জাতের ভিত্তিতে জাঠেদের সংরক্ষণের প্রস্তাব এক বছর আগেই খারিজ করে দিয়েছে সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু হরিয়ানার আগুন নেভাতে শেষমেশ উত্তর ভারতের এই বর্ধিষ্ণু কৃষক সম্প্রদায়ের সামনে ফের পুরনো গাজরটাই ঝুলিয়ে দিল কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদী সরকার। কেন্দ্র ও রাজ্য উভয় সরকারের তরফে আজ, শনিবার জাঠেদের জানিয়ে দেওয়া হল, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে তাদের সংরক্ষণের দাবি বিবেচনা করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে কিছু একটা ব্যবস্থা করা হবেই।
সংরক্ষণের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে হরিয়ানার বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন জাঠেরা। গতকাল থেকে তা হিংসাত্মক চেহারা নেয়। তার পর পুলিশের গুলিতে তিন জনের মৃত্যু হওয়ায় সেই আগুন দাবানলের মতো ছড়াতে থাকে। এই অবস্থায় শুক্রবারই হরিয়ানার তিন শহর রোহতক, ভিওয়ানি ও ঝঝ্ঝরে কার্ফু জারি করেছিল পুলিশ। পরিস্থিতির আরও অবনতি হওয়ায় আজ সোনিপত ও গোহানাতেও কার্ফু জারি করা হয়। এমনকি হরিয়ানার প্রায় সব শহরে সেনা মোতায়েন করে ফ্ল্যাগ মার্চও করা হয়। তবে রোহতকের ছবিটা এখনও অগ্নিগর্ভ! সেখানে সেনা নামাতে গিয়ে আজ সেনাবাহিনীকে বাধ্য হয়ে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়। কারণ, মোটামুটি ভাবে হরিয়ানার মধ্যে দিয়ে যাওয়া সব জাতীয় সড়ক ও রাজ্যের হাইওয়েগুলি জায়গায় জায়গায় গাছ ফেলে বন্ধ করে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। জিন্দের রেল স্টেশনেও তারা আগুন লাগিয়ে দেয়। উদ্বেগের বিষয় হল, আন্দোলনের আঁচ এখন রাজধানী দিল্লি ও পশ্চিম উত্তরপ্রদেশ ও রাজস্থানে ছড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে!
স্বাভাবিক ভাবেই উদ্বেগে পড়ে গিয়েছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। গতকাল রাতেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিংহ, বিদেশ মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর পর্রিকর এ ব্যাপারে নিজেদের মধ্যে মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করেন। হরিয়ানার জাঠ নেতাদের সঙ্গেও কেন্দ্রের নেতারা ফোনে কথা বলে তাঁদের নিরস্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মুশকিল হল, হরিয়ানা জুড়ে জাঠ আন্দোলনের আগুন এখন যেভাবে ছড়িয়েছে তাতে সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের কোনও নেতারই সামগ্রিক নিয়ন্ত্রণ নেই। জাঠ পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা বেপরোয়া ভাবে রাস্তায় নেমে পড়েছে। ফলে সেনা, আধা সামরিক বাহিনী ও পুলিশের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টার পাশাপাশি আজ তাঁদের রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে বিজেপি সরকার। এজন্য মোদী মাঠে নামান কেন্দ্রীয় গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী চৌধুরী বীরেন্দ্র সিংহকে। দিল্লিতে তিনি সাংবাদিক বৈঠক করে বলেন, জাঠেদের সংরক্ষণের বিষয়টি কেন্দ্র বিবেচনা করছে। এ ব্যাপারে জাঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে হরিয়ানার বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টর বলেন, জাঠেদের আবেগ বুঝতে তাঁর অসুবিধা হচ্ছে না। তিনি নিজেও মনে করেন তাদের সংরক্ষণ পাওয়া উচিত। কিন্তু সেই আলোচনা শুরু হওয়ার আগে রাজ্যে শান্তির পরিবেশ ফেরানো জরুরি। এজন্য জাঠ পরিবারগুলির বর্ষীয়াণদের কাছে আবেদন জানান খট্টর। বলেন, বাড়ির গুরুজনদের উচিত পরিবারের ছেলেমেয়েদের প্রশমিত করা। প্রসঙ্গত, জাঠ নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসে খট্টর গতকাল বলেছিলেন, তাঁদের বিশেষ অনগ্রসর শ্রেণি হিসাবে সংরক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু জাঠ নেতারা সেই ‘খেলনায়’ ভুলতে চাননি।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, কেন্দ্রে মোদী সরকারের নেতাদের কাছেও পরিষ্কার যে জাঠেদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করলে তা সাংবিধানিক ভাবে বৈধ হবে না। ঠিক যেমন ভাবে গুজরাতের পটেলদের সংরক্ষণ দেওয়া যায়নি, জাঠেদের ক্ষেত্রেও সমস্যা তাই। রাজনৈতিক কারণে ২০১৪ সালে হরিয়ানায় বিধানসভা ভোটের আগে সেখানকার ভূপেন্দ্র হুডা সরকার জাঠ সংরক্ষণে সায় দিয়েছিল। তার পর কেন্দ্রে মনমোহন সিংহ সরকার অন্যান্য পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের আওতায় তাদের সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে মনমোহন সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাল্টা আবেদন পেশ হয়। তার পর সর্বোচ্চ আদালত পরিষ্কার জানিয়ে দেয়, জাতের ভিত্তিতে ওবিসি কোটার আওতায় সংরক্ষণ দেওয়া যাবে না। কারণ, সামাজিক অনগ্রসরতাই এক্ষেত্রে সংরক্ষণ দেওয়ার একমাত্র মাপকাঠি।
আরও পড়ুন:
মোদীর নন, গুজরাতে দলীয় সভাপতি পদে অমিত-ঘনিষ্ঠই
গুজরাতের পটেলদের মতো জাঠেরা কোনও ভাবেই সামাজিক ভাবে অনগ্রসর নন। হরিয়ানার ২৯ শতাংশ মানুষ জাঠ। তাঁদের কাছে বরাবর চাষবাষের জমিজমা ছিল। তাই আর্থিক ও সামাজিক দিক থেকে কোনও ভাবেই তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন না। তাই নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে সংরক্ষণের দাবিতে জাঠেরা বারবার আন্দোলনে নামলেও তা কখনও সদর্থক পরিণতি পায়নি। এমনকি ৯৭ সালে তাঁদের আন্দোলনের পর অনগ্রসর জাতি কমিশনও তাঁদের সংরক্ষণের প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিল। সেদিক থেকে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কিন্তু বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন, সংবিধানের ভাষা এখন বোঝানো যাবে না। তাই কিছু একটা ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়ে আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে চাইছেন তাঁরা। বিজেপি-র একাংশ নেতা অবশ্য উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নির্বুদ্ধিতার অভিযোগ করছেন। তাঁদের মতে, হরিয়ানায় জাঠেরাই প্রভাবশালী সম্প্রদায়। সেখানে একজন অ-জাঠ নেতাকে মুখ্যমন্ত্রী করে মোদী-অমিত শাহরা ভুল করেছেন। তবে একটা বিষয়ে অন্তত বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও স্বস্তিতে। তা হল, হরিয়ানার পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া কংগ্রেসের পক্ষেও সম্ভব নয়। জাঠেদের সমর্থন না করে হিংসা ও অশান্তি থামানোর জন্য রাহুল গাঁধী, ভূপেন্দ্র সিংহ হুডারা আজ বারবার যেভাবে আবেদন জানিয়েছেন, তাতেই বিষয়টি পরিষ্কার। কারণ, কংগ্রেসও জানে সংরক্ষণের ব্যবস্থা তাঁরা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলেও করতে পারবে না। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপারে বিজেপি নেতারা স্বস্তিতে। তা হল, হরিয়ানা বিতর্কের কারণে জেএনইউ বিতর্ক সাময়িক ভাবে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। তবে এই স্বস্তি ছোট ব্যাপার। বিজেপি নেতৃত্ব বুঝতে পারছেন, জাঠ আন্দোলনের জেরে হরিয়ানায় অচল হয়ে থাকলে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি হবে। তাছাড়া জাতীয় স্তরেও নেতিবাচক বার্তা যাবে যে বিজেপি সুশাসন কায়েম রাখতে পারছে না। তাই অসম্ভব জেনেও আজ সংরক্ষণের পুরনো গাজরটা ফের ঝুলিয়ে দিয়েছে বিজেপি। দেখা যাক, তাতে আগুণ নেভে কিনা!