দেশের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি থেকে ওড়িশা হয়ে মহারাষ্ট্র, আরাবল্লি থেকে মধ্য ভারতে হাসদেও বা পূর্ব ভারতের নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বৃষ্টি অরণ্য— ‘উন্নয়নের লক্ষ্যে’ দেশজুড়ে বিজেপি সরকারের উদ্যোগে বৃক্ষচ্ছেদন মহোৎসবের আবহে ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ করল গোয়ার বিজেপি সরকার। রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় উন্নয়নের নামে ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ করতে সক্রিয় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার।
গোয়ার অতিসংবেদনশীল পরিবেশ রক্ষায় রাজ্যের ৮২ লক্ষ বর্গমিটারেরও বেশি জমিকে ‘উন্নয়ন নিষিদ্ধ অঞ্চল’ বা ‘নো ডেভেলপমেন্ট জ়োন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে রাজ্যের বিজেপি-শাসিত সরকার। গোটা দেশের নানা প্রান্তে যখন উন্নয়নযজ্ঞের নামে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠছে, তখন সে রাজ্যে অপরিকল্পিত নির্মাণ কাজ বন্ধ করতে এবং রাজ্যের পাহাড়, ঢাল ও পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অন্যান্য এলাকাগুলোকে রক্ষা করার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার। নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের (টিসিপি) কর্তারা জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্তটি এই সংক্রান্ত বোর্ড দ্বারা অনুমোদিত হয়েছে। এর আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে মাজোরদা, গনসুয়া ও তাদের সংলগ্ন এলাকাগুলো। নতুন বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মোট ৮২,৮৫,০০০ বর্গমিটারেরও বেশি জমি এই তালিকার আওতাভুক্ত বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
গোয়ার সরকার জানিয়েছে যে, গত কয়েক বছরে ‘উন্নয়নে’র সঙ্গে তাল মিলিয়ে নির্মাণ কাজের কারণে সে রাজ্যে পাহাড় কাটা এবং একাধিক টিলা জাতীয় ভূমিকে সমতল করার প্রবণতা আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে গেছে। যা বন্ধ করাই এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য। রাজ্যের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে রক্ষা করা এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেই সরকার এই পদক্ষেপ করেছে বলে নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের কর্তারা উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে রাজ্যের পরিবেশ রক্ষা পরিকল্পনায় সরকারের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে কেন্দ্রের বিজেপি সরকারও সাহায্যে এগিয়ে এসেছে বলে পরিবেশ-কর্তাদের দাবি। মান্ডবী এবং জুয়ারি নদীর তীরবর্তী বিরাট এলাকাকে পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করার জন্য গোয়ার বন বিভাগের প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক। নদীর তীরবর্তী এই চিহ্নিত এলাকার পরিমাণ ৬,৭২৯.৫৪ হেক্টর বা প্রায় ৬.৭২ কোটি বর্গমিটার। রাজ্য সরকারের মতে, এর ফলে পরিবেশগত ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ভঙ্গুর এই অঞ্চলগুলোয় নতুন কোনও নির্মাণ বা খনন ঠেকাতে কর্তৃপক্ষ আরও কঠোর পদক্ষেপ করতে পারবে।
রাজ্যের বনমন্ত্রী বিশ্বজিৎ রাণে জানিয়েছেন, গোয়ার প্রধান নদীগুলোর চার পাশের অতিসংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তিনি আরও জানান যে, বন বিভাগ ইতিমধ্যেই নগর ও গ্রাম পরিকল্পনা বিভাগকে জানিয়ে দিয়েছে, এই চিহ্নিত এলাকাগুলোতে কোনও ধরনের নির্মাণ বা উন্নয়নের অনুমতি যেন না দেওয়া হয়। রাণে এর আগেই মান্ডবী ও জুয়ারি নদীর তীরবর্তী এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ এবং ভূমি উন্নয়নের ওপর কড়া নজর রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া গোয়া সরকার রাজ্যের ধানক্ষেত এবং নিচু জমিগুলোকেও ‘উন্নয়ন নিষিদ্ধ অঞ্চল’-এর তালিকায় আনার পরিকল্পনা করছে। মন্ত্রীর মতে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য হল, রাজ্যের কৃষিজমিকে রক্ষা করা, এ সব জায়গার অপব্যবহার রোধ করা এবং ভবিষ্যতের জন্য গোয়ার সবুজ প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা। গোয়া জুড়ে যখন বড় আকারের নির্মাণ কাজ, পাহাড় কাটা এবং পরিবেশ ধ্বংস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন পরিবেশবিদেরা। বিভিন্ন পরিবেশ সংগঠন এবং স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘ দিন ধরেই অতি-উন্নয়ন, দ্রুত নগরায়ন এবং রাজ্যের প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংসের বিরোধিতা করে এগুলি নিয়ে তীব্র আপত্তি জানাচ্ছিলেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)