লাল কেল্লার কাছে গাড়ি বিস্ফোরণের ৪৮ ঘণ্টা পরে একে ‘সন্ত্রাসবাদী ঘটনা’ বলে তকমা দিল নরেন্দ্র মোদী সরকার। এই বিস্ফোরণ ও তার আগে ফরিদাবাদ থেকে প্রায় ২,৯০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধারে সঙ্গে পাকিস্তানি জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদের যোগসূত্র রয়েছে বলে তদন্তকারী পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র দাবি করা হলেও, মোদী সরকার এখনই ‘পাকিস্তানের মদত’ বা ‘সীমান্ত পারের সন্ত্রাস’-এর দিকে আঙুল তুলছে না। শুধুমাত্র ‘দেশ-বিরোধী শক্তি’ এই ‘জঘন্য সন্ত্রাসবাদী ঘটনা’-র পিছনে রয়েছে বলে মোদী সরকারের বক্তব্য। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, কাশ্মীর থেকে ফরিদাবাদ হয়ে দিল্লি পর্যন্ত যে সন্ত্রাসবাদীদের গোষ্ঠীর সন্ধান মিলেছে, তারা কি দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা বা ‘হোমগ্রোন’ সন্ত্রাসবাদী?
সোমবার সন্ধ্যায় দিল্লির লাল কেল্লার বিস্ফোরণে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর পরের দিন সকালেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ভুটান সফরে চলে যান। বুধবার দুপুরে দিল্লি ফিরেই তিনি বিমানবন্দর থেকে সরাসরি এলএনজেপি হাসপাতালে বিস্ফোরণে আহতদের সঙ্গে দেখা করতে যান। বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে প্রথমে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির বৈঠক বসে। মন্ত্রিসভার বৈঠকও হয়। বৈঠকে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দু’মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। তার পরে লাল কেল্লার কাছে বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে প্রস্তাব পাশ করা হয়। মন্ত্রিসভার এই প্রস্তাবেই বলা হয়েছে, দেশ-বিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রে লাল কেল্লার কাছে ‘জঘন্য’ সন্ত্রাসবাদী ঘটনা ঘটেছে।
গত এপ্রিলে পহেলগামের ঘটনার পরে মোদী সরকার নতুন রণনীতি নিয়ে বলেছিল, এর পরে যে কোনও সন্ত্রাসবাদী হামলাকে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা ‘অ্যাক্ট অব ওয়ার’ হিসেবে দেখা হবে। তার জবাবও সেই ভাবে দেওয়া হবে। যেমন, পহেলগামের জবাবে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে পাকিস্তানে সামরিক হানা হয়।
মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, সেই নতুন রণনীতি বা সন্ত্রাসের মোকাবিলায় ‘নিউ ডকট্রিন’ লাল কেল্লার বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে কী ভাবে প্রযোজ্য হবে? মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব এর কোনও উত্তর দিতে চাননি। প্রশ্ন উঠেছে, কেন্দ্র কি লাল কেল্লার বিস্ফোরণে পাকিস্তানের হাত দেখছে না? দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদীরাই এই ঘটনায় জড়িত বলে সরকার মনে করছে? বৈষ্ণবের জবাব, মন্ত্রিসভার প্রস্তাবেই বলা হয়েছে, এটা দেশ-বিরোধী শক্তির কাজ। সে ক্ষেত্রে কি সীমান্ত পারের সন্ত্রাসের প্রশ্ন আসছে না? বৈষ্ণব তারও উত্তর দিতে চাননি।
প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরমের বক্তব্য, ‘‘আমি পহেলগামের পরেও বলেছিলাম, দুই ধরনের সন্ত্রাসবাদী রয়েছে। এক দল বিদেশে প্রশিক্ষিত অনুপ্রবেশকারী সন্ত্রাসবাদী। অন্য দল দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদী। দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদীদের কথা বলায় সংসদে আমাকে বিদ্রুপ করা হয়েছিল। তবে সরকার জানে যে, দেশের মাটিতে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাদীরাও রয়েছে। আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত, ভারতীয় নাগরিকরা, এমনকি যাঁরা যথেষ্ট শিক্ষিত, তাঁরা কোন পরিস্থিতিতে ও কেন সন্ত্রাসবাদী হয়ে উঠছেন?’’
‘অপারেশন সিঁদুর’-এ আচমকা সংঘর্ষবিরতি ঘোষণা করা হলেও মোদী সরকারের দাবি ছিল, সেই ‘অপারেশন’ চলছে। লাল কেল্লার বিস্ফোরণের পরে কি সেই ‘অপারেশন সিঁদুর’ নতুন করে শুরু হবে? তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রী এরও উত্তর দিতে চাননি। আজ মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে সন্ত্রাসবাদী ঘটনার নিন্দার সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থা ও সাধারণ নাগরিকদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ারও সাধুবাদ জানানো হয়েছে। যে সব দেশ সহমর্মিতা ও পাশে থাকার বার্তা দিয়েছে, তাদেরও ধন্যবাদ জানানো হয়।
সরকারি সূত্রের ব্যাখ্যা, মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কেন্দ্র কোনও ভাবেই সন্ত্রাসবাদ সহ্য করা হবে না বলে যে নীতি নিয়েছে, তার প্রতি সবরকম ভাবে দায়বদ্ধ। মন্ত্রিসভার তরফে তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে দ্রুততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত শেষ করে ষড়যন্ত্রকারী, তাদের সহযোগী ও মদতকারীদের চিহ্নিত করা ও কাঠগড়ায় তোলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের সর্বোচ্চ স্তর থেকে পরিস্থিতির উপরে নজরদারি করা হচ্ছে। এই প্রস্তাব থেকেই স্পষ্ট, এখনই পাকিস্তানের দিকে আঙুল তোলার মতো তথ্য-প্রমাণ মেলেনি। উল্টো দিকে, কাশ্মীরের উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসকরা যে ঘটনায় জড়িত, তা স্পষ্ট হলেও, তারা পাকিস্তানে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, এমন প্রমাণ মেলেনি। ফলে এখনই পাকিস্তানের দিকে আঙুল তোলার মতো পরিস্থিতি হয়নি।
মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, গুপ্তচর সংস্থা র’-এর প্রধান পরাগ জৈনকে ক্যাবিনেট সচিবালয়ের নিরাপত্তা বিষয়ক সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হবে। যার অর্থ, তিনি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার ভারপ্রাপ্ত এসপিজি-র প্রশাসনিক প্রধান হিসেবেও কাজ করবেন। জুলাইয়ের পর থেকে এই পদটি খালি পড়ে ছিল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)