ঘোষণা করা হয়েছিল গত সপ্তাহেই। এ বার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মন্ত্রকের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘জাতীয় সন্ত্রাসদমন নীতি’ ঘোষণা করা হল। চতুর্মুখী এই সন্ত্রাস দমন কৌশলের (কাউন্টার টেররিজ়ম স্ট্র্যাটেজি) লক্ষ্য— পরিবর্তিত ও প্রযুক্তিনির্ভর সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, সুসংহত ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করা, প্রত্যাঘাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং আইনের শাসন মেনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
‘প্রহার’ নীতির প্রথমেই তুলে ধরা হয়েছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় ‘জিহাদি নেটওয়ার্ক’, পড়শি দেশ (পাকিস্তান) থেকে ড্রোনের মাধ্যমে অস্ত্র ও মাদকের চোরাচালান, সাইবার সন্ত্রাস, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং রাসায়নিক, জৈব ও তেজস্ক্রিয় পরমাণু পদার্থের অপব্যবহারের সম্ভাবনা পর্যন্ত ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মুখোমুখি ভারত এখন কতটা বিপদের মুখে। তুলে ধরা হয়েছে, আল কায়দা এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীগুলির স্লিপার সেলের তৎপরতার কথাও। এর পরের ধাপে রয়েছে সেগুলি মোকাবিলার নীতি এবং কৌশল।
‘প্রহার’ নীতির ভিত্তি গড়ে উঠেছে সন্ত্রাসের শিকারদের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি এবং হিংসা প্রতিরোধের উপর। নীতির প্রধান লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদী হামলা প্রতিরোধ, সামরিক কৌশলে দ্রুত ও আনুপাতিক প্রতিক্রিয়া। ‘হোল অফ গভর্নমেন্ট’ পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট সমস্ত সরকারি বিভাগের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতার সমন্বয়ের বিষয়টিও বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে এই নীতিতে। পাশাপাশি, সন্ত্রাস দমনের লক্ষ্যপূরণ করতে গিয়ে যাতে মানবাধিকার রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে আঘাত না আসে, তা-ও নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করতে না দেওয়া, আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং ‘হোল অফ সোসাইটি’ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সামাজিক পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা জোরদার করার কথাও বলা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে সীমান্তপারের পৃষ্ঠপোষকতায় সন্ত্রাসের মুখোমুখি। জিহাদি সংগঠন ও তাদের সহযোগী ফ্রন্ট সংগঠনগুলি ধারাবাহিক ভাবে হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রয়েছে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীর ‘স্লিপার সেল’-এর মাধ্যমে উস্কানি ও হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা। প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়েও বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মন্ত্রক। পাঞ্জাব সীমান্ত এবং জম্মু ও কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় ড্রোন ব্যবহার করে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদতের চেষ্টা চালাচ্ছে পাকিস্তান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ‘ইনস্ট্যান্ট মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম’-এর মাধ্যমে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি প্রচার, নিয়োগ ও যোগাযোগ রক্ষার পাশাপাশি এনক্রিপশন, ডার্ক ওয়েব এবং ক্রিপ্টো ওয়ালেটের মাধ্যমে গোপন লেনদেনও বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে সাইবার হামলায় অপরাধী হ্যাকার এবং পড়শি দেশের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কথাও জানানো হয়েছে।
এর মোকাবিলায় সন্ত্রাসে আর্থিক মদত রুখতে আইনি ব্যবস্থা শক্তিশালী করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে ‘প্রহার’ নীতিতে। স্থল, জল ও আকাশপথে সীমান্ত সুরক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বিদ্যুৎ, অসামরিক বিমান চলাচল, বন্দর, প্রতিরক্ষা ও পরমাণু শক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে সন্ত্রাসবাদী হানা থেকে সুরক্ষিত রাখার উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিতে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদী হামলার ক্ষেত্রে স্থানীয় পুলিশই ‘প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী’র ভূমিকা নেবে, পরের ধাপে পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুযায়ী প্রয়োজনে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিশেষ বাহিনী সহায়তা করবে। ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ড (এনএসজি) জাতীয় স্তরে ‘নোডাল কাউন্টার-টেরর ফোর্স’ হিসাবে কাজ করবে। তাদের কাজ হবে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশের সন্ত্রাসদমন বাহিনীগুলিকে সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (এনআইএ) এবং রাজ্য পুলিশ সংস্থার সমন্বয়ের মাধ্যমে তদন্ত এবং দোষী সাব্যস্তকরণ শুরু হলে তা ভবিষ্যৎ হামলার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। ‘ভবিষ্যতের সন্ত্রাসবাদ’ রোখার পদক্ষেপ হিসাবে ‘চরমপন্থা-প্রতিরোধ’ (ডি-র্যাডিক্যালাইজেশন)-এ বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে ‘প্রহার ডকট্রিন’-এ। এ ক্ষেত্রে গোয়েন্দা ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলিকে পরিস্থিতি অনুযায়ী ধাপে ধাপে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সন্ত্রাসবাদের আন্তর্জাতিক চরিত্রের কথা উল্লেখ করে শাহের মন্ত্রক তথ্য বিনিময়, প্রত্যর্পণ চুক্তি ও সহযোগিতামূলক কাঠামোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অংশীদারির মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী চিহ্নিতকরণ ও মোকাবিলার বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছে ‘প্রহার’-এ।