Advertisement
৩১ জানুয়ারি ২০২৩
Budget

‘দুনিয়ার সবচেয়ে বড়’ স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প সুরক্ষিত তো?

গরিব মানুষ কি সত্যি বিনে পয়সায় চিকিৎসা পাবেন?একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই প্রকল্প জনমোহিনী তো নয়ই, অঙ্কের হিসাবও ঠিকমতো মিলছে না।

ইন্দ্রনীল মুখোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ১৮:২১
Share: Save:

এ বারের কেন্দ্রীয় বাজেট নাকি বেশ জনমহিনী! সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আর অর্থমন্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। যদিও কিছু নিন্দুক বলছেন, জনমোহিনী হবে না, সামনেই যে লোকসভা ভোট! সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছে স্বাস্থ্য সুরক্ষা-র আশ্বাস! এখন থেকে নাকি দেশের দশ কোটি গরিব পরিবারের প্রায় ৫০ কোটি মানুষের পাঁচ লক্ষ টাকা অবধি স্বাস্থ্যের খরচ বহন করবে সরকার। অনেকে মনে করছেন প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা যেমন ‘ওবামা কেয়ার’ শুরু করে বহু গরিব আমেরিকাবাসীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন, ২০১৮-র বাজেটের প্রস্তাবিত এই ‘মোদি কেয়ার’ সে রকমই যুগান্তকারী। অর্থমন্ত্রী তো সগর্বে ঘোষণা করলেন, এটাই নাকি দুনিয়ার সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প।

Advertisement

একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই প্রকল্প জনমোহিনী তো নয়ই, অঙ্কের হিসাবও ঠিকমতো মিলছে না।

২০০৮-এ কেন্দ্র রাষ্ট্রীয় স্বাস্থ্যবিমা চালু করে যার মাধ্যমে গরিব পরিবারের জন্য ৩০ হাজার টাকা অবধি হাসপাতালের খরচ সরকার বহন করে। দেখাদেখি বহু রাজ্য এ রকম প্রকল্প ঘোষণা করেছে। পরিষেবা কেনা হচ্ছে মূলত বেসরকারি হাসপাতাল থেকে, সরকার নির্ধারিত হারে।

এই নতুন প্রকল্পে ‘কভারেজ’ ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ লাখ করার কথা ভাবা হচ্ছে। কভারেজ যদি বাড়ে তার জন্য সরকারকে বিমা সংস্থাগুলোকে বেশি হারে প্রিমিয়ামও দিতে হবে। ৫ লাখ কভারেজ-এর জন্য প্রিমিয়ামের যা বাজার দর, তার অর্ধেক হারেও যদি সরকারকে প্রিমিয়াম গুনতে হয়, তবে ১০ কোটি পরিবারের জন্য প্রায় ১.২ লক্ষ কোটি টাকা লাগবে। এই প্রকল্প চালানোর খরচ জুড়লে অঙ্কটা দেড় লক্ষ কোটি ছাড়িয়ে যাবে। এখন কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্যে যা খরচ করে এটা তার প্রায় তিন গুণ। কেন্দ্র আর সব রাজ্য মিলিয়ে স্বাস্থ্যে যা খরচ তার দ্বিগুণের থেকেও বেশি। বাজেট খতিয়ে দেখলে বোঝা যায়, বিমা প্রকল্পে এ বার মাত্র ২০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। ব্যাপারটা অনেকটা ‘পর্বতের মূষিক প্রসব’-এর মতোই হাস্যকর!

Advertisement

একটা প্রশ্ন আসতেই পারে, এত টাকা আসবে কোথা থেকে?

স্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকারি খরচ ভারতে খুবই কম, এটা বাড়ানো অবশ্যই দরকার। তাই টাকা কথা থেকে আসবে সেটা বড় প্রশ্ন নয়। যেটা আরও জরুরি, এটাই কি সরকারি খরচ বাড়ানোর সেরা উপায়? সত্যিই কি এর ফলে মানুষ স্বাস্থের জন্য দারিদ্র্যকরণের হাত থেকে বাঁচবেন? গরিব মানুষ কি সত্যি বিনে পয়সায় চিকিৎসা পাবেন?

প্রথমত, হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসার পিছনে যা খরচ হয় তা মূল খরচের মাত্র ৪০%, যেটা বিমার আওতায় পড়ে। বাকি ৬০% খরচ হয় ডাক্তার দেখানোর পিছনে, ওষুধ কেনায়, বা বিভিন্ন পরীক্ষার পিছনে। এ সব খরচ বিমার আওতায় পড়ে না। শুধু ওষুধ কিনতে গিয়ে ৩.৪ কোটি মানুষ দারিদ্রের কবলে পড়েন। মূল কথা হল, এই প্রকল্প দেশের ৪০% মানুষের একটা ভগ্নাংশ সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেয়।

কিন্ত সত্যি কি বিমা থাকলে হাসপাতালে ভর্তি হলে মানুষ বিনা খরচায় চিকিৎসা পান?

সরকারি বিমার অভিজ্ঞতা কিন্তু খুব সুখের নয়। ‘ভাল’ চিকিৎসা পাওয়ার আশায় বহু গরিব মানুষ ছুটেছেন বেসরকারি হাসপাতালে। বিনা খরচায় চিকিৎসা পাওয়া তো দূর, বহু মানুষকেই গাঁটের কড়ি খসাতে হচ্ছে বেশ খানিকটা। হাসপাতালে যাচ্ছেন এমন একশো জনের মধ্যে মাত্র তিন জন চিকিৎসা পাচ্ছেন বিনা পয়সায়। মানুষের অজ্ঞানতার সুযোগ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা করিয়ে পয়সা কামাচ্ছে বেশ কিছু বেসরকারি হাসপাতাল। অল্পবয়সী মেয়েদের হিস্টারেক্টমি করানোর খবর তো হামেশাই বেরোচ্ছে খবরের কাগজগুলোতে।

সরকারি পয়সায় মুনাফা কামানোর আশায় গত দশ বছরে হু হু করে বেড়েছে বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা, বিশেষ করে ছোট-বড় শহরে। স্বাস্থ্য ব্যবসায় আগ্রহ দেখাচ্ছে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও হেজফান্ডগুলো। বড় বড় কর্পোরেট হাসপাতাল চেনগুলো গিলে খাচ্ছে ছোট ছোট ডাক্তার পরিচালনাধীন নার্সিংহোমগুলোকে।

আরও পড়ুন: আয়কর রিটার্নে দেরি হলে ছাড়ও নয়

ফলে বদলাচ্ছে ব্যবসার অভিমুখ— মুনাফা, খুব বেশি হারে মুনাফাই হয়ে উঠেছে শেষ কথা। এন এইচ পি ২০১৭-তে স্বাস্থ্যে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের উপর জোর দিতে বলা হয়েছে, সরকারকে এমন ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে যাতে, বিনিয়োগকারীর লগ্নি থেকে লাভ সুনিশ্চিত হয়।

কিন্তু মুনাফা করা এমন কি খারাপ? সব ব্যবসায় মুনাফা হলে স্বাস্থ্যে নয় কেন?

আসলে অসুস্থ হলে আমরা নেহাতই অসহায় হয়ে পড়ি। ডাক্তারদের উপর ভরসা করা ছাড়া উপায় থাকে না। আমরা বুঝি না আমাদের কী দরকার। ডাক্তাররাই হয়ে ওঠেন আমাদের ‘মাই বাপ’। বিত্তপুঁজির মুনাফার চাপ কিন্তু বাধ্য করছে ডাক্তারদের নীতিনিষ্ঠ চিকিৎসা থেকে সরে এসে, অপ্রয়োজনীয়, দামী পরীক্ষা, অপারেশন বা ওষুধ প্রেসক্রাইব করতে। ফলে হয়রান হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

এ সব ঠেকাতে যে ধরনের নজরদারি ব্যবস্থা দরকার তা তৈরি হয়নি। সে রকম জোরও দেওয়া হয়নি। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নতুন ক্লিনিক্যাল এস্ট্যাব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট একটা সঠিক পদক্ষেপ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলে, শুধু আইনের উপর ভরসা করে লাগামছাড়া মুনাফার উপর রাশ টানা যায় না। দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছার।

এ ব্যাপারে আমেরিকার উদাহরণ খুব প্রাসঙ্গিক। সে দেশে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলে বেসরকারি স্বাস্থ্যবিমা আর বেসরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে, সরকারি তহবিল আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির পয়সায়। এই ব্যবস্থা চালাতে জাতীয় আয়ের প্রায় দশ ভাগের এক ভাগ খরচ হয় সরকারের। এর প্রায় ৩০% চলে যায় রেগুলেশন আর পরিচালনায়। তবু বহু মানুষ এখনও বিমার আওতার বাইরে। এ দিকে সরকারি খরচ বেড়ে চলেছে লাগামছাড়া হারে। এর বড় কারণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা চলে গেছে গোনাগুনতি ‘হেল্থ মেনটেন্যান্স অর্গানাইজেশন’-এর (এইচএমও) হাতে, যারা নিজেদের একচেটিয়া ক্ষমতা ব্যবহার করে দাম বাড়িয়ে চলে। এ দিকে বিমা কোম্পানিগুলো নানা ছুতোয় রোগীদের বঞ্চিত করে প্রাপ্য থেকে। চিন্তার বিষয়, স্ট্র্যাটেজিক ক্রয় নীতি আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে সে দিকেই ঠেলে দেবে।

কিন্তু এর বিকল্প কী?

বিকল্প একটাই, সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ভাল করা, শুধু প্রাথমিক না, উচ্চস্তরেও। যাতে ‘ভাল মানের’ স্বাস্থ্যসেবা পেতে শুধু বেসরকারি হাসপাতালের দ্বারস্থ হতে না হয়। বহু দেশেই সরকারি পরিষেবা মানুষের মূল ভরসা। তাইল্যান্ড বা আমাদের ঘরের তামিলনাড়ু সরকারি ব্যবস্থা আগে ঢেলে সাজিয়ে তবে স্ট্র্যাটেজিক ক্রয়ের পথ নিয়েছে। যেহেতু তাইল্যান্ডে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ভাল, মানুষ ভরসা রাখে সরকারি হাসপাতালের উপর, বাজারে টিকে থাকতে বেসরকারি হাসপাতালগুলো বাধ্য হচ্ছে দাম কমাতে।

১.৫ লক্ষ কোটি টাকা প্রতি বছর বিমার পিছনে খরচ না করে, এই টাকায় সরকারি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজা যায়, ভাল মানের চিকিৎসা দেওয়া যায়, সব ওষুধ ঠিকমতো দেওয়া যায়। এটা হবে সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি ইনভেস্টমেন্ট।

এর জন্য দরকার ছিল জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনকে (এনএইচএম) আরও জোরদার করে, কেন্দ্র ও রাজ্য বাজেটে স্বাস্থ্যের বরাদ্দ বাড়িয়ে, পরিকল্পনামাফিক চলা। এনএইচএম-এর বাজেট তো বাড়েইনি, বরং গত বারের থেকে কমে গেছে প্রায় ৭৭০ কোটি। ফলে ক্রমশ খারাপ হবে সরকারি পরিষেবার মান।

এ সব দেখে মনে হচ্ছে, স্বাস্থ্যের আশ্বাসের পিছনে কোথাও রয়েছে মুনাফার জল ছবি!

(লেখক ও পি জিন্দাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক)

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.