Advertisement
E-Paper

‌‌‌‌বাংলায় ধস, কেরলে পতন, বিলুপ্তপ্রায় বামেরা

নির্বাচন কমিশনের বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত হিসেব বলছে, লোকসভা ভোটে রাজ্যে এ বার বিজেপির ভোট বেড়ে হয়েছে ৪০.২৩%। আর বামেদের ভোট নেমে এসেছে ৭.৫২%-এ। তিন বছর আগের বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট পেয়েছিল প্রায় ২৬% ভোট।

সন্দীপন চক্রবর্তী

শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০১৯ ১৫:২১
গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

গ্রাফিক: শৌভিক দেবনাথ

ভোটের আগের নানা সমীক্ষার পূর্বাভাসই শেষ পর্যন্ত সত্যে পরিণত হল। বাংলায় বাম ভোটের বড় অংশই চলে গেল গেরুয়া শিবিরে। যার পরিণতিতে প্রধান বিরোধী দল তো বটেই, আসন ও ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে শাসক তৃণমূলের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলার জায়গায় উঠে এল বিজেপি! আর একটিও আসন না জিতে স্বাধীনতার পরে বাংলায় এই প্রথম শূন্য থাকল বামেদের খাতা!

নির্বাচন কমিশনের বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত হিসেব বলছে, লোকসভা ভোটে রাজ্যে এ বার বিজেপির ভোট বেড়ে হয়েছে ৪০.২৩%। আর বামেদের ভোট নেমে এসেছে ৭.৫২%-এ। তিন বছর আগের বিধানসভা ভোটে বামফ্রন্ট পেয়েছিল প্রায় ২৬% ভোট। বিজেপির ভোট তখন ছিল ১০.১৬%। অনেকেই মনে করছেন, বামেদের যে ১৫% ভোট ক্ষয় হয়েছে, তার সবটাই ঘরে তুলেছে বিজেপি! যে কারণে ভোটের আগে থেকে সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে থাকা স্লোগান এখন বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব— ‘বামের ভোট রামে’! বামের সঙ্গে তৃণমূল থেকে বেরোনো ভোট যোগ হয়ে বিজেপির পাল্লা ভারী হয়েছে বহু জায়গাতেই।

বিধানসভার পরে গত বছর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাম ভোট কমে এসেছিল প্রায় ১৬%-এ। বামেদের ছাপিয়ে রাজ্যের নানা জায়গায় তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে উঠে এসেছিল বিজেপিই। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোটে স্থানীয় নানা সমীকরণ কাজ করে, কোনও দলের শীর্ষ নেতৃত্বেরই সেখানে চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে না। লোকসভা নির্বাচনে কী ভাবে বামপন্থীদের সমর্থন বিজেপির মতো ‘সাম্প্রদায়িক শক্তি’র হাত শক্ত করল, এই সেই প্রশ্ন বিস্ময় জাগাচ্ছে রাজনৈতিক শিবিরে!

* নির্বাচন কমিশনের রাত ন’টা পর্যন্ত নেওয়া আপডেটের ভিত্তিতে করা।

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও এ বার বামেদের জন্য নৈরাশ্যের ছবি। গত বছর ত্রিপুরায় ক্ষমতা হারানোর পরে সেখানে লড়াই যথেষ্ট কঠিন হয়ে গিয়েছিল। সেই ধারা বজায় রেখেই উত্তর-পূর্বের ওই রাজ্যে জোড়া আসনই সিপিএমের হাতছাড়া। বিহারের বেগুসরাইয়ে মোদী-বিরোধিতার মুখ হয়ে সিপিআই প্রার্থী ছিলেন কানহাইয়া কুমার। কিন্তু সেখানে তরুণ বাম নেতার নিদারুণ পরাজয় হয়েছে চার লক্ষেরও বেশি ভোটে!

এক খণ্ড দ্বীপের মতো বামেদের আশার বাতি জ্বলে ছিল শুধু কেরলে। গোটা দেশ যখন নরেন্দ্র মোদীর প্রত্যাবর্তনের পক্ষে রায় দিচ্ছে, মালাবার উপকূলই একমাত্র সম্পূর্ণ উল্টো দিকে গিয়ে বিজেপি-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে। কিন্তু কেরলে মোদী-বিরোধী হাওয়ার কোনও ফায়দা বামেদের পালে আসেনি। গত বারের জেতা ৮ আসনের জায়গায় এ বার সেখানে শাসক বাম এগিয়ে মাত্র একটি আসনে— আলপ্পুঝা! এম কে স্ট্যালিনের ডিএমকে-র সঙ্গে জোট বেঁধে বরং বামেদের মুখরক্ষা হয়েছে তামিলনাড়ুতে। সেখানে সিপিএম দুই ও সিপিআই দুই মিলে বামেদের ঝুলিতে আসছে চারটি আসন। অর্থাৎ গোটা দেশে মোট ৫ আসন হতে পারে বামেদের।

* নির্বাচন কমিশনের রাত ন’টা পর্যন্ত নেওয়া আপডেটের ভিত্তিতে করা।

বাংলার রাজনীতির সমীকরণে বামফ্রন্ট এবং বিজেপি, দু’পক্ষেরই অবস্থান তৃণমূল-বিরোধী। লোকসভা নির্বাচনে এই দু’পক্ষের ভোট কেন মিশে গেল, তার তিন দফা কারণ উঠে আসছে রাজনৈতিক শিবিরের প্রাথমিক পর্যালোচনায়। প্রথমত, দেশে মোদীর সরকারের প্রত্যাবর্তনকে ঠেকানোর চেয়েও রাজ্যে তৃণমূলের হাত থেকে ‘নিস্তার’ পাওয়াকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন বাম কর্মী-সমর্থকেরা। দ্বিতীয়ত, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছিল বাম শিবিরের বড় অংশে। কংগ্রেসের সঙ্গে থাকলে কেন্দ্রে বিকল্প সরকার গড়ার যে বার্তা দেওয়া যেত, তা সম্ভব হয়নি। এই হতাশাই বহু বাম সমর্থকে পদ্মমুখী করে তুলেছে। আর তৃতীয়ত, পরের পর নির্বাচনে ব্যর্থ বাম নেতৃত্বের কোনও নিয়ন্ত্রণ কর্মী-সমর্থকদের উপরে কাজ করেনি। তাঁরাই এ বার তৃণমূলকে শিক্ষা দেবেন, বিজেপি নেতৃত্বের এই প্রচারে বরং বাম কর্মী-সমর্থকেরা বেশি ভরসা রেখেছেন! ভাঙা সংগঠন নিয়েও যতটুকু কাজ করা যায়, তার বেশির ভাগটাই তলে তলে গেরুয়া শিবিরের পক্ষে গিয়েছে। যাদবপুরে বিকাশ ভট্টাচার্য ছাড়া আর প্রায় কোনও বাম প্রার্থীই জামানত রক্ষা করার জায়গায় যেতে পারেননি! এমনকি, ফেব্রুয়ারিতে বামেদের ব্রিগেড সমাবেশে নজরকাড়া দেবলীনা হেমব্রমও ঝাড়গ্রামে সিপিএম প্রার্থী হয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে বিশেষ দাগ কাটতে পারেননি।

আরও পড়ুন: ম্যায় বহত খুশ হুঁ, সকাল থেকে উপোস ওঁর জন্যই, বললেন যশোদাবেন

সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলছেন, ‘‘স্বাধীন ভারতের নির্বাচনী ইতিহাসে বাম শক্তির এমন বিপর্যয় নজিরবিহীন। এত ভোট ক্ষয় অভূতপূর্ব। বাংলায় তৃণমূলের স্বৈরশাসন, প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িকতা আরএসএস-বিজেপির শক্তিসঞ্চয়ে বিরাট ভূমিকা পালন করেছে। মেরুকরণের ভোটে রাজ্যের ৮০%-এরও বেশি মানুষ হয় তৃণমূল, নয় বিজেপি-কে বেছে নিয়েছেন। কিন্তু আমাদেরও গভীরে গিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে, আত্মসমীক্ষা করতে হবে।’’ সাধ্যমতো শক্তি নিয়েই মানুষের পাশে থেকে বামেরা ‘চ্যালেঞ্জে’র মোকাবিলা করবে বলে মন্তব্যে করেছেন সূর্যবাবু।

আরও পড়ুন: উত্তরপ্রদেশে ছুটল বিজেপির অশ্বমেধের ঘোড়া, মুখ থুবড়ে পড়ল বুয়া-বাবুয়ার মহাজোট

ঘরোয়া আলোচনায় বাম নেতারা বলছেন, রাজ্যে ‘পরিবর্তনে’র পরে দল ভাঙানো, মিথ্যা মামলা দেওয়া থেকে কার্যালয় দখল— নানা ভাবে লাগাতার তৃণমূল সচেষ্ট ছিল বামেদের দুর্বল করতে। তার উপরে পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধীদের আটকানো হয়েছে গায়ের জোরে। এ সবের ফলেই বাম কর্মী-সমর্থকেরা বিজেপির চেয়ে তৃণমূলকে ‘বড় শত্রু’ বলে মনে করেছেন। দলীয় কর্মীদের পাশাপাশি যে ‘স্বাধীন ভোট’ বামেদের সঙ্গে ছিল, তার বড়সড় অংশই সরে গিয়েছে বিজেপির দিকে। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে না পারাও যে বড় ব্যর্থতা, মেনে নিচ্ছেন সিপিএম নেতারা। আবার জোট বা গ্রহণযোগ্য কোনও বিকল্প না থাকায় সংখ্যালঘুদের ভোটের বড় অংশ বাম ছেড়ে তৃণমূলের দিকে চলে গিয়েছে বলে মনে করছেন তাঁরা।

এরই পাশাপাশি নিচু তলার সিপিএম কর্মীরা আঙুল তুলছেন নেতাদের দিকেও। উত্তর ২৪ পরগনার আমডাঙার এক দলীয় কর্মী যেমন বলছেন, ‘‘পঞ্চায়েতে তৃণমূলের সঙ্গে লড়াই করে আমরা পঞ্চায়েত বাঁচিয়েছিলাম। স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল। কিন্তু এই ভোটের সময়ের আগে মাঝের কয়েক মাসে এরিয়া কমিটির নেতারাও আমাদের পাশে দাঁড়াতে আসেননি।’’ এই কর্মীদের মতে, বিজেপির ছাতার তলায় গেলে লড়াইয়ে সহায়তা মিলবে, এই আশা অনেকের মনেই কাজ করেছে।

Election Results 2019 লোকসভা নির্বাচন ২০১৯ Lok Sabha Election 2019 Left Front Kerala CPM
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy