Advertisement
E-Paper

সংখ্যায় আশার উড়ান, প্রশ্ন তবু বৃদ্ধির হিসেবে

গোলকধাঁধা। সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, অর্থনীতির পালে বাতাস লেগেছে। এ বার বৃদ্ধির নৌকা এগোবে তরতরিয়ে। চলতি অর্থবর্ষে তার হার পৌঁছে যাবে ৭.৬ শতাংশে। কিন্তু সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে অর্থনীতির আসল ছবি মেলাতে হিমসিম খাচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞই। আর তাই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশায় বুক বাঁধার বদলে বরং এই বৃদ্ধি কতটা হিসেবের কারসাজি, আগে তার উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ০৪:০৫

গোলকধাঁধা।

সরকারি পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, অর্থনীতির পালে বাতাস লেগেছে। এ বার বৃদ্ধির নৌকা এগোবে তরতরিয়ে। চলতি অর্থবর্ষে তার হার পৌঁছে যাবে ৭.৬ শতাংশে। কিন্তু সেই পূর্বাভাসের সঙ্গে অর্থনীতির আসল ছবি মেলাতে হিমসিম খাচ্ছেন অনেক বিশেষজ্ঞই। আর তাই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশায় বুক বাঁধার বদলে বরং এই বৃদ্ধি কতটা হিসেবের কারসাজি, আগে তার উত্তর খুঁজছেন তাঁরা।

২০১৫-’১৬ সালে বর্তমান বাজার দরে দেশে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের পরিমাণ (নমিনাল জিডিপি) এবং বৃদ্ধির হার কেমন হবে, সোমবার তার পূর্বাভাস প্রকাশ করল কেন্দ্র। তা অনুযায়ী, অক্টোবর-ডিসেম্বর ত্রৈমাসিকে তা হয়েছে ৭.৩%। চিনের ৬.৮ শতাংশের তুলনায় ঢের বেশি।

একই সঙ্গে কেন্দ্রের দাবি, এই অর্থবর্ষের শেষে বৃদ্ধি পৌঁছবে ৭.৬ শতাংশে। গত বারের ৭.২ শতাংশের তুলনায় তো বটেই পাঁচ বছরে যা সব থেকে বেশি।

প্রথম দুই ত্রৈমাসিকে (এপ্রিল-জুন এবং জুলাই-সেপ্টেম্বর) বৃদ্ধি ছিল যথাক্রমে ৭ ও ৭.৪ শতাংশ। তৃতীয়টিতে ৭.৩%। আগের বারের থেকেও কম। তাহলে শেষ তিন মাসে কোন জাদুকাঠিতে ভর করে চোখ কপালে তোলার মতো বৃদ্ধি আশা করছে কেন্দ্র? যা দিয়ে বছরের ৭.৬ শতাংশের লক্ষ্যভেদ সম্ভব?

এখানেও চমক! এ দিন পরিসংখ্যান মন্ত্রক জানিয়েছে, সংশোধিত হিসেব অনুযায়ী প্রথম দুই ত্রৈমাসিকে অর্থনীতি আসলে দৌড়েছে অনেক বেশি গতিতে। বৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৭.৬ ও ৭.৭ শতাংশ। যা দেখে বিশেষজ্ঞদের অনেকে বলছেন, ৭.৬ শতাংশের লক্ষ্য ছোঁওয়ার অর্ধেক কাজ তো এখানেই সারা।

কোন ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এমন চমকে দেওয়ার মতো ছবি তুলে ধরছে অর্থনীতি? সরকারি তথ্য দেখাচ্ছে, এ বছর কল-কারখানায় উৎপাদন আগের বারের (৫.৫%) থেকে বাড়বে অনেক দ্রুত (৯.৫%)। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে সেখানেও। প্রতি মাসে যে শিল্পোৎপাদন সূচক কেন্দ্র প্রকাশ করে, তার একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে কল-কারখানায় পণ্য তৈরি বৃদ্ধির প্রভাব। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপুল ফারাক দেখা যাচ্ছে এই দুই হিসেবের মধ্যেও। এ দিনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিপুল জোয়ার এসেছে উৎপাদন শিল্পে। আর শিল্প সূচককে সত্যি মানলে কল-কারাখানায় উৎপাদন এখনও ঝিমিয়ে!

সম্পদ পরিচালনা সংস্থা অ্যাম্বিট ক্যাপিটালের অর্থনীতিবিদ রীতিকা মানকর মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘শুধু পরিমাণ নয়, দিশার দিক থেকেও জিডিপির এই হিসেব পরষ্পর বিরোধী। আমরা মনে করি, বৃদ্ধির হার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে হিসেব করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে সংশোধন করে তা কমাতে হবে।’’ সংশয়ের কুয়াশা রয়েছে পরিষেবা ও কৃষিকে ঘিরেও।

অর্থ বিষয়ক সচিব শক্তিকান্ত দাসের দাবি, ‘‘বৃদ্ধির দিশা ইতিবাচক। দেড় বছরে কেন্দ্র যে নীতি ও সংস্কারের পথে চলছে, তার ফল দেখা যাচ্ছে।’’ কেন্দ্র এ ভাবে ভারতকে লাগাতার বিশ্বের দ্রুততম বৃদ্ধির দেশ হিসেবে তুলে ধরলেও, বারবার তার বিরুদ্ধে যুক্তি খাড়া করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের যুক্তি, অধিকাংশ সংস্থার আর্থিক ফলাফল থেকে স্পষ্ট যে, বিক্রিবাটা ভাল নয়। ব্যাঙ্ক থেকে ধার নেওয়ার চাহিদা সে ভাবে বাড়ছে না। ভাটা কাটেনি বেসরকারি বিনিয়োগে। জমি-জট, লাল ফিতের ফাঁস সমেত বিভিন্ন কারণে থমকে রয়েছে বহু প্রকল্প। তাই শত চেষ্টাতেও রাশ টানা কঠিন হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কগুলির অনুৎপাদক সম্পদে। তাই তাঁদের প্রশ্ন, বৃদ্ধির নিরিখে যে দেশ দুনিয়ায় সবার আগে দৌড়চ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাল সেখানে এমন আধসেদ্ধ কেন?

সম্প্রতি এক নিবন্ধে অর্থ মন্ত্রকের প্রাক্তন মুখ্য উপদেষ্টা অশোক লাহিড়ি লিখেছিলেন, অর্থনীতির বিবর্ণ ছবি কিছুটা ধরা পড়ে যাবে নমিনাল জিডিপির পূর্বাভাসে। যেহেতু তার সাপেক্ষে রাজকোষ ঘাটতির হিসাব কষা হয়, দেখা যাবে তা লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে বেঁধে রাখতে হিমসিম খাচ্ছে অর্থ মন্ত্রক। এ দিন হয়েছেও কিছুটা তাই। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরে ওই জিডিপির পরিমাণ হবে ১১৩.৫১ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ গত বাজেটে সেটি ১৪১ লক্ষ কোটি হবে ধরে নিয়ে রাজকোষ ঘাটতিকে তার ৩.৯ শতাংশে বেঁধে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। কিন্তু জিডিপি-ই যদি এ ভাবে কমে যায়, তবে ঘাটতিকে তিনি কী ভাবে বাঁধবেন, সেই প্রশ্ন উঠছে।

এখন পরিকাঠামোয় সরকারি লগ্নি বাড়ানোর দোহাইয়ে জেটলি যদি ঘাটতির রাশ আলগা করেন, তবে প্রশ্ন উঠবে তা ছাঁটাইয়ের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। আবার লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে থাকতে আয় বাড়াতে ও খরচ কমাতে হবে তাঁকে।

বিশ্ব বাজারে তলানিতে ঠেকা তেলের দামের সুযোগে পেট্রোল-ডিজেলে বারবার উৎপাদন শুল্ক বাড়িয়ে মোটা টাকা ভাঁড়ারে তুলেছে কেন্দ্র। কিন্তু প্রশ্ন হল, শুধু তাতে ঘাটতি সামাল দেওয়া যাবে কি?

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy