এত ক্ষণ কথা বলছিলেন একটানা। সিনিয়র আইনজীবীদের প্রশ্নের উত্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি পাটিয়ালা হাউস কোর্ট চত্বরে কী ভাবে তাঁকে বেধড়ক পিটিয়েছিল আইনজীবীর পোশাক পরা এক দল লোক।
কানহাইয়া কুমারের গলাটা এ বার হঠাৎ কেঁপে গেল। ‘‘ম্যায় নে জজসাহাব সে কাহা— স্যার, ম্যায় ইস দেশ কা এক নওজওয়ান হুঁ। ম্যায় জেএনইউ-মে পড়তা হুঁ। পিএইচডি করতা হুঁ...।’’
কয়েকটা হাত এগিয়ে এল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের সভাপতির কাঁধে।’’ নরম গলায় কেউ এক জন বললেন, ‘‘রোও মত।’’ কানহাইয়া তবু কথাটা শেষ করলেন, ‘‘দেশের সংবিধানের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।’’
বিভিন্ন চ্যানেলে আজ দেখানো হচ্ছিল কানহাইয়ার কথা। গত ১৭ তারিখে অপেশাদার হাতে তোলা একটা ভিডিও। ওই দিনই রাষ্ট্রদ্রোহে অভিযুক্ত ছাত্র নেতার সঙ্গে দেখা করেছিলেন, সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগ করা প্যানেলের আইনজীবীরা। যে প্যানেলে রয়েছেন কপিল সিব্বল, দুষ্মন্ত দাভে, রাজীব ধবন-সহ ছ’জন সিনিয়র আইনজীবী। কানহাইয়ার সঙ্গে তাঁদের কথোপকথনের
গোটাটাই ভিডিও করে রেখেছিলেন প্যানেলের আর এক সদস্য হরেন রাভাল। সর্বোচ্চ আদালতেও সেটি জমা পড়েছে।
সেই ভিডিওই এসেছে সংবাদমাধ্যমের হাতে। গালে অযত্নের দাড়ি, নীল-সাদা টি-শার্ট পরা কানহাইয়া যেখানে বলছেন, ‘‘আইনজীবীর পোশাক পরে এক দল লোক অনেক আগে থেকেই কোর্ট চত্বরে অপেক্ষা করছিল। আমি ছিলাম তাদের নিশানা!’’
জেএনইউ কাণ্ডে সে দিনই প্রথম আদালতে পেশ করা হয়েছিল কানহাইয়াকে। তাঁর কথায়, ‘‘গাড়ি থেকে শুধু নামার অপেক্ষা। মুহূর্তে ঘিরে ফেলেছিল ভিড়টা। উড়ে আসছিল কিল-চড়-ঘুষি। সঙ্গে গালিগালাজ-হুমকি। কেউ একটা তুলে আছাড়ও মারল আমায়। লাথি খেলাম পেটে। দু’হাতে মাথা ঢেকে বেশ কিছু ক্ষণ মার খাওয়ার পর এক জন পুলিশ কোনও মতে আমায় ঢুকিয়ে দিলেন আদালতে। প্রাণে বাঁচলাম! পাশে থাকা এক পুলিশকর্মীও মারের হাত থেকে রেহাই পাননি।’’
পুলিশের ভূমিকার কথা খুঁটিয়ে জানতে চাইছিলেন আইনজীবীরা। কানহাইয়া তাঁদের বলেন, নিজে আক্রান্ত হওয়ার পরে আর ভাল ভাবে দেখতে পাননি, পুলিশ তখন কী করছিল। তা বলে পুলিশকে ক্লিনচিটও দেননি তিনি। বরং বলেছেন, হামলাকারীদের নেতৃত্ব দেওয়া এক ব্যক্তিকে তিনি ও তাঁর সঙ্গে থাকা এক অধ্যাপক চিনতে পেরে পুলিশকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তাকে বিনা বাধায় চলে যেতে দেয়। কানহাইয়ার কথায়, ‘‘আইনজীবীর পোশাক পরা ওই ব্যক্তি পরে আদালতের দর্শকাসনে গিয়ে বসে। তাকে ধরার জন্য আমরা পুলিশকে অনুরোধ করি। কিন্তু ওই আইনজীবী পুলিশকেই চ্যালেঞ্জ করেছিল। তার পর সে চলেও যায়।’’
কানহাইয়া যখন এই কথা বলছেন, তখন ওই ঘরে দাঁড়িয়ে এক তরুণ আইপিএস। মাঝেমাঝেই অসন্তুষ্ট গলায় তাঁর কাছে এটা-ওটা জানতে চাইছিলেন প্যানেলের আইনজীবীরা। তিনি— দিল্লির ডেপুটি পুলিশ কমিশনার যতীন নারওয়াল খুব একটা যে কথা বলছিলেন তা নয়। তবে যেটুকু বলছিলেন, তাতে আইনজীবীরা সন্তুষ্ট হচ্ছিলেন, এ
কথা বলা চলে না। কানহাইয়ার নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন যতীনই। আইনজীবীরা জানতে চান, ‘‘পুলিশ থাকা সত্ত্বেও কেন হামলাকারীকে ধরা গেল না? আপনাদের ওপর কি নির্দেশ ছিল না-ধরার?’’
জবাবে মুখ খোলেননি ওই পুলিশকর্তা। আইনজীবীরা তখন তাঁকে বলেন, ‘‘অবিশ্বাস্য ঘটনা! কানহাইয়ার সুরক্ষা ও তাঁর ভাল-মন্দের দায়িত্ব এখন আপনার। মনে রাখবেন, এখন আপনি পুলিশ কমিশনার বস্সীর কথায় নয়, কাজ করছেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে!’’
যতীন এর আগে এক বার অবশ্য বলেছিলেন, ‘‘কানহাইয়ার সঙ্গে পুলিশের একটি দল ছিল। কিন্তু মারমুখী ভিড়ের সামনে তারা সংখ্যায় অনেক কম ছিল।’’ ক্ষুব্ধ কপিল সিব্বল তখন তাঁকে বলেন, ‘‘আপনি বলছেন পুলিশ ছিল। তার পরেও কানহাইয়া এ ভাবে মার খেয়েছেন। এর থেকে প্রমাণ হচ্ছে, পুলিশ কানহাইয়াকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।’’ জবাবে আর কিছু বলেননি ওই পুলিশকর্তা। তবে সূত্রের খবর, জেলের ভেতরেও কানহাইয়ার ওপর হামলার আশঙ্কা করছে পুলিশ। তাই জেলেও তাঁর জন্য বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা হয়েছে। মামলায় পরবর্তী শুনানি হবে ২ মার্চ।
ভিডিওয় কানহাইয়া নিজেও বলেছেন, ‘‘বিচারককে জানিয়েছিলাম, আমার প্রাণ বিপন্ন। তিনিও বলেছেন, এই আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।’’ তার পর মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘আমি সংবিধানে আস্থা রাখি। আমার বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনাটা অর্থহীন।’’