কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার ইতিমধ্য়েই বিভিন্ন পেশায় শুরু হয়েছে। কিন্তু বিচার ব্যবস্থায় এবং আইনজীবীদের পেশায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কি আদৌ উপযোগী, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে উষ্মাওপ্রকাশ করেছে।
এমনকি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্য নিয়ে রায় লিখে শীর্ষ আদালতের রোষের মুখে পড়েছেন নিম্ন আদালতের এক বিচারকও। আইনজীবীদের অনেকেও মেনে নিচ্ছেন, মামলার সওয়ালে অথবা আর্জিপত্র তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বিপদ ডেকে আনতে পারে। তবে তাঁরা এ-ও বলছেন, বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার পুরোপুরি এড়ানো যাবে না। বরং এর নির্দিষ্ট এবং পরিমিত ব্যবহার বহু ক্ষেত্রে পরিশ্রম ও সময়ওবাঁচাতে পারে।
সম্প্রতি সম্পত্তি সংক্রান্ত মামলায় অন্ধ্রপ্রদেশের নিম্ন আদালতের একটি রায়ের প্রতিলিপি জমা পড়েছিল সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলায় ধরা পড়ে নিম্ন আদালতের বিচারক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে ‘রেফারেন্স’ নির্দেশনামায় কার্যত ‘টুকে’ দিয়েছেন। অথচ পূর্বতন যে নির্দেশের উল্লেখ নিম্ন আদালতের বিচারক রায়ে দিয়েছেন, সেগুলি ভ্রান্ত!
শুধু বিচারক নন, শীর্ষ আদালতে আইনজীবীদের একাংশের নির্বিচারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি নাগরত্না এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ। প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে টুকে মামলার আর্জিপত্র লেখার ফলে কাল্পনিক তথ্য ও নির্দেশ ঢুকে পড়ছে নথিতে।
গত বছর পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট আইনজীবীদের একাংশকে রীতিমতো তিরস্কার করেছিল। কোর্টে মোবাইল ফোন এবং এআই-এর সাহায্যে সওয়াল করার ক্ষেত্রে বিচারপতি বলেছিলেন, ‘‘বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সওয়াল করুন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নয়।’’
বিচার ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি অবশ্য একেবারে বর্জন করতে চায় না কেন্দ্রীয় সরকার ও সুপ্রিম কোর্ট। বরং বাক্যালাপ শুনে তা অক্ষরে পরিণত করা (স্পিচ টু টেক্সট), রায়ের প্রতিলিপি বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করা ইত্যাদি কাজে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
সূত্রের খবর, বিচার ব্যবস্থার আরও বিভিন্ন কাজে এআই-এর ব্যবহার বাড়ানোর ভাবনাও আছে এবং তা নিয়ে কাজও চলছে। কেরল হাই কোর্ট এআই-এর ব্যবহার নিয়ে গাইডলাইনও তৈরি করেছে। বিচার ব্যবস্থায় এআই কী ভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের কমিটিও আছে।
এআই কী ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন আইনজীবী সুদীপ্ত দাশগুপ্ত। তাঁর মতে, ‘‘ক্লারিকাল কাজের ক্ষেত্রে এআই মানুষের পরিশ্রম কমাতে পারে কিন্তু আইনজীবীদের বুদ্ধিমত্তা এআই নির্ভর হয়ে গেলে সমস্যা। তাতে ভুলভ্রান্তি বাড়বে।’’
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে খুনে অভিযুক্ত এক ব্যক্তির জামিনের মামলায় পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্টের বিচারপতি অনুপ চিটকারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করেছিলেন। রায়ে এআই ব্যবহারের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। তা নিয়ে বিতর্কও হয়নি। আইনজীবীদের একাংশের ব্যাখ্যা, গোটা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত বিশ্লেষণে ‘রিসার্চ’ সংক্রান্ত সহায়তা নিয়েছিলেন বিচারপতি চিটকারা। কিন্তু সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপরে নির্ভর করেননি। তাই এ ক্ষেত্রে বিচারকের ভূমিকাকে কোনও ভাবে প্রভাবিত করেনি এআই।
আইনজীবী অনির্বাণ গুহঠাকুরতা বলছেন, আদালতের কাজের ক্ষেত্রে আইনজীবীদের এআই ব্যবহার করা বিপজ্জনক হতে পারে। কারণ, প্রতিটি মামলাতেই নতুন নতুন বিষয় থাকে। সেখানে কোনও প্রাক-নির্ধারিত সূত্র মেনে চলা যায় না। ‘‘কৌঁসুলির বুদ্ধিমত্তার বিকল্প হতে পারে না এআই,’’ বলছেন তিনি।
তবে আইনজীবীদের চেম্বারের বিভিন্ন কাজে এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে। যেমন এআই প্রযুক্তির একটি ব্যবহার আছে যা আইনজীবী ও তাঁর মক্কেলের কথোপকথন রেকর্ড করে নথিবদ্ধ করে। যা পরবর্তী সময়ে মামলার নথি তৈরিতে এবং আইনি পদক্ষেপ নির্ধারণে পরিশ্রম এবং সময়, দুই বাঁচায়। সে দিক থেকে এই প্রযুক্তি উপযোগী। অনির্বাণ বলছেন, ‘‘আমি নিজেও চেম্বারের কাজে এই ধরনের এআই ব্যবহার করি। কিন্তুসওয়াল-জবাবের ক্ষেত্রে এআই নৈব নৈব চ।’’
আইনজীবীদের একাংশ অবশ্য বলছে, তরুণ প্রজন্মের কেউ কেউ তড়িঘড়ি কাজ করতে এআই ব্যবহার করছেন। তাতে ভুলভ্রান্তিও ধরা পড়ছে। যদিও তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এআই-এর ব্যবহার নিয়ে দ্বিমত আছে। কলকাতা হাই কোর্টের তরুণ আইনজীবী শিঞ্জিনী চক্রবর্তী বলছেন, ‘‘আমি মামলার আবেদন তৈরির ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের পক্ষপাতী নই। কারণ, মামলার আবেদন লেখা অনুশীলনের ব্যাপার এবং তাতে মগজে শান দেওয়া যায়।’’
যদিও তরুণ আইনজীবীদের আরেকটি অংশের দাবি, মামলার যুক্তি নিজের মাথা থেকে বের করলেও আইনি পরিসররের দুরূহ ইংরেজির ব্যাকরণগত ত্রুটি এড়াতে এআই ব্যবহার করা অন্যায় নয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)