Advertisement
E-Paper

যৌবন ধরে রাখা না রোগমুক্তি? প্রাচীন চিকিৎসা নয়া মোড়কে, বিদেশে ধনকুবেররা করান, এখন কলকাতাতেও হয়

বুড়ো হতেই যত অনীহা। যৌবন যদি ধরে রাখা যায় আরও কয়েকটা বছর, তা হলে বেশ হয়। জোয়ান থাকার যে অদম্য বাসনা আবিশ্ব ছড়িয়ে গিয়েছে, তা থেকেই এক শতাব্দী প্রাচীন থেরাপিকে নতুন আঙ্গিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিদেশে ধনকুবেররা যা করাতেন এত দিন, এখন তা হয় কলকাতাতেও।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৭ মার্চ ২০২৬ ০৮:৫৭
What is Hyperbaric Oxygen Therapy, how it is use for Anti-ageing and other medical treatments

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি কী, খরচ কত? গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

জরা বা বার্ধক্যের ধারণা এখন সেকেলে। বয়স হবে, কিন্তু চেহারা বুড়িয়ে যাবে না— এই হল নতুন ধারা। গোটা বিশ্ব এতেই গা ভাসিয়েছে। ‘যুবক’ থাকতে চান বলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যত দোষ কুড়োলেন, কিন্তু পাশের বাড়ির কাকিমাই বা কম যান কিসে! যিনি পাড়ার পার্লারে গিয়ে সাধ্যমতো খরচে ফেশিয়াল করাতেন, তিনি এখন নামি সালোঁয় বোটক্স করান। সে-ও তো সেই পঞ্চাশে পৌঁছে কুড়ির তরুণীর মতো ঝকঝকে দেখানোর বাসনাতেই। জেন জ়ি বলবে বোটক্সও সেকেলে। লেজ়ার থেরাপি বা প্লেটলেট-রিচ প্লাজ়মা থেরাপির মতো ‘অ্যান্টি এজিং’ ট্রিটমেন্টের যুগে কেবল মুখে আলো ফেলে বা সুচ ফুটিয়েই তারুণ্য ধরে রাখা যায়। কত না চিকিৎসা এসে গিয়েছে! কত রকম থেরাপি, জিন নিয়ে গবেষণা চলছে। বার্ধক্য বলতে এক সময়ে মানুষ বুঝবে রোগ। আর সেই রোগ সারিয়ে বার্ধক্য থেকে ফের ‘যৌবন’-এ ফেরানো যাবে। বয়সের গতিকে রোধ করা বা মন্থর করে দেওয়ার যে সব পদ্ধতি নিয়ে বর্তমান সময়ে গবেষণা চলছে, তার মধ্যে একটি ‘হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি’ (এইচবিওটি)। কেউ বলছেন বয়স কমানোর চিকিৎসা, আবার কেউ বলছেন জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা রোগমুক্তির দিশা। কাজ যেমনই হোক, ধারণা পুরনো, কিন্তু মোড়কটি এক্কেবারে নতুন। শতাব্দীপ্রাচীন এক থেরাপিকে নতুন আঙ্গিকে নিয়ে আসা হয়েছে। পশ্চিমী দুনিয়ার ধনকুবেররা এর ব্যবহার শুরু করেছেন আগেই, পরবর্তীতে দিল্লি ও মুম্বইয়ে এর প্রয়োগ শুরু হয় নানা ক্ষেত্রে। এখন কলকাতাতেও হচ্ছে।

ভেলকি দেখাবে অক্সিজেন

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি এক রকম চিকিৎসা যা অক্সিজেন দিয়ে করা হয়। বোটক্স বা হাইড্রা ফেশিয়াল অথবা লেজ়ারের মতো ত্বকের কোনও ট্রিটমেন্ট নয়। এমন এক চিকিৎসা যা শুধু ত্বক নয়, শরীরের ভিতরের কোষগুলিকেও সজীব করে তুলতে পারে। অর্থাৎ, চিকিৎসাটি গোটা শরীরের। এতে যেমন চেহারায় সতেজ ভাব আসে, তেমনই অনেক নাছোড়বান্দা রোগ থেকেও মুক্ত হওয়া যায়। বিষয়টির ব্যাপ্তি বেশি, কার্যকারিতা অনেক। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলে ‘নন-ইনভেসিভ মেডিক্যাল ট্রিটমেন্ট’, যাতে ছুরিকাঁচি চালানোর প্রয়োজন হয় না। হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি তেমনই এক পদ্ধতি।

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি।

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি। ছবি: ফ্রিপিক।

চিকিৎসা তো অনেকই হয়। সেটিই নজর কাড়ে, যার মধ্যে নতুন কিছু থাকে। তখন সেটি নিয়েই খবর হয়। হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি তার ধরনধারণে আর পাঁচটা থেরাপির চেয়ে অনেক আলাদা। এখানেই তার বিশেষত্ব। আর সে কারণেই এর ভার বেশি। জনপ্রিয়তাও। তর্ক-বিতর্ক এবং সমালোচনার পরিধিও অনেক ব্যাপ্ত। থেরাপিটি করা হয় এক বদ্ধ কক্ষে বা চারদিক ঢাকা কাচের বিশাল চেম্বারে। তার মধ্যে বসিয়ে বা শুইয়ে দেওয়া হয়। যিনি ঢুকছেন, তাঁর শরীরের মাপেই হয় চেম্বার। সেখানে বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক চাপের চেয়ে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি চাপে বিশুদ্ধ অক্সিজেন পাঠানো হয়। ফুসফুস স্বাভাবিক অবস্থায় যে পরিমাণ অক্সিজেন গ্রহণ করে, উচ্চচাপে তার চেয়ে বহুগুণ বেশি অক্সিজেন সরাসরি রক্তের প্লাজমায় মিশে যায়। ফলে শরীরের প্রতি কোষে, এমনকি যেখানে রক্ত চলাচল বাধা পাচ্ছে, সেখানেও পৌঁছে যায় জীবনীশক্তি। কোষে কোষে অক্সিজেন ছুটতে শুরু করে দুরন্ত গতিতে। প্রাণ পায় ঝিমিয়ে পড়া কোষ। নতুন করে শক্তি প্রবাহিত হয় শিরা-উপশিরায়। এতেই সতেজ হয়ে ওঠে শরীর।

প্রচারের আলোয়

ইজ়রায়েলের তেল আভিভ ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা হাইপারবারিক থেরাপিকে যৌবন ধরে রাখার চিকিৎসার সঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। দাবি করেন, টানা কয়েক মাস থেরাপিটি নিলে শরীরের জৈবিক ঘড়ি উল্টো পথে ছুটতে শুরু করবে। সেই গবেষণাপত্রটি নিয়ে খবর হয়। থেরাপিটির নাম প্রকাশ্যে আসে। কেউ বলেন, যৌবন ধরে রাখার চিকিৎসা তবে এসে গেল, আবার কেউ বলেন, সবই বুজরুকি! ‘পাবমেড’ থেকেও হাইপারবারিক থেরাপি নিয়ে একাধিক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে পরে। কোনওটিতে বয়স কমানোর উল্লেখ আছে, আবার কোনওটিতে থাইরয়েড, ডায়াবিটিস, অনিদ্রা, অটিজ়ম-সহ মানসিক ও স্নায়বিক নানা রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার দিশা দেখানো হয়েছে।

উচ্চচাপে শরীরে অক্সিজেন পাঠিয়ে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা হয় হাইপারবারিক চেম্বারে।

উচ্চচাপে শরীরে অক্সিজেন পাঠিয়ে রোগ নিরাময়ের চেষ্টা হয় হাইপারবারিক চেম্বারে। ছবি: সংগৃহীত।

ক্যানসারের মতো রোগের চিকিৎসার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই থেরাপি।

ক্যানসারের মতো রোগের চিকিৎসার কাজেও ব্যবহার করা হচ্ছে এই থেরাপি। ছবি: সংগৃহীত।

তবে ক’জনই বা গবেষণাপত্র পড়ে নতুন জিনিস জানার চেষ্টা করেন। যে কোনও বিষয় তখনই নজর টানে, যখন তারকা বা কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি সেটিকে প্রচারের আলোয় আনেন। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। আমেরিকার উদ্যোগপতি তথা এ কালের ‘যযাতি’ ব্রায়ান জনসন যখন হাইবারবারিক থেরাপি নিয়ে যৌবন ফিরে পাওয়ার কথা বলেন, তখন কৌতূহল তৈরি হয়। তা আরও বাড়ে জাস্টিন বিবার, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, কেট উইন্সলেট, ম্যাডোনার মতো তারকাদের দেখে। তাঁদের কেউ ফিট থাকতে আবার কেউ ক্ষত সারাতে হাইপারবারিক থেরাপির ব্যবহার করতে শুরু করেন। ইন্টারনেট খুঁজে জানা যায়, মাইকেল জ্যাকসনও এক সময়ে অক্সিজেন চেম্বারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে থাকতেন। বিদেশি ধনকুবেররা শুধু নন, এ বিষয়ে পিছিয়ে নেই বলিউডও। হাইপারবারিক থেরাপি নিয়ে শরীর ও মনে যৌবন ধরে রাখার দাবি করেছেন সত্তর ছুঁইছুঁই অনিল কপূরও। ব্যক্তিগত এক পোস্টে তাঁকে অক্সিজেন চেম্বারে মুখে মাস্ক পরে শুয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে। একই ভাবে দেখা গিয়েছে বলি তারকা টাইগার শ্রফকেও। অর্থাৎ, বিষয়টি আর শুধু প্রচারে নেই, ব্যবহারেও রয়েছে।

অক্সিজেন চেম্বারে অনিল কপূর।

অক্সিজেন চেম্বারে অনিল কপূর। ছবি সূত্র: এক্স (সাবেক টুইটার)।

শতাব্দীপ্রাচীন থেরাপি নতুন মোড়কে

হাইপারবারিকের ধারণা আজকের নয়। দীর্ঘসময় ধরে যে নাবিকেরা সমুদ্রযাত্রা করতেন বা ডুবুরিরা সমুদ্রের অতল নামতেন, তাঁদের শরীরের নানা কোষের বিকৃতি হত। মানসিক বিপর্যয়ও ঘটত। এমন সব জটিল অসুখ হত, যা সারানোর মতো চিকিৎসা ছিল না। তখন উচ্চচাপযুক্ত চেম্বারে রেখে তাঁদের চিকিৎসা হত। প্রথম এটিকে চিকিৎসার রূপ দেন ব্রিটিশ ধর্মযাজক নাথানিয়েল হেনশ। তিনি একটি চারদিক বন্ধ ঘর তৈরি করেছিলেন, যেখানে বাতাসের চাপ খুব বেশি। এই ঘরের নাম দিয়েছিলেন ‘ডোমিসিলিয়াম’। এটিই আজকের হাইপারবারিক চেম্বারের আদিরূপ। একে বায়ুচাপের চিকিৎসা বলা হত সে সময়ে। ফুসফুসের অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা হত সেখানে।

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির আদিরূপ। হেনশ-র ডোমিসিলিয়াম।

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপির আদিরূপ। হেনশ-র ডোমিসিলিয়াম। ছবি: সংগৃহীত।

১৮৩০-এ ফ্রান্সে এটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। নাম হয় ‘এয়ার বাথ ট্রিটমেন্ট’। সেখানেও ফুসফুসের রোগের চিকিৎসাই হত। ১৮৩৭ সালে ফরাসি চিকিৎসক চার্লস প্রভাজ় এমন বিশাল এক হাইপারবারিক চেম্বার তৈরি করেন, যেখানে একসঙ্গে ১২ জন রোগীর বসার জায়গা ছিল। এই চেম্বারে ফুসফুসের রোগ ছাড়াও, যক্ষ্মা, কলেরা, ল্যারেঞ্জাইটিস, কনজাঙ্কটিভাইটিসের মতো রোগের চিকিৎসাও হত।

হাইপারবারিকের ধারণা বহু পুরনো। এক সময়ে ফুসফুসের রোগ সারাতে এর ব্যবহার হত।

হাইপারবারিকের ধারণা বহু পুরনো। এক সময়ে ফুসফুসের রোগ সারাতে এর ব্যবহার হত। ছবি: সংগৃহীত।

বদ্ধ কক্ষে কৃত্রিম ভাবে উচ্চচাপ তৈরি করে অনেক দুরারোগ্য ব্যাধির নিরাময় সম্ভব বলেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন ফরাসিরা। ১৮৭৭ সালে আরও একজন ফরাসি চিকিৎসক হাইপারবারিক অস্ত্রোপচার কক্ষই তৈরি করে ফেলেছিলেন। এমন এক অপারেটিং রুম যেখানে উচ্চচাপে অক্সিজেন পাঠিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করা হত। চিকিৎসক মনে করতেন, এতে হার্নিয়ার মতো রোগও সেরে যেতে পারে।

১৯০০ সালের গোড়ায় ডুবুরিদের চিকিৎসার জন্য এর ব্যবহার শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির নবজাত পুত্রকে বাঁচাতে এই থেরাপির প্রয়োগ করা হয়েছিল। জন্মের অব্যবহিত পরেই ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত হয় শিশুটি। আশা করা হয়েছিল যে, উচ্চচাপে ১০০ শতাংশ বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিয়ে শিশুর ফুসফুসে প্রাণবায়ুর সঞ্চার করা যাবে। যদিও সে সময়ে এই থেরাপি ব্যর্থ হয়। অবশ্য বর্তমানে এর ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। শুধু ফুসফুসের রোগের চিকিৎসা নয়, আরও নানা রোগের চিকিৎসাও এই থেরাপি দিয়ে করা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। নৌবাহিনীতে হাইপারবারিক থেরাপি বেশ প্রসিদ্ধ। যুদ্ধজাহাজে দিনের পর দিন যাঁরা কাটান বা যাঁরা সাবমেরিনে থাকেন, তাঁদের চিকিৎসার জন্য এই থেরাপির প্রয়োগ হয়।

