মশা তাড়াতে কামান দেগেও লাভ বিশেষ হচ্ছে না। বিশ্ব জুড়ে বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামাচ্ছেন। এ দিকে পাল্লা ভারী হচ্ছে মশারই। হাজার চেষ্টা করেও বিনাশ করা যায়নি অ্যানোফিলিস স্টিফেনসাই, এডিস ইজিপ্টাই এবং কিউলেক্স বিশনোই মশার বংশ। যে হেতু পশ্চিমবঙ্গে ওই তিন মশারই বংশবিস্তারের অনুকূল পরিস্থিতি রয়েছে, তাই ফি বছর ওই তিন ধরনের মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ছে। তার মধ্যে ডেঙ্গির উৎপাতই বেশি। ডেঙ্গি আবার চরিত্র বদলে ফেলছে, এমন আশঙ্কা করেছেন বিজ্ঞানীরা। এর জন্য দায়ী করা হয়েছে তাপমাত্রার বদলকেই। তাপমাত্রা যত বাড়বে, ততই স্বরূপ বদলাবে ডেঙ্গি ভাইরাস। ভয়ের কারণ এটাই।
ডেঙ্গি নিয়ে খবর অনেক হয়। এখন আবারও ডেঙ্গি নিয়ে হইচইয়ের কারণ হল বিজ্ঞানীদের পাওয়া নতুন কিছু তথ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) ও গ্লোবাল ক্লাইমেট রিপোর্ট জানাচ্ছে, উষ্ণায়নের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, বদল আসছে স্থানীয় আবহাওয়ার চরিত্রে। বৃষ্টি আসার সময়েও এলোমেলো হয়ে গিয়েছে এখন। এই সবই ডেঙ্গির মশার বংশবৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা নিচ্ছে। তাপমাত্রার বদলে ডেঙ্গি ভাইরাসও তার চরিত্র বদলে ফেলছে। ভাইরাসের জিনে এমন রাসায়নিক বদল হচ্ছে (মিউটেশন) যা এর সংক্রামক ক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ওয়ার্ল্ড মিটিয়োরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউএমও)-র রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫, এই ১০ বছরে জলবায়ুর চরিত্রে বদল এসেছে। ভূত্বকের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির ‘সীমা’ (১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস) পেরিয়ে গিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ২০২৫ থেকে ২০২৯ এই পাঁচ বছরের গড় উষ্ণতাও এই সীমা টপকে যেতে পারে। আর তাপমাত্রা যত বাড়বে, ততই ভাইরাস তার নতুন নতুন উপরূপ তৈরি করে ফেলবে। তখন একে প্রতিরোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
আরও পড়ুন:
আইসল্যান্ডিক ইনস্টিটিউট অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি-র গবেষকেরা আরও ভয় ধরানো তথ্য দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ডেঙ্গি এখন আর কেবল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সংক্রামক রোগ নয়। শীতপ্রধান দেশেও পৌঁছে গিয়েছে ডেঙ্গির মশা। কারণ সে সব অঞ্চলেও তাপমাত্রা বাড়ছে। আইসল্যান্ডেও ইদানীংকালে পাওয়া গিয়েছে ডেঙ্গির মশা যা আগে কখনও হয়নি।
ডেঙ্গির কেবল দাপট বাড়ছে তা নয়, এই ভাইরাসের মিউটেশন বা রাসায়নিক বদলও ঘটে চলেছে একই সঙ্গে। ডেঙ্গি ভাইরাসের নতুন উপরূপ ডেন-৩ ইতিমধ্যেই ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। ভাইরাসের এই উপরূপটি অনেক বেশি সংক্রামক। তাই ডেঙ্গি সংক্রমণ হলে এখন উপসর্গের ধরনেও বদল আসছে। শুধু জ্বর বা সারা গায়ে র্যাশ নয়, রোগীর ‘মাল্টি অর্গ্যান ফেলিওয়র’-এর ঝুঁকি বাড়ছে। সেই সঙ্গে রক্তক্ষরণ শুরু হচ্ছে শরীরের ভিতরে। প্লেটলেট তো কমছেই, পাশাপাশি, হার্ট-লিভারের মতো অঙ্গেও প্রভাব ফেলছে ডেঙ্গি। শরীরে জল জমছে অনেকের। জল জমছে ফুসফুসেও। শুধু তাই নয়, জ্বরের সঙ্গে খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বুকে ব্যথা, জন্ডিস, কিডনির সমস্যা দেখা গেলে ডেঙ্গির আশঙ্কার কথা মাথায় রাখতে হবে। জ্বর ও পেট খারাপের উপসর্গ দেখা দিলেই এনএস-১ কিংবা আইজিএম (অ্যালাইজ়া) পরীক্ষার মাধ্যমে দেখে নিতে হবে ওই রোগী ডেঙ্গি আক্রান্ত কিনা। দেরি করা চলবে না। তা হলেই সারা শরীরে কব্জা করে ফেলবে ডেঙ্গি ভাইরাস।