মার্চ মাসেই পুরোদমে নালন্দা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস তৈরির কাজ শুরু করতে চলেছেন কর্তৃপক্ষ। আজ বিহারের রাজগীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির বৈঠকে ক্যাম্পাস তৈরির কাজের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে হাজির ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য সিঙ্গাপুরের প্রাক্তন বিদেশমন্ত্রী জর্জ ইয়েও, প্রাক্তন আচার্য অমর্ত্য সেন, শিক্ষাবিদ তথা সাংসদ সুগত বসু, উপাচার্য গোপা সবরওয়ালের মতো সমিতির সদস্যেরা।
ক্যাম্পাস তৈরি ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৬৫ কোটি টাকা খরচ করে আন্তর্জাতিক মানের গ্রন্থাগার তৈরির নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সেই গ্রন্থাগার নির্মাণের কাজও শুরু করতে চাইছেন কর্তৃপক্ষ। আচার্য ইয়েও জানিয়েছেন, সরকার নয়, সিঙ্গাপুরের মানুষের তরফে বিশ্ববিদ্যালয়কে এই গ্রন্থাগার উপহার দেওয়া হচ্ছে। চলতি বছর থেকেই বৌদ্ধ দর্শনের কথা মাথায় রেখে বৌদ্ধ স্টাডিজ, তুলনামূলক ধর্ম এবং দর্শনের স্কুল শুরু করতে চান বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে শুরু হবে ভাষাতত্ত্ব ও সাহিত্যের স্কুল। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে ‘স্কুল অব পাবলিক হেলথ’ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। আচার্য ইয়েও-র কথায়, ‘‘স্কুল অব পাবলিক হেলথ বিশ্ববিদ্যালয় লাগোয়া এলাকায় জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করবে।’’ এ ছাড়াও ছাত্র সংখ্যা বাড়াতে উদ্যোগী হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখেই বৌদ্ধ দর্শনের চর্চা শুরু করতে চাইছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্তার কথায়, ‘‘বৌদ্ধ ধর্মের অনুরাগীদের কথা মাথায় রেখেই নতুন স্কুল অব বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ চালু করা হচ্ছে। নালন্দার ঐতিহ্যে বৌদ্ধ ধর্মের বড় প্রভাব রয়েছে। তাই পরিচালন সমিতির কয়েক জন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বিদেশ মন্ত্রকে বৌদ্ধ দর্শন চর্চা নিয়ে চিঠিও লিখেছিলেন।’’ বৌদ্ধ ধর্ম ও দর্শন চর্চা শুরু হলে পড়ুয়ার সংখ্যা বাড়বে বলেও মনে করছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ক্যাম্পাস তৈরিতে সিঙ্গাপুরের নামকরা স্থপতিদের কাজে লাগানো হবে। দিন কয়েক ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এলাকা ঘুরে দেখেছেন সিঙ্গাপুরের অন্যতম স্থপতি লিউ থাই। সে দেশে প্রায় সমস্ত বড় প্রকল্প তৈরিতে তাঁর ভূমিকা রয়েছে। গত অগস্টেও পাঁচ সদস্যের এক দলের সঙ্গে তিনি ক্যাম্পাস দেখতে এসেছিলেন। বর্তমানে ক্যাম্পাসের নকশা তৈরির দায়িত্বে থাকা সংস্থা বাস্তুশিল্প কনসালট্যান্ট এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে মিলে কাজ করবেন লিউ থাই এবং তাঁর সহযোগীরা।
গত কাল থেকেই রাজগীরে ক্যাম্পাসের নকশার মডেল প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। রাখা হয়েছে গ্রন্থাগারের মডেলও। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানানো হয়েছে, প্রথম দফায় পড়াশোনার জায়গা ও প্রশাসনিক ভবন, শিক্ষকদের আবাসন, কর্মচারী ও ছাত্রদের আবাসন, আন্তর্জাতিক সেন্টার ও ইন্ডোর স্টেডিয়াম তৈরি করা হবে। ফেব্রুয়ারির মধ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। মার্চ মাসের মাঝামাঝি ক্যাম্পাস তৈরির কাজের শিলান্যাস হবে। সূত্রের খবর, সেই অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এবং প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েক জন রাষ্ট্রপ্রধানও থাকতে পারেন।
উপাচার্য গোপা সবরওয়াল জানিয়েছেন, ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর ১৫ ছাত্রকে দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’টি স্কুল। পরের বছর ৫০ জন ছাত্রকে ভর্তি করানো হয়। এ বছরে সেই সংখ্যা এক লাফে অনেকটাই বাড়ানো হবে।
সিঙ্গাপুর ও হংকং-এর যে বাসিন্দারা বিশ্ববিদ্যালয়কে অর্থ সাহায্য করেছেন তাঁরা আচার্য ইয়েও-র সঙ্গেই নালন্দায় এসেছিলেন। দু’দিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৫০০ একর জমি ঘুরে দেখেন। আচার্যের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই জর্জ ইয়েও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সিঙ্গাপুরের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় এবং নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃতত্ব বিষয়ক পরামর্শদাতা কে সি চিইউ বর্তমানে নালন্দা লাইব্রেরি ফান্ড লিমিটেডের সচিব। তিনি বলেন, ‘‘গ্রন্থাগারটি তৈরির জন্য খরচ ধরেছি প্রায় ১০ লক্ষ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬৫ কোটি টাকা। প্রায় ৮০ শতাংশ উঠে এসেছে। এখান থেকে ফিরে বাকি টাকাটাও তুলে ফেলব বলে আশা করছি।’’ তাঁর দাবি, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে থাকা গ্রন্থাগারটি গবেষক এবং উৎসাহীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে।