ব্যথাটা প্রথমে শুরু হয় পায়ে। শিরা-উপশিরাগুলি ফুলে উঠতে শুরু করে। তার পরে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন বছর একান্নর মহিলা। বুকে চাপ চাপ ব্যথা, শ্বাসকষ্ট ও কাশির সঙ্গে রক্ত বার হলে, ফুসফুসের ক্যানসারই ভেবে নেন তাঁর পরিবারের লোকজন। পরে পরীক্ষা করিয়ে ধরা পড়ে, ক্যানসার নয়, বরং ফুসফুসেরই অন্য এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। এমন এক রোগ যা শুধু ফুসফুসে নয়, ছড়িয়ে পড়ে হার্টেও। এ দিকে, রোগটির সূত্রপাত হয় পায়ের শিরা থেকে। এমনই এক দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে মহিলাকে সুস্থ করেছেন মুম্বইয়ের চিকিৎসকেরা।
বোধ হয় হার্ট অ্যাটাকের মতো, অথচ হৃদ্রোগ নয়। আবার পায়ে এমন ব্যথা হয় যে, মনে হবে আর্থ্রাইটিস। অথচ তা-ও নয়। এমনই এক বিচিত্র রোগ পালমোনারি এমবলিজ়ম, যা নিয়ে আলোচনা কমই হয়। সাধারণত হার্টের ব্যামো, ফুসফুসের রোগ বা বাতের ব্যথাবেদনা নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। কিন্তু এই তিন রোগের সংমিশ্রণ এমন এক ব্যাধি, যা প্রচারের আড়ালেই থেকে যায় বেশির ভাগ সময়ে। মুম্বইয়ের মহিলার ক্ষেত্রে রোগটি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যে মরণাপন্ন অবস্থা থেকে তাঁকে উদ্ধার করতে হয় চিকিৎসকদের। তাই রোগটি নতুন করে নজর কাড়ে ও সেটি নিয়ে খবরও হয়।
আরও পড়ুন:
পালমোনারি এমবলিজ়ম এমন এক রোগ, যেখানে ফুসফুসের ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। ফুসফুস এবং হার্টের মাঝে থাকা পালমোনারি ধমনীতে রক্ত জমাট বেঁধে ডেলা পাকিয়ে যায়। এতে শরীরে অক্সিজেন কম ঢোকে ও রোগীর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। রোগটির সূচনা হয় পা থেকে। প্রথমে পায়ের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধতে থাকে। অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়। শিরায় টান ধরে। রক্ত যদি জমাট বেঁধে ডেলার মতো হয়ে যায়, তা হলে তাকে বলে ‘ডিপ ভেন থ্রম্বোসিস’। কিন্তু তা শুধু পায়েই থেমে থাকে না। রক্ত জমতে জমতে ফুসফুস অবধি গিয়ে পৌঁছয়। তার পরেই শুরু হয় কাশি, ও কাশির সঙ্গে রক্ত বার হতে শুরু করে। রোগীর দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে, চাপ পড়ে হার্টের উপরেও। কারণ, শিরা ও ধমনী দিয়ে রক্তের আসা-যাওয়ার প্রক্রিয়াটিই অবরুদ্ধ হতে শুরু করে। ফলে মনে হয় বুকে ভারী পাথর চেপে রয়েছে। হৃদ্রোগ বলেও ভ্রম হয় অনেক সময়ে।
কাদের হতে পারে?
অন্য নানা রকম শারীরিক ব্যাধির কারণে রোগটি হতে পারে। যেমন রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা যাঁদের আছে, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের রোগী, পক্ষাঘাত রয়েছে এমন রোগী বা ক্যানসারে ভুগছেন, এমন রোগীরও হতে পারে এই রোগ। তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, বর্তমান সময়ে যাঁরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে বা দাঁড়িয়ে কাজ করেন, শরীরচর্চার ধার ধারেন না, তাঁদের রোগটি হওয়ার ঝুঁকি বেশি। রোগটি কেবল বয়স্কদের নয়, ২০ বা ৩০ বছর বয়সেও হতে পারে। কারও যদি ঘন ঘন পায়ের পেশিতে টান ধরে, হাঁটু এবং গোড়ালির মধ্যবর্তী পেশিতে যন্ত্রণা হতে থাকে এবং সেই সঙ্গেই নাগাড়ে কাশি বা বুকে ব্যথার সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে সাবধান হতে হবে।
রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। পালমোনারি এমবলিজ়ম হয়েছে কি না, তা বোঝার জন্য পালমোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি করেন চিকিৎসকেরা। পাশাপাশি, রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান এবং ভেন্টিলেশন-পারফিউসন স্ক্যানিং টেস্টও করা হয়। রোগীর অবস্থা দেখে এবং রোগটি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বুঝে উপযুক্ত চিকিৎসা করা হয়।