১২ জন রোগী বসতে পারেন, এমন হাইপারবারিক চেম্বার তৈরি করেছিলেন ফরাসি চিকিৎসক।

১২ জন রোগী বসতে পারেন, এমন হাইপারবারিক চেম্বার তৈরি করেছিলেন ফরাসি চিকিৎসক। ছবি: সংগৃহীত।

১৮৩৭ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহরে হাইপারবারিক থেরাপি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

১৮৩৭ থেকে ১৮৭৭ সালের মধ্যে ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহরে হাইপারবারিক থেরাপি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে। ছবি: সংগৃহীত।

কলকাতাতে হাইপারবারিক

দিল্লি-মুম্বইয়ে অনেক আগে থেকেই হাইপারবারিক থেরাপি শুরু হয়েছে। এখন কলকাতাতেও হচ্ছে। কিছু হাসপাতালে অক্সিজেন চেম্বার আছে, যেখানে নানা রোগের চিকিৎসা করা হয়। আর আছে ‘বায়ু প্রাণা’ নামে এক ক্লিনিকে। সেখানকার কর্ণধার স্নিগ্ধা শীল বলেন, ‘‘অ্যান্টি-এজিং থেরাপি শুধু নয়, জীবনধারার সঙ্গে সম্পর্কিত যে সব রোগ বেশি ভোগায়, যেমন ডায়াবিটিস, থাইরয়েড, পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), নানা রকম মানসিক ব্যাধি, অবসাদ, অনিদ্রার সমস্যা দূর হতে পারে এই থেরাপিতে। ডায়াবিটিক ফুট আলসারে পা কেটে বাদ দেওয়ার প্রয়োজনই নেই। ক্ষতের নিরাময় হতে পারে অক্সিজেন থেরাপিতেই।’’ অটিজ়মে আক্রান্ত শিশু থেকে দীর্ঘকালীন অবসাদে ভোগা বৃদ্ধ বা মানসিক আঘাতে জর্জরিত কারও চিকিৎসাও হতে পারে এই থেরাপি দিয়ে। এর ক্ষেত্রটি আরও প্রসারিত। ক্যানসারের চিকিৎসায় দীর্ঘকালীন রেডিয়েশন নেওয়ার ঝুঁকি কমাতে পারে হাইপারবারিক থেরাপি। যাঁর কথা বলার সমস্যা আছে, হঠাৎ করে কানে শুনতে পাচ্ছেন না, তিনিও করাতে পারেন এই থেরাপি। আবার খেলতে গিয়ে আঘাত লাগা, বহু পুরনো কোনও ক্ষতের চিকিৎসাও হতে পারে। এক একটি সেশনের খরচ ২০৫০ থেকে শুরু করে ৫০০০ বা ৭০০০ টাকা হতে পারে। যে রোগের চিকিৎসা হবে, সেই অনুযায়ী খরচ। কতগুলি সেশন নিতে হবে, তা রোগীকে পরীক্ষা করে ও তাঁর সঙ্গে কথা বলেই ঠিক করা হবে।

বিজ্ঞান বনাম বিশ্বাস— চিকিৎসক মহলে টানাপড়েন

হাইপারবারিক অক্সিজেন থেরাপি কতটা সফল, আদৌ রোগ সারায় কি না, তা নিয়ে চিকিৎসক মহল দ্বিধাবিভক্ত। এর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল সফল হলেও, রোগমুক্তির সম্ভাবনা কতটা, সে বিষয়ে সংশয় আছে স্নায়ুরোগ চিকিৎসক অনিমেষ করের। অ্যালঝাইমার্স বা অটিজ়মের মতো রোগের চিকিৎসা অক্সিজেন দিয়েই হয়ে যাবে, তা এখনই মানতে চাইছেন না তিনি। একই মত স্ত্রীরোগ চিকিৎসক ও রিজেনারেটিভ মেডিসিনের গবেষক মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়ের। তাঁর কথায়, ‘‘অক্সিজেন যেমন জীবনীশক্তি দেয়, তেমন এর বিষক্রিয়াও হয়। প্রাগৈতিহাসিক যে সব প্রাণী বা উদ্ভিদ দীর্ঘ সময়ে বেঁচে থাকত, তাদের শরীরে অক্সিজেন কম যেত। ‘ও২’ এর দু’টি অক্সিজেনের একটি শ্বাসের কাজে লাগে, অন্যটি শরীরে থেকে যায়। যদি আরও বেশি অক্সিজেন দেওয়া হয়, তা হলে সব ক'টিই ফ্রি র‌্যাডিক্যাল হয়ে টক্সিন তৈরি করবে। তখন যুবক হতে গিয়ে হিতে বিপরীত হবে।’’

