বিহার হারের পর নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ, মোহন ভাগবতের উপর দলের ভিতর থেকেই আঘাত আসতে আজ তাঁদের আড়াল করতে ঐক্যের ছবি সামনে নিয়ে এল বিজেপি। মহাজোটের শক্তি বুঝতে ‘ভুল’ হয়েছে কবুল করল। কিন্তু জিতলে এতক্ষণে মোদী-ধ্বনি উঠলেও হারের দায় সামগ্রিক নেতৃত্বের ঘাড়েই ঠেলে দিল।
কাল থেকেই বিজেপির মধ্যে বিক্ষোভের সুর দানা বাধতে শুরু করেছিল। দলের বিক্ষুব্ধ নেতা শত্রুঘ্ন সিনহা নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহকে আক্রমণ করে বলেছিলেন, তালি ও গালি দুটোই ক্যাপ্টেনের প্রাপ্য। জোট শরিক শিবসেনাও মোদী ও অমিত শাহকে তুলোধনা করেছে। আজ বিহারের শরিক জিতেন রাম মাঁঝিও একধাপ এগিয়ে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের সংরক্ষণের মন্তব্য ও অমিত শাহের পাকিস্তানে বাজি ফাটানোর মন্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, এর জন্য এনডিএকে খেসারত দিতে হয়েছে। সুবিধা পেয়েছে মহাজোট। বিজেপির সাংসদ হুকুমদেব নারায়ণ যাদবও বলেন, ভাগবতের মন্তব্য অসময়ে করা। এতে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি ও দলিতদের খেপিয়ে তুলেছে। দলের ভাবা উচিত, কেন তারা মহাজোটকে সমর্থন করল। সবাই তো আর আরএসএস সমর্থক নয়।
দলের মধ্যে থেকে বিরুদ্ধ সুর উঠতেই আজ তড়িঘড়ি সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক ডাকা হয়। তার আগে সকালে অমিত শাহ বৈঠক করেন মোহন ভাগবতের সঙ্গে। বিজেপি সূত্রের মতে, অমিত শাহের কাছে ভাগবত অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর সংরক্ষণ মন্তব্যের প্রেক্ষাপট বিজেপি নেতৃত্ব ঠিকমত ব্যাখ্যা করতে পারেননি। বিহারের হারের জন্য তাঁকে দায়ী করা ঠিক নয়। অমিত শাহও আশ্বস্ত করেন, হারের পিছনে এটি আদৌ কারণ বলে মনে করছে না বিজেপি। পরে সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক শেষেও অরুণ জেটলি সাংবাদিক সম্মেলনে একই কথা বলেন। বিহারের ফল প্রকাশের চব্বিশ ঘন্টা পরে প্রথমবার আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে এসে জেটলি বলেন, এই হারের দায় সামগ্রিক নেতৃত্বের। ভাগবতের মন্তব্যের জন্য খেসারত দিতে হয়েছে বলে আমরা মনে করি না।
কিন্তু একইসঙ্গে রণকৌশলের ভুলও স্বীকার করে নেন তিনি। মহাজোটের জাতপাতের পাটিগণিত যে বাজি মেরেছে, সেটি কবুল করে বলেন, লোকসভা নির্বাচনে লালু-নীতীশ ও কংগ্রেস আলাদা লড়ায় বিজেপির সুবিধা হয়েছিল। এ বারে তাদের জোট হলেও বিজেপি ভেবেছিল, একে অন্যের ভোট পাবে না। তুলনায় নরেন্দ্র মোদী সরকারের উন্নয়ন মেলে ধরে সেটিকে ছাপিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু তা হয়নি। তিনটি দল একসঙ্গে মিলে জাতপাতের সমীকরণে বাজি মেরেছে। ফলে বিজেপি এ বারে সুবিধা করতে পারেনি। কিন্তু দলের যে ভিত তৈরি হয়েছে, সেটিকে পুঁজি করে ভবিষ্যতে আরও শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, যখন স্বয়ং জেটলিই প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নে ছাপিয়ে যাওয়ার কথা বলছেন, তাহলে বিহারের নির্বাচনকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের পক্ষে জনমত হিসেবে কেন ধরা হবে না? আর অমিত শাহই যখন পুরো কৌশল তৈরি করেছেন, সেই সময় সেই কৌশলে ভুল হলেই বা তিনি দায় নেবেন না কেন?
জেটলির যুক্তি, এরমধ্যে আরও অনেক কারণ রয়েছে। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের চরিত্র আলাদা। প্রেক্ষাপটও ভিন্ন। লোকসভায় এই মানুষই উন্নয়নে ভোট দিয়েছেন। এখন জাতপাতের ভিত্তিতে দিয়েছেন। আর অমিত শাহের নেতৃত্বেই বিজেপি হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, জন্মু-কাশ্মূর, ঝারখন্ড জিতেছে। আরও অনেক স্থানীয় নির্বাচনে জয় হয়েছে বিজেপির। আর মাত্র দুটিতে পরাজয় হয়েছে। ভোটে হার-জিত লেগেই থাকে। জিতলেও সেটি দলের সামগ্রিক জয়, হারলেও তাই। জেটলি বুঝিয়ে দিলেন, এই হারের জন্য মোদী-শাহ জুটি কিংবা ভাগবতকে কোনও রকম কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পক্ষপাতী নয় দল।
কিন্তু সাধারণত, হারের পরেও অতীতে অমিত শাহ সামনে আসতেন। আজ এলেন না। নরেন্দ্র মোদী সংসদীয় বোর্ডের বৈঠকে এলেন। কিন্তু আগের মত জৌলুস তাঁর চোখেমুখে ছিল না। সাংবাদিকদের দেখে আগের মত চেনা ছন্দে হাতও নাড়াননি আজ। এরইমধ্যে ভাগবত আজ রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান। সাধারণত দ্বীপাবলির আগে তিনি একবার দেখা করেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে। কিন্তু সম্প্রতি অসহিষ্ণুতার প্রশ্নে যে ভাবে আরএসএসের উপরেও অভিযোগ উঠছে, সেই প্রেক্ষিতে এই বৈঠক তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু বিজেপি নেতাদের মুখে এখনও লাগাম কষার কোনও নাম নেই। ক’দিন আগেই শাহরুখ খান সম্পর্কে মন্তব্য করে তা প্রত্যাহার করতে হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয়কে। আজ বিজেপির বিদ্রোহী নেতা শত্রুঘ্ন সিনহা যখন নীতীশ কুমারকে ১৭৮ কেজি লাড্ডু নিয়ে স্বাগত জানাতে যান, তার প্রেক্ষিতে ‘কুকুরের’ সঙ্গে শটগানের তুলনা টেনে বসলেন কৈলাস। বললেন, অনেক সময় কুকুর গাড়ির নিচে চলে এলে ভাবে, তারজন্য গাড়ি চলছে। অথচ দল চলে এক বিরাট সংগঠনের মাধ্যমে। জেটলি অবশ্য আজও আর একবার বলেন, দলের নেতাদের সংযত হওয়া উচিত। কিন্তু বিজেপি এখনও সেই তিমিরেই।