Advertisement
E-Paper

জাদু দেখিয়েছে জোট-কৌশল, মেজাজে রাহুল

হাসলে তাঁর গালে টোল পড়ে। আর আজ যেন হাসি থামছেই না! পরস্পরের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা দুই ‘লোহিয়া কে লোগ’ লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারকে কাছে এনে ইন্দ্রপতন ঘটিয়েছেন যে!

শঙ্খদীপ দাস

শেষ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৫ ০৪:০১
উচ্ছ্বসিত। নয়াদিল্লির দলীয় কার্যালয়ে কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধী। ছবি: পিটিআই।

উচ্ছ্বসিত। নয়াদিল্লির দলীয় কার্যালয়ে কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধী। ছবি: পিটিআই।

হাসলে তাঁর গালে টোল পড়ে। আর আজ যেন হাসি থামছেই না! পরস্পরের থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকা দুই ‘লোহিয়া কে লোগ’ লালুপ্রসাদ ও নীতীশ কুমারকে কাছে এনে ইন্দ্রপতন ঘটিয়েছেন যে!

কংগ্রেস দফতরের দু’হাত দূরে পটকা ফাটছে দুমদাম। উঠোনে থই থই ভিড়। আদ্যন্ত ক্যাজুয়াল পোশাকে এগিয়ে এলেন তিনি। ডেনিম জিনসের সঙ্গে লিনেনের বুশ শার্ট। পায়ে চপ্পল। কিন্তু শরীরের ভাষা বলে দিচ্ছে, হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাচ্ছেন তিনি। বহু দিন পর উদ্দাম স্লোগানে উঠছে তাঁর নামে। কথা শুরু করতে গিয়েও তাই থামতে হল দু’বার। মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই কংগ্রেস সহসভাপতি রাহুল গাঁধী বললেন, ‘‘বলুন, কী প্রশ্ন আছে আপনাদের?’’

বেশি প্রশ্ন করতে হয়নি। নিজেই দৃঢ় গলায় পরামর্শ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে, ‘‘প্রচার থামান। ভাষণ বন্ধ করে কাজ শুরু করুন। কারণ, আপনার জন্য দেশটা এক বছর ধরে থমকে আছে।’’ হালে রাহুলের বক্তব্যে শ্লেষের মিশেল বেড়েছে। আজ তার ধার ছিল ঢের বেশি। মোদীর উদ্দেশে বললেন, ‘‘আপনার গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে না। গাড়িটা এ বার স্টার্ট করুন। অ্যাক্সিলারেটর চাপুন।’’

শেষ কবে এই দৃশ্য দেখেছে চব্বিশ নম্বর আকবর রোড? রাহুলকেও কী দেখা গিয়েছে এমন মেজাজে!

লোকসভা ভোটের আগে পর পর ন’টি নির্বাচনে হেরেছে কংগ্রেস। আর প্রতি বার ফল বেরনোর পরে কাঁচুমাচু মুখে এই উঠোনে এসেই দাঁড়িয়েছেন রাহুল। কখনও মাকে সঙ্গে নিয়ে। কখনও একা। হাসতেই যেন ভুলতে বসেছিল কংগ্রেস দফতর। কিন্তু জাতীয় রাজনীতির সেই বিষণ্ণ ঠিকানাই আজ উচ্ছ্বাসে আবির মাখল লালু-নীতীশের কাঁধে চেপে নতুন জীবন পেয়ে। দলের সেই মুডটাই কার্যত আজ অনুবাদ করে দিলেন রাহুল। বুঝিয়ে দিলেন, নরেন্দ্র মোদী নামে মহীরুহের এমন ধাক্কা খাওয়ার অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি! মোদী-আরএসএসের ‘বিভাজনের রাজনীতির’ বিরুদ্ধে এ বার এসপার ওসপার করতে চান তিনি।

বিহার ভোটে মহাজোটের জয়ের ছবি পরিষ্কার হতেই আজ দশ নম্বর জনপথের পাঁচিলের ফাঁক গলে দলীয় সদর দফতরে চলে আসেন রাহুল। তার পর বলেন, ‘‘এই জয় রাগ, ঘৃণা আর দম্ভের বিরুদ্ধে জয়। গোটা দেশে এই জয়ের গুঞ্জন হচ্ছে। মোদী, আরএসএসের কানে তা যাচ্ছে কি? এখনও শুনতে না পেলে, ভাল করে শুনে নিন। আপনাদের বিভাজনের রাজনীতিকে ছুড়ে ফেলেছে মানুষ।’’

গত বিধানসভা ভোটে বিহারে ৪টি আসন পেয়েছিল কংগ্রেস। এ বার পেয়েছে ২৭টি। পাটিগণিতের হিসেবে ছ’গুণ শক্তি বাড়লেও মহাজোটের সামগ্রিক জয়ের হিসেবে তা নগণ্য। কিন্তু শুধু জাতীয় রাজনীতির কুশীলবরাই নয়, কংগ্রেস নেতৃত্বও জানেন, এই ছবিটা আদতে খুবই ক্ষুদ্র। বড় ঘটনা হল, সনিয়া-রাহুলের কৌশলই সাফল্য পেল শেষ পর্যন্ত।

সর্বভারতীয় স্তরে দলের একক শক্তি বাড়াতে এক সময় একলা চলোর মন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছিলেন রাহুল। কিন্তু লোকসভা ভোটে ধরাশায়ী হওয়ার পর বুঝতে পারেন, বাস্তবের জমিতে সেই রোমান্টিকতা অচল পয়সা। মোদীকে পরাস্ত করতে হলে ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলিকে একজোট করা ছাড়া গীত নেই। আর কাজটা শুরু করা যেতে পারে বিহার ভোট থেকেই।

তাই বিহার ভোটের ছ’মাস আগে থেকে কৌশলে সেই পথে এগোতে থাকেন মা-ছেলে। রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা গুলাম নবি আজাদকে দূত করে বিহারে পাঠান সনিয়া। রামমনোহর লোহিয়া ও জয়প্রকাশ নারায়ণের দুই বিবদমান শিষ্য লালু-নীতীশের কাছে। শুরু হয় এ দু’জনকে এক বন্ধনীতে আনার প্রয়াস। ভোটের দু’মাস আগে যখন মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে নীতীশকে মেনে নেওয়ার প্রশ্নে বারবার টালবাহানা করছেন লালু, তখন চাপ বাড়াতে সাময়িক ভাবে দশ জনপথের দরজা তাঁর জন্য বন্ধও করে দেন সনিয়া। একই সঙ্গে দিল্লিতে নীতীশের সঙ্গে বৈঠক করে রাহুল বুঝিয়ে দেন, লালু বিলম্ব করলে প্রয়োজনে শুধু সংযুক্ত জনতা দলের সঙ্গে জোট গড়ে এগোবে কংগ্রেস। শেষ পর্যন্ত সেই কৌশলই সোনা ফলিয়েছে বিহারে। আজ ফল প্রকাশের পর তাই গুলাম নবি বলেন, ‘‘এই ঐতিহাসিক সাফল্যের সমান অংশীদার রাহুল। নীতীশ-লালু যদি জয়ের স্থপতি হন, তবে জোটের স্থপতি হলেন রাহুল।’’

প্রশ্ন হল, এ বার কী করবে কংগ্রেস? সে দিক থেকে কংগ্রেস দফতরের একটি বিষয় ছিল লক্ষণীয়। জয়ের আভাস পেয়েই সনিয়া আজ নীতীশ-লালুকে ফোন করেন ঠিকই। কিন্তু তিনি সামনে আসেননি। এগিয়ে দেন শুধু রাহুলকে। রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সেই পরিসরে দাঁড়িয়ে রাহুল বুঝিয়ে দেন, মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আগের থেকে অনেক বেশি আগ্রাসী অবস্থান নিয়ে এ বার দলকে নিয়ে মাঠে নামবেন তিনি। এমনিতেই দেশ জুড়ে অসহিষ্ণু পরিবেশের কারণে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষিত সমাজ ও বিশিষ্ট জনেদের একটি বড় অংশ ফুঁসছে। এই পরিস্থিতিতে অসহিষ্ণুতাই হোক বা কোনও বিলের প্রসঙ্গ, সংসদের ভিতরে-বাইরে মোদী সরকারকে নাস্তানাবুদ করতে চাইবেন রাহুল। বিহার ভোটের ফল জমি কিছুটা উর্বর করে দিল তাঁর জন্য। সেই মাটিতে ফসল ফলানোর চ্যালেঞ্জ এ বার রাহুলের সামনে।