এইচবিওটিকে ‘ম্যাজিক থেরাপি’ বলে চালানো হচ্ছে বলেই মনে করেন ত্বক চিকিৎসক কৌশিক লাহিড়ী। এর যে কোনও সুফল নেই, তা নয়। কৌশিকবাবুর মতে, রেডিয়েশন থেরাপি যাঁরা করান, তাঁদের জন্য বা স্ট্রোকের পরবর্তী সময়ের দুর্বলতা কাটাতে, ক্ষত নিরাময়ে, ডায়াবিটিক ফুট আলসারের চিকিৎসায় এইচবিওটি অনেক ক্ষেত্রেই সফল। তবে এটি করে যে বয়স কমানো যাবে, তা বলা যায় না। বৃদ্ধের ত্বক যুবকের মতো হয়ে যাবে, তা-ও মানা যায় না।

সবই কোষের খেলা

বয়স যত বাড়ে, ততই ছোট হতে থাকে ক্রোমোজ়োমের টেলোমেয়ার।

বয়স যত বাড়ে, ততই ছোট হতে থাকে ক্রোমোজ়োমের টেলোমেয়ার। ছবি: শাটারস্টক।

হাইপারবারিক থেরাপিকে যৌবন ফেরানোর চিকিৎসা কেন বলা হচ্ছে, তার আরও একটি কারণ আছে। সে ব্যাখ্যা দিয়েছেন কলকাতার চিত্তরঞ্জন ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের প্লাস্টিক ও কসমেটিক সার্জন সৌরদীপ গুপ্ত। এই বিষয়টি জিনগত। লক্ষ-কোটি কোষ দিয়ে শরীর গড়ে ওঠে। কোষের জন্ম হয়, আবার মৃত্যুও। কোষ যত দিন বেঁচে থাকে, তত দিন ভাঙতে থাকে, যাকে বলে ‘বিভাজন’। কোষের মধ্যেই থাকে ডিএনএ। সেগুলি সরু সুতোর মতো, ক্রোমোজ়োমের ভিতর সাজানো থাকে। এই ডিএনএ বংশ পরম্পরায় খবর বয়ে চলে এক জনের থেকে অন্য জনে। কোষ যত বার ভাঙে, তত বার এই ডিএনএ-ও ভাঙে। তার নতুন প্রতিচ্ছবি বা ‘কপি’ তৈরি হয়। সেই প্রতিচ্ছবি নিয়েই আবার নতুন কোষ তৈরি হয়। কিন্ত সমস্যা তৈরি হয় অন্য জায়গায়। ডিএনএ-র প্রতিচ্ছবি তৈরি করতে গিয়ে কোষ বারে বারেই ভুল করে ফেলে। এই ভুল ঠেকানোর জন্য ক্রোমোজ়োমের শেষ প্রান্তে এক রকমের নিষ্ক্রিয় ডিএনএ-র ‘টুপি’ পরিয়ে দেওয়া হয়, যাকে বলে টেলোমেয়ার। কোষ যত ভাঙে, ততই ওই টেলোমেয়ার অংশটি ছোট হতে থাকে। এক সময়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। আর তখনই কোষের মৃত্যু ঘটে। এই ভাবেই ক্রোমোজমের ‘টেলোমেয়ার’ কতটা লম্বা, তার উপর আয়ু নির্ভর করে। দীর্ঘজীবী হতে গেলে, টেলোমেয়ারকে নিশ্চিহ্ন হতে দেওয়া যাবে না। হাইপারবারিক থেরাপি সে কাজটি করতে পারবে বলে দাবি করা হয়েছে।

বিশ্বাস আর বাস্তবের মধ্যে সূক্ষ্ম সীমারেখা আছে। হাইপারবারিক থেরাপি নিয়ে যা যা বিশ্বাসের ভিত গড়ে উঠছে, তা বাস্তবে কার্যকরী হবে কি না, তা সময়ই বলবে।

hyperbaric oxygen therapy Anti Ageing Reverse Ageing Diabetes Thyroid Lung Diseases Cancer
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy