অসমের কচুতলিতে দিগারু নদীর পারে এই এলাকা আগে গমগম করত একাধিক গ্রামের মানুষের নিশ্চিন্ত গেরস্থালিতে। মরিগাঁও এলাকার ব্রহ্মপুত্র লাগোয়া এলাকাগুলি ভাঙনে তলিয়ে যাওয়ার পরে সেখানকার পরিবারগুলি রীতিমতো জমি কিনে এই এলাকায় নতুন করে ঘর বেঁধেছিল। ভাবেনি কখনও রাতারাতি শুধু তাদের উঠেই যেতে হবে না, তাদের মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া ঘরবাড়ির উপরেই মঞ্চ গড়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীঘোষণা করবেন, “এখানে সবাই ছিলেন অনুপ্রবেশকারী! ঘুসপেটিয়াদের ঘাঁটি ভেঙেই তৈরি হয়েছে আইনরক্ষীদের গড়।” বুঝিয়ে দেবেন, ঘরহারারাফের ঘর গড়ার চেষ্টা করলেইঝাঁপিয়ে পড়বে রাষ্ট্রের দণ্ড। ইব্রাহিম আলি, বিলালুদ্দিনরা নদীর পার বরাবর গত দুই বছর ধরে তাঁবুরমধ্যে থাকছেন।
মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির কারও ছিল ব্যবসা, কারও ওষুধের দোকান, কারও ছিল চাষের জমি। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে অনেকে দোতলা বাড়িও বানিয়েছেন। কিন্তু এখন তা নিশ্চিহ্ন। শুধু বাড়ি নয়, একই সঙ্গে নিশ্চিহ্ন হয়েছে ভোটাধিকারও। প্রশাসন বলছে, ‘‘তোমরা এখানকার বাসিন্দা নও।’’ সরকার বলছে, ‘‘তোমরা ভারতীয়ই নও।’’ ফলে ভোটার তালিকা থেকে এখানকার ১০০ শতাংশ সংখ্যালঘুর নামই কাটা পড়েছে। সব প্রমাণ নিয়ে জেলাশাসকের কাছে দরবার করেও লাভ হয়নি। যে কংগ্রেসকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় রেখেছিলেন, তারাও আসে না আর খবর নিতে। সুপ্রিম কোর্টে চলছে মামলা। তার শুনানির তারিখ পড়তে চায় না। এই চরম অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করেই কচুতলির মানুষ জানতে পারেন, তাঁকে জমিতে গড়েউঠবে অসম পুলিশের দশম ব্যাটেলিয়নের সদর।
সেই প্রকল্পের উদ্বোধনেই অমিত শাহ বললেন, “কংগ্রেস বছরের পর বছর যে অনুপ্রবেশকারীদের এখানে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই অনুপ্রবেশকারীদের উৎখাত করাই বিজেপি সরকারের পবিত্র দায়িত্ব। সেই কাজই করছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা।” অনুপ্রবেশমুক্ত ও বন্যামু্ক্ত অসমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দশ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিলেন তাঁরা। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার সেই কাজ সেরে উঠতে পারেনি। তাই আরও পাঁচ বছর সময় চেয়ে নিয়ে, অসমকে অনুপ্রবেশ ও বন্যামুক্ত করার নীল নকশা তুলে ধরেন শাহ।
অসম অনুপ্রবেশকারীমুক্ত করতে ৫ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে দিলেও শাহ দাবি করেন, চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ ‘লাল সন্ত্রাসমুক্ত’ হবে। কচুতলির পাশাপাশি, গুয়াহাটিতে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীর ৮৭তম প্রতিষ্ঠা দিবসের কুচকাওয়াজে হাজির থেকে শাহ বলেন, “চলতি বছরের ৩১ মার্চের মধ্যেই দেশ থেকে বামপন্থী উগ্রবাদ তথা মাওবাদী সমস্যা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা হবে। গত তিন বছরে মাওবাদী সমস্যার মতো “ঐতিহাসিক ও কঠিন” চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিআরপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দেশ লাল সন্ত্রাসমুক্ত হলে তাতে সিআরপি ও তাদের কোবরা ব্যাটেলিয়নের ভূমিকা দেশ চিরকাল স্মরণ করবে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, বহু ক্ষেত্রে সিআরপি জওয়ানেরা সন্ত্রাসী হামলা ব্যর্থ করেছেন, চিনা ও পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধেও সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই করেছেন। শাহ জানান, এ পর্যন্ত ২,২৭০ জন সিআরপি জওয়ান নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে উত্তর-পূর্বেই মারা গিয়েছেন ৭০০ জন, মাওবাদী প্রভাবিত এলাকায় ৭৮০, জম্মু ও কাশ্মীরে ৫৪০ এবং দেশের অন্যান্য অংশে ২৫০ জন।
অমিত শাহের কথায়, “যেখানে সিআরপি মোতায়েন হয়, সেখানে দেশের শত্রুদের পরাজয় নিশ্চিত। উত্তর-পূর্ব ভারতে শান্তি রক্ষাতেও সিআরপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। মণিপুরের হিংসা নিয়ন্ত্রণেও শেষ পর্যন্ত আমাদের সিআরপি মোতায়েন করতে হয়েছে। দেশ জুড়ে সিআরপি সার্বভৌমত্ব রক্ষাএবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তানিশ্চিত করছে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)