×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১১ মে ২০২১ ই-পেপার

দেশ

নিজের হাতে অন্যের বর্জ্য বয়ে পড়াশোনার খরচ জোগাড়, ‘অস্পৃশ্য’ দলিতকন্যা আজ সংস্কৃতের অধ্যাপিকা

নিজস্ব প্রতিবেদন
৩০ ডিসেম্বর ২০২০ ১৩:৩১
হোম সায়েন্স, সঙ্গীত এবং সংস্কৃত। অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে তিনটি অপশন। সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীটি বেছে নিয়েছিল দেবভাষাই। যে হাত মানুষের বর্জ্য পরিষ্কার করত, সেই হাতই তুলে নিয়েছিল কালিদাস, ভাস, ভবভূতির লেখা অমর সাহিত্য। হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রামের সেই দলিতকন্যা জানতে চেয়েছিল দেবভাষার কোন বইয়ে লেখা আছে হরিজনদের সমাজের সব ক্ষেত্রে অস্পৃশ্য করে রাখতে?

হরিয়ানার কৈথল জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম রাজৌন্দ। রাজপুত অধ্যুষিত গ্রামের এক প্রান্তে বসবাস বাল্মীকি সম্প্রদায়ের কয়েক ঘর মানুষের। সামাজিক অবস্থানে তাঁরা হরিজনদের মধ্যেও সবথেকে ‘নিচু স্তরে’। উচ্চবর্ণের কাছে অস্পৃশ্য এ রকমই এক নুন আনতে পান্তা ফুরনো সংসারে আটের দশকের গোড়ায় জন্ম কৌশল পানওয়ারের।
Advertisement
কৌশলের দিনমজুর বাবা মায়ের কোনওদিন অক্ষরপরিচয় হয়নি। যখন যেখানে যা কাজ পেতেন, সেটাই করতেন তাঁরা। কিন্তু জয়রাম চাননি তাঁর সন্তানদেরও ভবিষ্যৎ এই একই খাতে বয়ে যাক। মেয়ে কৌশলকে তিনি বুঝিয়েছিলেন, তাঁদের কাছে জীবনে লড়াই করার একমাত্র হাতিয়ার হল শিক্ষা। বাবার কথাগুলিকেই আপ্তবাক্য করে নিয়েছিলেন কৌশল।

ছোট থেকেই বাবাকে ‘চাচা’ বলতেন কৌশল। আজ তিনি সংস্কৃত ভাষা ও সাহিত্যের নামী অধ্যাপক। ‘চাচা’-র কথাগুলো এখনও তাঁর সঙ্গী। দু’হাতে আবর্জনা কুড়িয়ে রুটি আর চিনি মেশানো জলের সংস্থান করার দিনগুলি থেকে এই উত্তরণ ছিল রক্তাক্ত ও ক্ষতবিক্ষত। সেই নিকষ স্মৃতি নিয়ে কৌশল এসেছিলেন আমির খানের ‘সত্যমেব জয়তে’ অনুষ্ঠানে। দেশবাসী শুনেছিল তাঁর সংগ্রামপর্ব।
Advertisement
দু’বেলা খাবার না জুটলেও স্কুলে কিন্তু নিয়মিত যেতেন কৌশল। তাঁর বাবার নির্দেশ ছিল, অনাহারে থাকলেও পড়াশোনা বন্ধ করা চলবে না। দলিত ছাত্রী হিসেবে স্কুল থেকে ইউনিফর্মের কাপড় পেতেন কৌশল। সেই উর্দির রং ছিল ফিকে নীল। বাকি ছাত্রীরা পরতেন সাদা রঙের সালোয়ার কামিজ। হরিজন সম্প্রদায়কে আলাদা করে চিহ্নিত করার জন্যই ছিল এই ব্যবস্থা।

ছোট থেকেই এই বৈষম্য কুরে কুরে খেত কৌশলকে। ক্লাসঘরের কোণায় কুঁজোভর্তি জল রাখা থাকত। কিন্তু কৌশলের মতো দলিত ছাত্রীদের অধিকার ছিল না সেখান থেকে সরাসরি জলপান করার। তাহলে জল ‘নোংরা’ হয়ে যাবে। তাই অন্য কেউ দিলে, আঁজলা ভরে জলপান করতেন তাঁরা।

শুধু জলপানই নয়। স্নানের জলও নাকি দলিতস্পর্শে পতিত হয়ে যায়। সে কথাও জেনেছিলেন কৌশল। খুব ছোটবেলাতেই। গ্রামের এক ডোবায় স্নান করানো হত গবাদি পশুদের। গরমের দুপুরে সেই ডোবাতেই বন্ধুদের সঙ্গে স্নান করতেন কৌশল। একদিন তাঁরই বয়সি উচ্চবর্ণের কয়েকজনের মুখে শুনতে হয়েছিল, তাঁদের স্পর্শে নোংরা হয়ে গিয়েছে ওই ডোবার জল!

উত্তরে কৌশল বলেছিলেন, ওই ডোবাটা তাঁদেরই থাক। উচ্চবর্ণের লোকজন যেন অন্য পুকুর খুঁজে নেন। এ রকম সপাট উত্তর তিনি দিয়ে এসেছেন জীবনভর। স্কুলের শিক্ষককে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তাঁদেরও কেন সাদা পোশাক দেওয়া হয় না? জীবনের শুরুতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন ওই আলাদা রঙের উর্দিই বৈষম্যের প্রতীক।

এই বৈষম্যের বীজ কোথায়? সেটা জানতেই শিক্ষাকে অবলম্বন করেছেন কৌশল। চল্লিশ বসন্ত পার করেও তাঁর স্পষ্ট মনে পড়ে ছোটবেলার তিক্ত স্মৃতি। বাড়িতে খাবার থাকত না। পড়শিদের বাড়ি থেকে লস্যি চাইতে যেতেন তিনি। কিন্তু উচ্চবর্ণের বাড়িতে কাউকে ছোঁয়ার অধিকার ছিল না।

তিনি মেঝেতে ঘটি রেখে দূরে দাঁড়াতেন। উপর থেকে আলগোছে ঢেলে দেওয়া হত লস্যি। ঘটিতে পড়ার থেকে লস্যি ছিটে বেশি পড়ত স্কুলের পোশাকে। গন্ধময় সেই পোশাক ঘিরে মাছি ভনভন করত। কৌশলের উপলব্ধি, সমাজ চায় না দলিতরা সাফসুতরো থাকুক। তাঁদের গা থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধই বোধহয় তাঁদের আলাদা পরিচয়।

অনটনের সংসারে খাবার ছিল অনিয়মিত। ভাল খাবারের স্বাদ তো দূর অস্ত্। স্কুল থেকে ফিরে কৌশলের জন্য বরাদ্দ থাকত শুকনো রুটি। ঘটির জলে ভাল করে তিনি মিশিয়ে সেই জলে নরম করে নিতেন রুটি। তার পর সেটাই চিবোতেন মহাতৃপ্তিতে। চরম দুঃখেও ভাল থাকার মন্ত্র শিখেছিলেন বাবার কাছ থেকে।

বইপত্র ফেলে কৌশলকেও যেতে হত উপার্জনের তাগিদে। মজুরির সঙ্গে কাজ করার আরও একটা আকর্ষণ ছিল। কাজের শেষে রুটি পাওয়া যেত। সঙ্গে খাকত তরকারি। রোজ চিনিজলে ভেজানো রুটি খাওয়ার মুখে সেই খাবার ছিল অমৃত। এক দিন গ্রামের এক উচ্চবর্ণের বাড়িতে কাজে গেলেন কৌশল। গিয়ে আবিষ্কার করলেন সেই বাড়ির মেয়ে তাঁরই সহপাঠী!

বন্ধুর বাড়িতে শৌচাগার পরিষ্কার করার কাজ করতে গিয়ে লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়েছিলেন কৌশল। লজ্জার সঙ্গে মনের ঘেন্নাও লুকিয়ে রেখে নিঃশব্দে কাজ করেছিলেন জেঠিমার সঙ্গে। বন্ধুর বাড়ির শৌচাগার সংলগ্ন ট্যাঙ্ক থেকে তাঁদের বর্জ্য বালতিতে তুলে ফেলে আসতে হয়েছিল দূরে। কৌশল জানতেন পরের দিন স্কুলে যাওয়ার পরে তাঁর লাঞ্ছনা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে।

হয়েছিলও তাই। সেই বন্ধু ক্লাসের সকলকে বলে দিয়েছিল, কৌশল তাঁদের বাড়িতে শৌচাগার সাফ করতে গিয়েছিলেন। সকলের কাছে চরম উপহাসের শিকার হন কিশোরী কৌশল। রাগের চোটে সহপাঠীর গায়ে হাত তুলেছিলেন। পাল্টা আঘাত এসেছিল অন্য দিক থেকেও। এখনও সেই দাগ রয়েছে কৌশলের বাঁ ভুরুর উপরে।

পরে তাঁর বাড়িতে এসে শাসিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধুর অভিভাবকরা। তাঁদের কাছে সেই সময় ক্ষমা চাইলেও আড়ালে মেয়েকেই সমর্থন করেছিলেন কৌশলের বাবা জয়রাম। বাবার কাছ থেকে এই নৈতিক ও মানসিক সমর্থন জীবনভর পেয়ে এসেছেন কৌশল। সেই সাহসে ভর করেই সংস্কৃত বিষয়কে আপন করে নিয়েছিলেন তিনি।

যদিও তীব্র আক্রমণ এসেছিল শিক্ষকের তরফে। ব্রাহ্মণ পরিবারের সেই পণ্ডিত বলেছিলেন, ‘‘ক’দিন পরে যখন আমাদের কারও বাড়িতে পরিচারিকার কাজ করতে হবে, তখন সংস্কৃত পড়ে কী করবি?’’ শুনেই রোখ চেপে গিয়েছিল কৌশলের। তাঁকে যে কাজে বাধা দেওয়া হয়স সেটাই করার জন্য একবগ্গা হয়ে পড়েন তিনি।

সেই জেদে ভর করেই গ্রামের সরকারি স্কুলের পরে কৌশলের গন্তব্য হয় বাড়ি থেকে ৬০ কিমি দূরত্বের ইন্দিরা গাঁধী মহিলা মহাবিদ্যালয়। তার পর স্নাতকোত্তর কুরুক্ষেত্র বিশ্ববিদ্যালয়, রোহতকের মহর্ষি দয়ানন্দ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমফিল এবং শেষ পর্যন্ত দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পূর্ণ করেন তিনি।

কলেজে পড়ার সময়েও লেখাপড়ার পাশাপাশি উপার্জন করতেন কৌশল। বাকি জনমজুরদের সঙ্গে হাত লাগিয়ে রাস্তা সারাইয়ের কাজ করতেন। সে জন্য কিছু দিন যেতে পারতেন না কলেজের ক্লাসে। মনে পড়ে, কিছু বান্ধবী ইচ্ছে করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাজে ব্যস্ত কৌশলের কাছে জানতে চাইতেন, ‘‘রাস্তা মেরামতিতে ব্যস্ত থাকার জন্যই কি তিনি কলেজে যেতে পারছেন না?’’

কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যের প্রান্তে দাঁড়িয়ে তখন অবশ্য কৌশলের গায়ে এই অপমান অতটা বিঁধত না। তার ফলেই তিনি স্নাতকোত্তরে পড়ার সময় শৌচাগার সাফ করার কাজ করতে পেরেছিলেন। সে সময় থাকতেন দিদিমার বাড়িতে। দু’জনে মিলে হাতে হাত লাগিয়ে সেই কাজ করতেন।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন মতিলাল নেহরু কলেজের অধ্যাপিকা কৌশলের আক্ষেপ, শুধু হরিয়ানার গ্রামেই নয়। অস্পৃশ্যতা এবং জাতিভেদের ভূত চেপে বসে আছে জেএনইউ-তেও। সেখানে হস্টেলে তাঁর রুমমেট ছিলেন ব্রাহ্মণ পরিবারের। তিনি চরম মানসিক নির্যাতন করতেন যাতে কৌশল হস্টেল ছেড়ে চলে যান। অভিযোগ কৌশলের।

কিন্তু কৌশলও দাঁতে দাঁত চেপে হস্টেলে থেকেই পড়াশোনা করে গিয়েছেন। শেষ অবধি তাঁকে হস্টেলছাড়া করতে না পেরে তাঁর রুমমেটই ঘর ছেড়ে চলে যান। যাওয়ার আগে নাকি বলে গিয়েছিলেন, ‘‘একজন ধাঙড়ের সঙ্গে থাকার চেয়ে হস্টেল ছেড়ে দেওয়া ভাল।’’

এখানেই শেষ নয়। অভিযোগ, সহপাঠীরা নাকি দাবি করেছিলেন, কৌশল যে বেঞ্চে বসে ক্লাস করতেন, সেটা যজ্ঞ করে শোধন করতে হবে! দিনের পর দিন এই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কৌশল ঠিক করেছিলেন তিনি জেএনইউ ছেড়ে দেবেন। কিন্তু পারেননি শুধু বাবার মুখটা মনে রেখেই।

তাঁর অক্ষরজ্ঞানহীন বাবা বলেছিলেন, জীবনের যে ঝড়ই আসুক না কেন, কৌশল যেন মাথা নত না করেন। সেটাই কৌশলের জীবনের মূলমন্ত্র। কিন্তু তাঁর আক্ষেপ, জাতপাতের অস্পৃশ্যতা এখনও বসে আছে সমাজের শিকড়ে।

অধ্যাপনা করার সময় দিল্লিতে প্রথমে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন কৌশল। তিনি একদিন নির্ধারিত সময়ের আগে কলেজ থেকে বাড়িতে ফিরে দেখেন তাঁর মা বাড়িওয়ালির উঠোন ঝাঁট দিচ্ছেন! কৌশল জানতে পারেন তাঁকে বাড়ির মালকিন এই কাজ করতে বলেছেন। প্রতিবাদ করতে গিয়ে কৌশল শোনেন, তাঁর মাকে এই টুকু কাজ করতেই হবে! নইলে ঘর ছাড়তে হবে।

পরের দিনই ভাড়া মিটিয়ে ওই বাড়ি ছেড়ে দেন কৌশল। কিন্তু এর পরেও দিল্লির বিভিন্ন অংশে তাঁদের এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁকে। অভিযোগ অধ্যাপিকা কৌশলের। যত দিন না নিজের ফ্ল্যাটে এসেছেন, তত দিন এই যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। ‘সত্যমেব জয়তে’-এর মঞ্চে আমির খানের সামনে বসে নিজের জীবনযন্ত্রণার কথা উগড়ে দিয়েছেন কৌশল।

তিক্ততার ওঠানামা পেরিয়ে কৌশলের উপলব্ধি, পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক শিক্ষা না দিলে মানুষের তৈরি জাতপাত ও অস্পৃশ্যতার এই সমস্যা থেকেই যাবে। নির্ধারিত পাঠক্রমের বাইরে সেই চেতনার বীজ বপন করার কাজেও ব্রতী হয়েছেন কৌশল পানওয়ার।