই ডায়েটে। সে মাছ, মাংস পছন্দ হলে তা বেশি করেই খেতে পারেন। নিরামিষ খেলে নানা রকম ডাল, দুধ, ছানা, পনির, সয়াবিন ভরপুর পরিমাণে খাওয়া যাবে। থালা সাজিয়ে ভাত, ডাল, সব্জি, মাছ বা মাংস খান না, কে বারণ করেছে! প্রাণিজ ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন মিলিয়ে মিশিয়ে এ ডায়েট করা যায়। এতে কার্বোহাইড্রেট যেমন ভাত বা রুটিও একেবারে বাদ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। শুধু পরিমাণটা কমিয়ে দিতে হয়।
২০০৯ সালে আমেরিকার পুষ্টিবিদ ডন জ্যাকসন ব্লাটনার প্রথম এই ডায়েটের ধারণা দেন। নিরামিষ ও আমিষ— কোনও খাবারই বাদ দেননি তিনি। যিনি নিরামিষ খান, তিনি যেমন এই ডায়েট করতে পারবেন, যিনি আমিষ পছন্দ করেন তাঁর জন্যও এই জাতীয় খাওয়াদাওয়া মেনে চলা সহজ। আবার দুগ্ধজাত খাবার পছন্দ হলে তা-ও খাওয়া যেতে পারে। সহজ কথায় বলতে গেলে সুষম আহার করেই ওজন কমিয়ে ফেলার উপায় ফ্লেক্সিটেরিয়ান।
কী কী খাবেন ও কী নয়?
উদ্ভিজ্জ প্রোটিনের মধ্যে নানা রকম ডাল, মটরশুঁটি, সয়াবিন, ছানা, পনির, টোফু খাওয়া যেতে পারে।
মরসুমি সব ধরনের সব্জি তো খাবেনই, নানা রকম ফলও খেতে হবে নিয়ম করে।
দানাশস্য তো রাখতেই হবে পাতে, কারণ এর থেকেই আসবে ফাইবার। ওট্স, কিনোয়া, ডালিয়া, ব্রাউন রাইস নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।
স্বাস্থ্যকর ফ্যাটের জন্য আখরোট, নানা রকম বাদাম, চিয়া বীজ, তিসি ও সূর্যমুখীর বীজ, অলিভ অয়েল চলবে।
রেড মিটেও ছাড় দিয়েছে ফ্লেক্সিটেরিয়ান। তবে মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
যা যা খাওয়া যাবে না তার মধ্যে প্রথমেই রয়েছে প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত মাংস, প্যাকেটজাত ফলের রস ও জাঙ্ক ফুড। বাইরের খাবার পুরোপুরি বর্জন করতে হবে।
অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয়, হেল্থ ড্রিঙ্ক, নানা স্বাদের প্যাকেটজাত দই খাওয়া চলবে না।
চিনি, ময়দা বাদ দিতে পারলেও ভাল হয়।
ফাইবার সমৃদ্ধ এবং কম ক্যালোরিযুক্ত হওয়ায় নিয়মিত এই ডায়েট অনুসরণে হজমশক্তি বাড়ে, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে। ফ্লেক্সিটেরিয়ান ডায়েট মেনে চললে হার্ট ভাল থাকবে। ডায়াবিটিস বা কিডনির রোগ থাকলে, এই ডায়েট মেনে চলা যেতে পারে। ওজন খুব বেশি অথচ খাওয়াদাওয়ায় রাশ টানতে পারছেন না, এমন মানুষজন এই ডায়েট করতে পারেন। গবেষণা বলছে, ফ্লেক্সিটেরিয়ান ডায়েট করলে শরীরে পুষ্টির ঘাটতি হবে না। দুর্বলতা কমে যাবে, মানসিক স্বাস্থ্যও ভাল থাকবে। এই ডায়েটে যেহেতু সবকিছু খাওয়ার ছাড়পত্র আছে, তাই একটানা ডায়েট মেনে চলার অসুবিধাও নেই। ওজন কমবে ধীরে ধীরে শরীরের ভারসাম্য রেখে। রক্তে শর্করার মাত্রাও স্থিতিশীল থাকবে।