ভোটের ফল প্রকাশের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দাবি করতে শুরু করেছেন, এ বার প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার হয়ে উঠলেন নীতীশ। তাঁর নেতৃত্বে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের সম্ভাবনাও তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু কংগ্রেস নেতাদের মতে, আপাতত বিহারে সুশাসন কায়েম করতে হবে নীতীশকে। জাতীয় স্তরে কংগ্রেসই এখনও প্রধান বিরোধী শক্তি। রাহুল নিজেও সেটা বুঝিয়ে দিয়েছেন আজ। সর্বভারতীয় স্তরে মোদী-বিরোধী লড়াইয়ের প্রধান মুখ হয়ে উঠতে চেয়েই এ দিন প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি হুমকি দেন রাহুল। বলেন, ‘‘দম্ভ, রাগ ছেড়ে এ বার কাজে মন দিন মোদীজি। লন্ডন, আমেরিকা ঘুরে বেড়ানোও বন্ধ করুন। তার বদলে কৃষক-মজুরের সঙ্গে দেখা করুন। নইলে যে গাড়ি চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, জনতা সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে আপনাকে নামিয়ে দেবে।’’ সেই সঙ্গে মোদী, বিজেপি ও সঙ্ঘকে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘‘হিন্দু-মুসলমানে লড়াই লাগিয়ে দিয়ে ভোটে জেতা যায় না। এ সব বন্ধ করুন।’’

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক প্রবীণ সদস্যের বিশ্লেষণ, কংগ্রেসের জন্য বিহারের সাফল্যের প্রাসঙ্গিকতা বহুমুখী। এর প্রথম প্রভাব পড়তে চলেছে দলের অন্দরের রাজনীতিতে। সরকারের জমি নীতির বিরোধিতায় নেমে রাহুল সাফল্য পেয়েছেন ঠিকই। কিন্তু মোদী-অমিত শাহদের বিরুদ্ধে রাহুলের নির্বাচনী সাফল্যের ঝুলি ছিল শূন্য। বিহারে সাফল্যের পর কংগ্রেস সভাপতি পদে রাহুলের অভিষেক এখন সময়ের অপেক্ষা। দিওয়ালির পরে তা যে কোনও দিন হতে পারে। সেই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক রদবদল ঘটিয়ে নিজের টিম ঘোষণা করে দেবেন রাহুল। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ভাবেও একটা শিক্ষা পেলেন রাহুল। কংগ্রেস সহসভাপতি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে এ ভাবে ঐক্যবদ্ধ করেই মোদীকে কুপোকাত করা যাবে। বিহার ভোটের পর উত্তরপ্রদেশে মায়াবতীর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট-সম্ভাবনাও এ বার বেড়ে গেল। অসমে জোটের সম্ভাবনা বাড়ল সংখ্যালঘু নেতা বদরুদ্দিন আজমলের সঙ্গে। বামপন্থী বিশিষ্ট জনেদের সঙ্গেও ইদানীং সমন্বয় করে চলছেন রাহুল। পশ্চিমবঙ্গে আসন্ন নির্বাচনের আগে যেটা তাৎপর্যপূর্ণ।

তবে একলা চলো নীতি থেকে সরে এলেও যাঁদের পাশে নিয়ে সাফল্য এল বিহারে, তাঁদের মধ্যে নীতীশের নাম বেশ ক’বার তুললেও, লালুর নাম রাহুলের মুখে এল মাত্র এক বারই! দলের অন্দরে প্রশ্ন, এর পিছনে কি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ? ধর্মনিরপেক্ষ সব দলকে এক সঙ্গে নিয়ে চলার পথে এই বাছবিচার বাধা হয়ে উঠবে না তো ভবিষ্যতে!

আর একটি বিষয়। লোকসভা ভোটে ভরাডুবির পরেই রাহুলের হাসিমুখের একটি ছবি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ ছড়িয়েছিল বিস্তর। আজ যখন তিনি সঙ্ঘ-বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক, চোয়াল শক্ত মোদী-বিরোধিতায়, তখনও হেসে ফেলেছেন বারবার। হাসি ওঁর থামছেই না!

Alliance strategy Alliance Bihar Election Rahul Gandhi Confidence shankhadeep das
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy