জোটের জল্পনা থেকে বেরিয়ে পশ্চিমবঙ্গে এ বার বিধানসভা নির্বাচনে একা লড়তে চেয়েছে কংগ্রেস। একই সময়ে কেরলে বিধানসভা ভোটের জন্য নানা ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তারা। কংগ্রেস সূত্রের খবর, দক্ষিণী ওই রাজ্যে এ বার ক্ষমতায় ফেরার বিষয়ে প্রবল আশাবাদী দল। সেখানে বিজেপির সাম্প্রতিক বাড়-বাড়ন্ত এ বার পশ্চিমবঙ্গে বামেদের হাত ছাড়ার সিদ্ধান্তের নেপথ্যে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এই দুই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন বহু দিন ধরেই একই সময়ে হয়ে আসছে। কেরলে যখন সিপিএমের নেতৃত্বাধীন এলডিএফের সঙ্গে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউডিএফের সম্মুখ সমর, তখন পশ্চিমবঙ্গে বাম ও কংগ্রেস সমঝোতা করে লড়ছে— এমন ঘটনা গত দু’বার বিধানসভা নির্বাচনেই পড়েছে। এক রাজ্যের সিদ্ধান্তে অন্য রাজ্যে প্রভাব পড়ার অঙ্ক তখন কযা হয়নি। এ বার তা হলে ভিন্ন ভাবনা কেন? কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির এক সদস্যের কথায়, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে বামেদের সঙ্গে সমঝোতা করতে এমনিতে রাহুল গান্ধী অনাগ্রহী ছিলেন, বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু কেরলে এ বার পরিস্থিতি ভিন্ন। সেখানে বিজেপির শক্তি বেড়েছে। বাংলায় বামেদের সঙ্গে বোঝাপড়া থাকলে কেরলে সিপিএমের সঙ্গে কংগ্রেসের লড়াইকে ‘লোক দেখানো’ বলে বিজেপি প্রচার করবে এবং তাতে তাদের ফায়দা হতে পারে আশঙ্কা থাকছে। তাই কৌশলগত কারণে বাংলায় কংগ্রেসের একা চলা উচিত বলে মনে হচ্ছে এআইসিসি নেতৃত্বের।’’
তবে একই সঙ্গে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতাদের একাংশ বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি কোনও দলের সঙ্গে জোটের জন্য সওয়াল করতেন, তা হলে এর পরেও হয়তো ভেবে দেখা হত। কিন্তু দিল্লিতে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুলের সামনে এ রাজ্যের কংগ্রেস নেতারা জোরালো ভাবে রাজ্যের সব আসনে লড়ার পক্ষেই মত দিয়েছেন। রাজ্যে দলের সংগঠনকে চাঙ্গা করার লক্ষ্যই তাঁরা সামনে রেখেছেন। রাজ্য নেতাদের ওই মতকে অগ্রাহ্য করছে না এআইসিসি।
কেরলে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ত্রিশূর আসনে জয়ী হয়েছে। সদ্য তিরুঅনন্তপুরমের পুর-নিগমে প্রথম বার এনডিএ-র মেয়র হয়েছে। বিধানসভা নির্বাচনে তারা এ বার বাড়তি তাগিদ নিয়ে ঝাঁপিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কেরলে গিয়ে ২০% ভোট পাওয়ার লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন। বিজেপির এই তৎপরতা ও বেড়ে চলা ‘প্রভাব’কে সমীহ করছে কংগ্রেস। বিশেষত, সে রাজ্য থেকে সাংসদ এবং এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) এবং পর্যবেক্ষক দীপা দাশমুন্সি বিজেপিতে ‘হাতিয়ার’ না দেওয়ার যুক্তি দলের কাছে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বাম বা অন্য কারও সঙ্গে সমঝোতা করে কয়েকটি আসন বড় জোর কংগ্রেসের ঘরে আসতে পারে। কিন্তু তার জন্য কেরলে সরকার গড়ার সম্ভাবনা জলে দেওয়া উচিত হবে না! প্রসঙ্গত, সে রাজ্যে দলের সরকার হলে বেণুগোপাল মুখ্যমন্ত্রী পদের প্রত্যাশী বলে কেরলের কংগ্রেস সূত্রের খবর।
তবে কংগ্রেসেরই একাংশের প্রশ্ন, আরব সাগর পাড়ের কেরল থেকে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী পশ্চিমবঙ্গ অনেক দূরে। কেরলের পাশের তামিলনাড়ুতে ডিএমকে-র জোটসঙ্গী কংগ্রেস এবং সিপিএম-সিপিআই। পূর্বের বাংলায় সমঝোতার হাওয়া যদি কেরলে বিজেপির পালে গতি আনে, তামিলনাড়ুর রাজনৈতিক সমীকরণের প্রভাব সেটা করবে না? কংগ্রেসের ওই অংশ আবার কেরল সংক্রান্ত তত্ত্বের পিছনে দলের ভোট-কুশলী সুনীল কানুগোলুর ভূমিকা দেখছেন।
সূত্রের খবর, কানুগোলুর উপদেশ মেনেই কান্নুরের পি সুধাকরন, কোঝিকোঢ়ের এম কে রাঘবন এবং আট্টিঙ্গলের আদুর প্রকাশ— কংগ্রেসের এই তিন সাংসদকে কেরলে বিধানসভা ভোটে প্রার্থী করার প্রস্তাবে এআইসিসি সায় দিয়েছে। এঁরা বিধায়ক হলে লোকসভার সংশ্লিষ্ট উপনির্বাচনে কী করণীয়, তা-ও ছকে রাখা হচ্ছে। এই তালিকায় নাম না-থাকলেও তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কাসারগোড়ে গিয়ে কংগ্রেসের ‘পুতুযুগা (নবযুগ) যাত্রা’র সূচনা করে পিনারাই বিজয়নের সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন বেণুগোপাল।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)