Advertisement
E-Paper

দক্ষিণের বাড়ি

প্রোটোকল মেনে প্রতি বছর শীতকালে কয়েকটি দিন সিকানদরাবাদের ‘রাষ্ট্রপতি নিলয়ম’-এ সপরিবার কাটিয়ে যান ভারতের রাষ্ট্রপতি। প্রণব ও শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেই সেখানে কয়েকটি দিন কাটিয়েছিলেন সঙ্গীতা ঘোষ। প্রতিবেদনটি পুনঃপ্রকাশিত হল।প্রোটোকল মেনে প্রতি বছর শীতকালে কয়েকটি দিন সিকানদরাবাদের ‘রাষ্ট্রপতি নিলয়ম’-এ সপরিবার কাটিয়ে যান ভারতের রাষ্ট্রপতি। প্রণব ও শুভ্রা মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেই সেখানে কয়েকটি দিন কাটিয়েছিলেন সঙ্গীতা ঘোষ

শেষ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৭ ১৪:০০
সিকানদরাবাদের এই ‘রাষ্ট্রপতি নিলয়ম’-এ সপরিবার শীতের ছুটি কাটাতে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।

সিকানদরাবাদের এই ‘রাষ্ট্রপতি নিলয়ম’-এ সপরিবার শীতের ছুটি কাটাতে এসেছিলেন প্রণব মুখোপাধ্যায়।

শুভ্রা মুখোপাধ্যায় বললেন, “হায়দরাবাদে এসে একটু মুক্তো দেখব না? ফলকনুমা প্রাসাদেও যাওয়ার ইচ্ছা আছে।” হায়দরাবাদে এসেছেন তিনি, স্বামীর সঙ্গে। তবে নিছক বেড়াতে নয়। কারণ তাঁর আর একটা পরিচয় আছে। তিনি ভারতের ফার্স্ট লেডি। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রী।

২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। সস্ত্রীক প্রণব মুখোপাধ্যায় লোকলস্কর নিয়ে পৌঁছেছেন হায়দরাবাদের সংলগ্ন সিকানদরাবাদের বোলারাম ক্যান্টনমেন্ট অঞ্চলের ‘রাষ্ট্রপতি নিলয়ম’-এ। রাষ্ট্রপতির প্রধান আবাসন যেমন দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন, তেমনই রাষ্ট্রপতির দক্ষিণ ভারতের বাড়ি রাষ্ট্রপতি নিলয়ম। প্রোটোকল মেনে প্রতি বছর শীতকালে কয়েকটা দিন এখানে সপরিবার কাটিয়ে যান ভারতের রাষ্ট্রপতি। সেই ১৯৫৬ সাল, রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদের সময় থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে।
দেশের উত্তর-দক্ষিণের সংহতি-সমতা বজায় রাখতেই এই বাৎসরিক সফর রাষ্ট্রপতির। ডিসেম্বরের নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় তিনি সফর করেন দক্ষিণী রাজ্যগুলি, উদ্বোধন-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেন, দেখা করেন বিভিন্ন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে। স্থানীয় মানুষের সুখ-দুঃখ-আশা-আকাঙ্ক্ষা-সমস্যা বোঝার চেষ্টা করেন। প্রণববাবুর ঠিক আগে নিলয়মে ঘুরে গিয়েছেন প্রতিভা পাটিলও।
দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনের অদূরে ইন্ডিয়া গেটে বিক্ষোভকারীরা যখন মোমবাতি নিয়ে সমাবেশ করছেন, তখন কিন্তু রাষ্ট্রপতি হায়দরাবাদে।
ফার্স্ট ফ্যামিলি কেমন করে কাটান এই দিনগুলি? ছুটির আবেশ থাকে? না কি নিত্য দিনের মতো চূড়ান্ত ব্যস্ততা? প্রোটোকলের ঠাসবুনুনি?

আরও পড়ুন: রাজনীতির দাবা বারে বারে ঘুঁটি সাজিয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে

৬৪তম প্রজাতন্ত্র দিবসে রাষ্ট্রপতি ভবনে ভুটানের রাজা-রানির সঙ্গে শুভ্রা মুখোপাধ্যায়

একেবারে ঘরোয়া বাঙালি খাবার

প্রণব-শুভ্রা কেমন করে সময় কাটালেন, কী খেলেন?
সদাব্যস্ত প্রণববাবু এখানেও চূড়ান্ত ব্যস্ততায় দিন কাটালেন। বিশ্রাম বা অবকাশের কোনও ব্যাপারই নেই। ২৭ ডিসেম্বর চতুর্থ বিশ্ব তেলুগু কংগ্রেসের উদ্বোধন করতে তিরুপতি, পরের দিন চেন্নাই সফর, ২৯ ও ৩০ মহারাষ্ট্রের সোলাপুর-পান্ধারপুর ও মুম্বই। সব দিনই বিকেলের দিকে ছিল হায়দরাবাদে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ৩১ তারিখ সুফি সংগঠন থেকে শুরু করে নয় নয় করে ২০টি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে দেখা করেন তিনি নিলয়ম চত্বরে! ফাঁকফোকরে প্রচুর বাংলা বইও পড়েন।
ফার্স্ট লেডি গিয়েছিলেন ফলকনুমা প্রাসাদে। ষষ্ঠ নিজামের বাসস্থানটি এখন নামজাদা হোটেল। এই প্রতিবেদককে বললেন, “কী বিশাল লাইব্রেরি! একটা করে বই রোজ পড়লেও ১৬ বছর লাগবে নাকি সব বই পড়ে ফেলতে। আর দেখেছ, কোথাও এক ফোঁটা ধুলো নেই!” তাঁর কণ্ঠে কিশোরীর উচ্ছ্বাস। মুক্তোর কয়েকটা দুল কিনলেন তিনি। উপহার দেওয়ার জন্য। “বাবা! শাড়ির কী দাম, দরকার নেই।” ফার্স্ট লেডির সোজাসাপ্টা প্রতিক্রিয়া। শরীরটা একটু খারাপ হয়ে যাওয়ায় বাকি দিনগুলি নিলয়মে বিশ্রামেই কাটালেন। বই পড়লেন, সব অনুষ্ঠানসূচি বাতিল করে দেখা করলেন ডিম্পি ভট্টাচার্যের মতো দু’-এক জনের সঙ্গে। তবে নিলয়ম চত্বরে স্থানীয় লোকেদের তৈরি মন্দির দেখে দারুণ উচ্ছ্বসিত তিনি। “এখানে সাপের উপদ্রব, তাই মন্দির বানিয়েছেন স্থানীয় মানুষেরা। কী সুন্দর মূর্তি।’’ রাষ্ট্রপতির সফর কালে এই চত্বরে প্রতি বার রাখা হয় কয়েক জন সাপুড়েকে। এই কথোপকথনের সময় নাচের অনুষ্ঠান সেরে মা-বাবার সঙ্গে দেখা করতে নিলয়মে হাজির রাষ্ট্রপতি-কন্যা শর্মিষ্ঠা ওরফে মুন্নি।

আরও পড়ুন: রাইসিনার রান্নাঘরে আলুপোস্ত, তালের বড়া


দক্ষিণে এসে কী দক্ষিণী খানা খেলেন তাঁরা? হায়দরাবাদি বিরিয়ানি? মনে হয় না। তবে হায়দরাবাদি মিষ্টি ‘কুরবানি কা মিটা’ চেখে দেখলেন। সফরসঙ্গী প্রধান পাচক মির্জা নাফিস বেগ জানালেন, সহায়ক জগদীশ ও নরেন্দ্রকে নিয়ে তিনি পুঁই শাক, কলমি শাক, লাল শাক— সবই রান্না করে ফেলেন অনায়াসে। রাষ্ট্রপতির খাদ্য সেই হালকা রুই মাছের ঝোল, জিরা-হলুদ-ধনে পাতা ও একটি কাঁচা লঙ্কা দিয়ে। মায়ের জন্য (শুভ্রাদেবী) পনির সব্জি, মুগ ডাল, উচ্ছেআলুসেদ্ধ মাখা। একেবারে বাঙালি ঘরোয়া খাবার।

খাওয়াতে বরাবরই ভালবাসতেন। বাঙালি রান্নার হাতও ছিল তুখোড়

ঘুরে দেখা যাক নিলয়ম

প্রথম দর্শনে অবাক হতে হয়। রাষ্ট্রপতি ভবন যদি হয় সমুদ্র, এই আলয়টি যেন শান্ত দিঘি। উত্তরের রাইসিনা (রাষ্ট্রপতি ভবন) আর দক্ষিণের রাইসিনা (রাষ্ট্রপতি নিলয়ম) আক্ষরিক অর্থেই উত্তর মেরু-দক্ষিণ মেরু। স্মৃতিতে ফিরে ফিরে আসে ভবনের ছবিটাই। দিল্লির ভবন ঘুরে দেখে, সেখানে রাত্রি যাপন করে এই প্রতিবেদকের মনে হয়েছিল, বিশালত্ব-জাঁকজমক-জৌলুস-ইতিহাস...এ তো জীবন্ত রূপকথা! আর দক্ষিণের এই নিলয়ম ইউরোপীয় স্থাপত্যের একটি ছিমছাম একতলা বাংলো। ভবনের তুলনায় এক্কেবারে সাদামাঠা। অনেকটা সেই ‘বাঁখারি-বাঁধা মেহেদির বেড়া,/তার ওপারে কলা পেয়ারা নারকেলের বাগান,/আরও দূরে গাছপালার মধ্যে একটি কোঠাবাড়ির ছাদ...’-এর মতো।

উত্তর ও দক্ষিণে দু’বাহু বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে পুবমুখী বাড়িটি। গেট দিয়ে ঢুকে ফোরকোর্ট। রাষ্ট্রপতি ভবনেরই মতো। তবে ভবনের ফোরকোর্টে মিহি বালি ছিল। এখানে গুঁড়ো সুরকি দিয়ে রাঙানো মাটি, যেন বীরভূমের লালমাটি! রাষ্ট্রপতি তো বীরভূমেরই ভূমিপুত্র। প্রায় ৯৮ একর এলাকা নিয়ে নিলয়মের মূল ক্যাম্পাস। গেটের বাইরে ক্যাম্পাস টু, যেখানে দিল্লি থেকে এসে থাকেন ভবনের কর্মী ও অফিসাররা। তৃতীয় ক্যাম্পাসটি এখনও রুক্ষ জমি।

আরও পড়ুন: ইন্দিরা গাঁধীই দিয়েছিলেন ‘গীতাঞ্জলি’ নামটা

মূল ভবনটির তিনটি অংশ। মধ্যস্থলে ‘সেন্ট্রাল উইং’ বা ‘ফ্যামিলি উইং’, এই উইংয়ের দু’পাশে ‘প্রেসিডেন্টস উইং’ এবং ‘এডিসি উইং’। সেন্ট্রাল উইং-এর সঙ্গে প্রেসিডেন্টস উইং একটি ঢাকা বারান্দা দিয়ে জোড়া। এডিসি-র অংশটি আলাদা। সেখানে বসে গম্ভীর মুখে কাজকারবার সামলাচ্ছেন এডিসি শোভিত পাণ্ডে। বাড়িটির তিনটি গেট (দিল্লির ভবনের ৩৮টি গেট!)। এক নম্বর দিয়ে ঢোকেন গৃহকর্তা, দু’নম্বরটি পরিবার ও অন্যদের, তিন নম্বর দিয়ে মালপত্র ও অন্যান্য জিনিস। তবে প্রণববাবু বোলারামে আসার পরে তৃতীয় গেটটি পত্রিকার এই প্রতিবেদকের জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। অন্য কোনও বেসরকারি চ্যানেল বা কাগজের সাংবাদিকের প্রবেশ ছিল নিষিদ্ধ।

তবে প্রবেশপথে স্বাভাবিক ভাবেই কঠোর নিরাপত্তা। দিল্লি থেকে আসা গোয়েন্দা-পুলিশ তো বটেই, সঙ্গে অন্ধ্রপ্রদেশ ও হায়দরাবাদ পুলিশের বেষ্টনী, আধা সামরিক বাহিনী, আরও কী কী সব। প্রতি দিনই গেটে রক্ষী বদল। আসে নতুন রক্ষী, নতুন করে ছানবিন। নতুন করে ফের জবানবন্দি। ক্যামেরা কিছুতেই না, টেপরেকর্ডার না।

তবে অন্দরে প্রবেশের পরে সৌজন্যর কোনও খামতি নেই। চলুন নিলয়মের অন্দর ঘুরে দেখা যাক।

মূল ভবনটি ২৫০০ বর্গমিটার, অর্থাৎ প্রায় ২৬ হাজার বর্গফুট (দিল্লির ভবনটির ফ্লোর এরিয়া দু’লক্ষ বর্গফুট)।

সেন্ট্রাল উইং-এ ঢুকে রোমান আর্চযুক্ত করিডর, তবে দিল্লির ভবনের মতো কারুকাজ নেই। সাদামাঠা। করিডরের দু’পাশে শ্বেতশুভ্র দেওয়ালে সাদার মধ্যে নীল দিয়ে কারুকাজ করা চিনেমাটির ওয়ালপ্লেট সার দিয়ে সাজানো। গাঢ় মেরুন কাপের্ট কাঠের মেঝেতে। আর্চের উপরে এক বিরাট অশোকস্তম্ভ! রাষ্ট্রপতি ভবনের সর্বত্রই, এমনকী কাপ প্লেট, বাসনপত্তরেও অশোকস্তম্ভ খোদাই করা। নিলয়মের বাসনে খোদাই করা ‘গভর্নমেন্ট অফ অন্ধ্রপ্রদেশ ডিপার্টমেন্ট অব প্রোটোকল’।

পা রাখা যাক প্রেসিডেন্টস উইং-এ

শোওয়ার ঘর। সঙ্গে জোড়া স্নানঘর। সংলগ্ন প্রার্থনা ঘর বা মেডিটেশন রুম। কোনও দেবদেবীর মূর্তি নেই। শোওয়ার ঘরের টেবিলে বুদ্ধমূর্তি ও গাঁধী মূর্তি। (ভবনেও হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি নেই, রয়েছে শান্তির প্রতীক বুদ্ধের ছবি, মূর্তি ও গাঁধী মূর্তি।) পর্দা খাদির কাপড়ের হলদে ঘেঁষা উজ্জ্বল ঘিয়ে রঙের। দরবার হল বসার ও খাওয়ার জায়গা। সেখানে রাখা আছে একটি ট্রেডমিল। প্রণববাবু তো বহু বছর ধরেই ভোরে উঠে বাড়ির লনে নিয়মিত ‘মর্নিং ওয়াক’ করে থাকেন! রয়েছে ড্রেসিং রুম, প্যান্ট্রি, বারান্দা।

রবীন্দ্রভবনে একটি অনুষ্ঠানে এমকে নারায়ণের সঙ্গে শুভ্রা মুখোপাধ্যায়

সেন্ট্রাল উইং

রাষ্ট্রপতির পরিবারের সদস্যরা এই উইং-এ থাকেন। এখানে মোট ৫টি স্যুইট। করিডরের পূর্ব দিকে মর্নিং রুম ও স্টাডি একসঙ্গে। মর্নিং রুমে রাষ্ট্রপতি অতিথি ও প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করেন। পাশে জোড়া শোওয়ার ঘর, জোড়া স্নানঘর, ড্রেসিং রুম, বারান্দা। করিডরের পশ্চিমে সিনেমা হল, বিরাট ডাইনিং রুম, আর চারটি স্যুইট। চার নম্বর স্যুইটে ছিলেন ফার্স্ট লেডি শুভ্রা মুখোপাধ্যায়। এই উইং-এর সব পর্দার রঙই হলদে ঘেঁষা। ঘটনাচক্রে ফার্স্ট লেডির প্রিয় রং হলুদ। তাঁর শোওয়ার ঘরটি ছিমছাম। দেওয়ালে অনেক ছবি। অমৃতা শের গিলের ‘ক্যামেলস’, যামিনী রায়ের ‘রথ’, গণেশ পাইনের ‘বীর বাহাদুর’। এবং স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের ‘হেড স্টাডি’। তিনি ছবিটি দেখে উচ্ছ্বসিত। তাঁর প্রতিক্রিয়া, “ছবিটি হয়তো আসল নয়। তবুও...রবীন্দ্রনাথের নামটা জড়িয়ে আছে তো”। রবীন্দ্র অনুরাগিণী শুভ্রাদেবী। রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়িকাও। তবে ফার্স্ট লেডি হওয়ার পর থেকে প্রোটোকল মেনে তাঁর অনুষ্ঠান করা বন্ধ।

এডিসি উইং

এই উইং-এ থাকেন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সফররত সেনাবাহিনীর অফিসাররা (এডিসি)। করিডরে বেইজ রঙের উপর ফ্লোরাল ডিজাইনের গালিচা, সিল্কের পর্দা, গদি আঁটা চোয়ার, দেওয়ালে নৃত্যরত গণপতির ছবি, ললিত কলা অকাদেমির হাতি, বিশ্বব্রহ্মা মন্দির। চিনেমাটির সাদা টবে প্ল্যান্ট।

ইতিহাসের পাতায় নিলয়ম

ভবনের মতো নিলয়মের পরতে পরতেও জড়িয়ে আছে ইতিহাস। উনবিংশ শতাব্দীর মধ্য ভাগে সাবসিডিয়ারি অ্যালাইয়েন্সে চুক্তিবদ্ধ নিজাম বোলারামের জমি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেন। ১৮৬০ সালে তৈরি হয় এই বাংলো বাড়ি। হায়দরাবাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় প্রসিদ্ধ রাজেন্দ্র প্রসাদের কথায়, “দ্বিতীয় নিজাম জমিটি ব্রিটিশদের দিয়েছিলেন। নিলয়ম আদতে আর্মি হাউস। প্রধান সেনা অফিসারের আবাসন ছিল এই বাড়িটি। স্যর উইনস্টন চার্চিলও (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী) এখানে এসে থেকে গিয়েছেন।’’ প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতির হায়দরাবাদ সফরকালে সেনাপ্রধান জয়ন্ত চৌধুরীর কথা প্রবীণ হায়দরাবাদিদের মনে পড়ে যায়। ১৯৫০ সালে যিনি ভারতের সঙ্গে হায়দরাবাদ সংযুক্তিকরণের মূল হোতা ছিলেন। এই নিলয়মের দখল নেন তিনিই।

মিলেমিশে একাকার ইতিহাস-বর্তমান

গোধূলির আলো মাখা আকাশকে পিছনে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিলয়ম। জ্বলে উঠেছে বাগানের সব সোলার বাতি। সবুজ অন্ধকার ক্রমশ গ্রাস করছে গোটা এলাকা। নিলয়মের বাগানের সেই বিরাট গাছটাও একটু পরে অন্ধকার হয়ে যাবে। সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠে যে গাছটিকে দেখে রাষ্ট্রপতির মনে পড়ে যায় পল্টুকে (প্রণববাবুর ডাক নাম)। যে পল্টু বাল্যকালে এই রকমই এক বকুল গাছের কোটরে বইপত্তর লুকিয়ে রেখে খেলতে যেতেন! গাড়ির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিলয়ম ক্রমশ অপস্রিয়মাণ। প্রেক্ষাপটে নিজাম আসফ জাহ, জয়ন্ত চৌধুরী, প্রণববাবু, শুভ্রাদেবী, পল্টু....সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে।

অন্য এক ‘মুঘল গার্ডেন্স’

রুদ্রাক্ষ, রোজমেরি, তুলসী, লবঙ্গ তুলসী, সর্পগন্ধা, সমুদ্রপালা, চন্দন, লেমন গ্রাস, কালমেঘ, ইসবগুল, আদা, নীলি, সরস্বতী আকু, ভামু আকু...জানা-অজানা মিলিয়ে মোট ১১৬ প্রজাতির ভেষজ উদ্ভিদ নিয়ে নিলয়মের পিছন দিকে বিশাল ভেষজ উদ্যান। এই উদ্যান নিলয়মের ‘মুঘল গার্ডেন্স’। সর্দিকাশির মতো সাধারণ রোগ থেকে শুরু করে চুল পড়া, খুসকি, দাঁদ, অম্বল, ঘা, রক্তাল্পতা, স্নায়ু-যকৃৎ-কিডনির সমস্যা, হাঁপানি, কুষ্ঠ, এমনকী স্ট্রেস সংক্রান্ত সমস্যা, স্মৃতিভ্রংশ...এই উদ্যানে কোন রোগের ভেষজ-সমাধান নেই! পূর্বতন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা দেবী সিংহ পাটিল এই উদ্যানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন দু’বছর আগে বড়দিনে। লতানো গুল্ম-গাছপালা-ঝোপঝাড় বেড়ে উঠে সৃষ্টি করেছে অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ।

সবুজে-সবুজ নিলয়মের বিশাল চত্বর। ময়দানের মতো সবুজ ঘাসে ছাওয়া লন। ৩৫ একর জমির উপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সাড়ে চার হাজার গাছ। বট-অশ্বত্থের পাশাপাশি আম-পেয়ারা-আমলা-নারকেল-বেদানা-সফেদা-লিচু...বকুল, হাস্নাহানা, গাঁদা, হরেক রঙের গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, জবা...এমনকী তুলসীমঞ্চও। একেবারে যেন বর্ধিষ্ণু সুখী এক গৃহের ছবি!

(লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল ১২ জানুয়ারি ২০১৩, আনন্দবাজার পত্রিকায়)

Presidential Election President Election Presidential Poll president Ram Nath Kovind Meira Kumar Pranab Mukherjee রাষ্ট্রপতি নির্বাচন রামনাথ কোবিন্দ মীরা কুমার প্রণব মুখোপাধ্যায়
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy