তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে এম কে স্ট্যালিনকে ব্রিটেনের রাজা চার্লসের সঙ্গে তুলনা করা হয়। তিয়াত্তর বছর বয়স পর্যন্ত যুবরাজ হিসেবে অপেক্ষার পরে রাজা হয়েছিলেন চার্লস। স্ট্যালিন ডিএমকে-র কান্ডারি হয়েছেন, যখন তাঁর বয়স ৬৫ বছর। তিন বছর পরে যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হলেন, তখন তিনি আটষট্টি।
তিয়াত্তর বছর বয়সে এম কে স্ট্যালিনের সামনে তামিলনাড়ুর সিংহাসন ধরে রাখার লড়াই।
আগামী ২৩ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণের দিন তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনেও ভোটগ্রহণ। ফারাক হল, তামিলনাড়ু বিধানসভার ২৩৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই ২৩ এপ্রিল, এক দফায় ভোটগ্রহণ।
তামিলনাড়ুর ভোট বহু দিন ধরেই দ্বিমুখী লড়াই। ডিএমকে বনাম এডিএমকে। এ বার তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে রূপোলি পর্দার মহাতারকা বিজয়ের দল টিভিকে। দুই শিবিরই মনে করছে, বিজয় তাঁর ‘পরিবর্তন’-এর বার্তা দিয়ে তরুণ প্রজন্মের ভোট ঝুলিতে টানবেন। কিন্তু ডিএমকে-র নেতৃত্বে কংগ্রেস-বামেদের জোট না কি এডিএমকে-বিজেপির জোট— কার ভোট বেশি কাটবেন? সেটাই তামিলভূমের নির্বাচনে প্রশ্ন।
চেন্নাইয়ের পেরাম্বুর আসন থেকে ভোটে লড়ছেন ‘সুপারস্টার’ বিজয়। আসল নাম সি জোসেফ বিজয়। ডিএমকে নেতাদের ‘গ্রাউন্ড রিপোর্ট’ বলছে, অনেক পরিবারেই কমবয়সি ছেলেমেয়েরা বাড়ির বয়স্কদের বিজয়কে ভোট দিতে বলছেন। বিজয় বহু সিনেমায় ‘রাগী বিপ্লবী যুবক’-এর চরিত্রে অভিনয় করে এসেছেন। তাঁর সেলুলয়েডের ভাবমূর্তি প্রথমবারের ভোটার, শহরের তরুণদের সঙ্গে মহিলা ভোটব্যাঙ্ক এবং বছরের পর বছর ডিএমকে বা এডিএমকে-কে ভোট দিয়ে ক্লান্ত মানুষকে আকৃষ্ট করছে। তরুণদের হাতে হাতে ঘুরছে বিজয়ের দলের নির্বাচনীপ্রতীক— হুইসল।
মহিলা ভোট টানতে স্ট্যালিন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মহিলা ভাতা চালু করেছিলেন। ভোটের মুখে তাঁর প্রতিশ্রুতি, ক্ষমতায় ফিরলে মহিলাদের জন্য ৮ হাজার টাকা নগদ উপহার থাকবে। পাল্টা জবাবে এডিএমকে মহিলাদের জন্য ১০ হাজার টাকা উপহারের ঘোষণা করেছে। মহিলাদের জন্য বিজয়ের প্রতিশ্রুতি, মাসে ২,৫০০ টাকার ভাতা। বিজয়ের চিন্তা হল, তামিলনাড়ুর প্রবীণ মানুষের অনেকেই এখনও ডিএমকে বা এডিএমকে-র উপরেই ভরসা রাখতে চান। তাঁদের মতে, বিজয় ‘পরিবর্তন’-এর কথা বলছেন ঠিকই। তবে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা বাপরিপক্কতা হয়নি।
তিয়াত্তরের স্ট্যালিন এইখানেই এগিয়ে। তিনি ডিএমকে-র প্রধান বা মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসার আগেই ঝানু রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। ডিএমকে নেতাদের মতে, স্ট্যালিনের সরকারের বিরুদ্ধে জনমানসে তেমন কোনও অসন্তোষ তৈরি হয়নি। ডিএমকে সাংগঠনিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে। স্ট্যালিন-সরকারের বিভিন্ন জনমুখী প্রকল্প ভোটব্যাঙ্ককে আরও মজবুত করেছে। বিজয়ের বিপরীতে দলের তরুণ মুখ হিসেবে স্ট্যালিন তাঁর ছেলে উদয়নিধিকে তুলে ধরছেন।
উল্টো দিকে, এডিএমকে-তে জয়ললিতার মৃত্যুর পরে ভাঙন ধরেছিল। বর্তমান এডিএমকে-প্রধান ই পলানীস্বামীর জয়ললিতার মতো ক্যারিশ্মা বা সাংগঠনিক ক্ষমতা নেই। মূলত পশ্চিম তামিলনাড়ুতে এডিএমকে নিজের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখতে পেরেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রেক্ষিতে তৃতীয় শক্তি হিসেবে উঠে এসে বিজয় প্রথমবার নির্বাচনের ময়দানেই ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ভোট পেতে পারেন। কিন্তু গোটা রাজ্যে বিজয় সমান ভাবে ভোট পাবেন না। তাঁর দলের সাংগঠনিক শক্তিও সীমিত। তাই আসনের হিসেবে হয়তো বিজয়ের দল খুব বেশি হলে গোটা পনেরো আসন পেতে পারে। ডিএমকে শরিক কংগ্রেসের নেতাদের বক্তব্য, বিজয়ের দল ডিএমকে এবং এডিএমকে, দুই দলের ভোটব্যাঙ্কেই ভাগ বসাবে। তবে এডিএমকে-র ঝুলি থেকে বিজয় বেশি ভোট কাটবেন। কারণ এডিএমকে-শিবিরে স্ট্যালিন বা তাঁর ছেলে উদয়নিধির মতো জনপ্রিয় মুখের অভাব। নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ দিল্লি থেকে তামিলনাড়ুতে গিয়ে প্রচার করে সেই অভাব পূরণ করতে পারবেন না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)