E-Paper

অভিমন্যু-জীবনের গান বাঁধছেন ‘ভারতীয়’ দীপালি

অতিথির সামনে সামলাতে গিয়েও গালে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা জল। দীপালি বলেন, “জেলে যেতে ভয় পাইনি, কিন্তু আমি না-থাকায় মানুষটার বরাবরের জন্য মাথাখারাপ হয়ে গেল, এ ক্ষতি কে পূরণ করবে!”

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৩
স্বামীকে এ ভাবেই আগলে রাখেন দীপালি।

স্বামীকে এ ভাবেই আগলে রাখেন দীপালি। — নিজস্ব চিত্র।

‘আমার সুনার ভারত দেশ, তোমায় ভালবাসি / তুমায় ভালবাসিয়া, ভারতে আসিয়া, / সংসারে হইছে দুর্গতি / আমার ভারতমাতা গো, / কইরো কইরো না মা আমারে উদাসী।’

অসম-মিজ়োরাম সীমানার অদূরে, পাহাড়ের ধাপ কেটে তৈরি খুলিচোরা বনগ্রামে চিলতে ঘরের উঠোনে বসে গান গাইতে গাইতেই শঙ্কায় গলা কেঁপে যায় দীপালি দাসের। গেল-গেল করে দৌড়ে যান। মানসিক ভারসাম্য হারানো স্বামী সুযোগ পেয়ে নেমে গিয়েছিলেন পুকুরের ধারে। দীপালি বকতে বকতে স্বামীকে টেনে তুলতে থাকেন বাড়ির দিকে। সে বকুনির মলাটে জড়ানো আদরের পরত।

অতিথির সামনে সামলাতে গিয়েও গালে গড়িয়ে পড়ে দু’ফোঁটা জল। দীপালি বলেন, “জেলে যেতে ভয় পাইনি, কিন্তু আমি না-থাকায় মানুষটার বরাবরের জন্য মাথাখারাপ হয়ে গেল, এ ক্ষতি কে পূরণ করবে!”

স্বামীকে ঘরে আটকে রেখে চা চাপান অসমের ধলাই লালচেরা এলাকার দীপালি দাস। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনে এত দিনে অসমের যে ৪-৫ জন মাত্র নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে নিজের পরিচয় প্রকাশ করেছেন শুধু দীপালিই।

পোষা হাঁস তাড়াতে তাড়াতে জানাচ্ছিলেন, ২০১৩ সালে তাঁর নামে প্রথম সন্দেহভাজন বাংলাদেশি হওয়ার নোটিস আসে। সেখানে তাঁর ও স্বামীর নামের বানান ছিল ভুল। বড় ছেলে তখন বেঙ্গালুরুতে কর্মরত। মেয়েরা ছোট। স্বামী মিষ্টি-খাবার বাড়িতে তৈরি করে ফিরি করেন। ওই ইংরেজি নোটিসে আমলই দেননি দীপালিরা।

২০১৯ সালে গ্রামের হাই স্কুলের কাছে লাখ দুয়েক টাকা ধার করে খাবারের দোকান দেন তাঁরা। তিন মাস পরেই দোকানে হাজির পুলিশ। দীপালিকে সোজা পাঠিয়ে দেওয়া হল শিলচর জেলে। আদ্যন্ত ধর্মপ্রাণ ও স্ত্রীর উপরে নির্ভরশীল স্বামী অভিমন্যু প্রথম কয়েক দিন স্ত্রীর হদিসই পাননি। পরে যখন জানলেন বৌ জেলে, গ্রাস করল অসহায়তা। সুযোগ বুঝে উকিল ঠকিয়ে নিল আরও ৬০ হাজার টাকা। লাটে উঠল দোকান। অর্থচিন্তা, অসহায়তায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন অভিমন্যু।

বেঙ্গালুরুর ভাল চাকরি ছেড়ে ছেলেকে চলে আসতে হল গ্রামে। ২০২১ সালে জামিন পেলেন মা। কিন্তু ভারতীয় হওয়ার দিশা মিলল না। তার মধ্যেই চিহ্নিত বিদেশিদের তাড়ানো শুরু করে দিল সরকার। ২০২৪ সালে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) বলবৎ হওয়ার পরেই ওই নিয়মের আওতায় দীপালির জন্য নাগরিকত্বের আবেদন করেন আইনজীবী ধর্মানন্দ দেব। ধর্মানন্দ জানান, ওই নিয়মে নাগরিকত্ব পেতে প্রধান সমস্যা, নিজেকে বাংলাদেশি প্রমাণ করা। এ ক্ষেত্রে পুলিশ ও ফরেনার্স ট্রাইবুনাল দীপালির বাংলাদেশের যে ঠিকানা উল্লেখ করেছিল, সেটাই হয় তাঁদের হাতিয়ার। তার জোরেই এ বছরের ৬ মার্চ তিনি পেয়ে যান ভারতের নাগরিকত্বের শংসাপত্র। তবে আশ্চর্যের কথা, ‘ঘোষিত বিদেশি’ হওয়ার আগে বা পরে দীপালির নাম কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে কাটা পড়েনি। এ বারেও ভোট দিতে তৈরি তিনি।

দীপালি মেনে নেন, তিনি ও তাঁর স্বামী, দু’জনই আদতে বাংলাদেশের। স্বামীরা আগে এসেছেন। বিবাহসূত্রে পরে আসেন দীপালি। কিন্তু এনআরসি-র সময়ে তাঁদের ১৯৬৪ সালে ভারতে কেনা জমির কাগজপত্র মানতে চাননি কর্তৃপক্ষ। তাই এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকায় নামও ওঠেনি তাঁদের। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে তাঁর স্বামী বা সন্তানদের নাগরিকত্ব নিয়ে ফের সন্দেহ ওঠার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রে দীপালির পাওয়া নাগরিকত্ব ও সিএএ হাতিয়ার হতে চলেছে দীপালির স্বামী, পাঁচ মেয়ে, এক ছেলের।

মুখে মুখেই গান বানান দীপালি। নিজেই পালাগানের সুর দেন। গানেই ফুটিয়ে তোলেন ক্ষোভ, আনন্দ। পাহাড় বেয়ে তাঁর বাড়িতে ওঠার মুখে এখন ওড়ে বিজেপির পতাকা। দীপালিরা জানেন, কোথাও একটা নাড়া বাঁধা না-হলে তাড়া খেতে বেশি সময় লাগবে না।

স্বভাবকবি দীপালি গান ধরেন— ‘ছিলাম আমি বাংলাদেশি, বানায় দিলা ভারতবাসী / রাখলা আমায় ভারতের ভিতরে, / আগে একটা গাইছিলাম গান জেলেতে বসিয়া, ও ভাই কান্দিয়া কান্দিয়া / এখন গাই আনন্দের গান ভারতবাসী হইয়া...’ কিন্তু দীপালির ছেলে জানেন, মায়ের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী হতে সময় লাগবে না। বেঙ্গালুরুর নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে বাবা, মা, বোনেদের ভার নিতে এখানেই থেকে গিয়েছেন তিনি। ছোট্ট দোকানে আয় হয় না তেমন। বলেন, “আমরা তো এই প্রজন্মের ছেলে। বাংলাদেশিরা অনুপ্রবেশ করতে এলে, ভারতবিরোধী কথা বললে আমাদের মাথা আগে গরম হয়। কিন্তু বাবা-মায়ের পরিচয় যে ঝেড়ে ফেলতে পারি না। এ অদ্ভুত টানাপড়েনের শেষ কোথায় জানা নেই।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Singer Folksong

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy