Advertisement
E-Paper

মোবাইলের জন্য তিন সহোদরার মরণঝাঁপ: এ দেশে মুদিখানার জিনিস ১০ মিনিটে পৌঁছোয়, ১ ঘণ্টা লেগে যায় অ্যাম্বুল্যান্স আসতে!

মঙ্গলবার রাতে গাজ়িয়াবাদে একটি আবাসনের ১০তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তিন নাবালিকার। সম্পর্কে তারা তিন বোন। বড় বোনের নাম বিশাখা, মেজো প্রাচী এবং ছোট পাখি। তাদের বয়স যথাক্রমে ১৬, ১৪ এবং ১২ বছর।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৮:০৮
Ghaziabad Sisters Death

গাজ়িয়াবাদের আবাসনে তিন বোনের আত্মহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী অরুণ সিংহ। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

১০তলার বারান্দা থেকে কে যেন ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করছে! দূরের আবাসনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলেন যুবক। তিনি মোবাইল বার করে ফোন করেন স্ত্রীকে। তার কিছু ক্ষণের মধ্যে আরও দু’জন ১০তলার সেই বারান্দায় পৌঁছে যায়। তারা প্রথম জনকে টানাহেঁচড়া করায় দূরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে যুবক হাঁপ ছেড়েছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন, যাক, ‘যুবক’কে রক্ষা করেছেন বাড়ির লোকজন। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ওই তিন জনকেই তিনি একই বারান্দা থেকে নীচে পড়তে দেখে আঁতকে ওঠেন তিনি। পরে জানতে পারেন, তিনি যাঁদের স্বামী-স্ত্রী ভেবেছিলেন, তারা আদতে নাবালিকা এবং তিন সহোদরা। উত্তরপ্রদেশের গাজ়িয়াবাদে তিন কন্যার ‘আত্মহত্যা’র ওই প্রত্যক্ষদর্শীর দাবি, তিন জন একই সঙ্গে ঝাঁপ দেয়নি। প্রথমে এক বোন লাফ দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু তাকে ধরে ছিল অন্য দু’জন। পরে তিন জনই পড়ে যায় (কিংবা ঝাঁপ দেয়)। প্রত্যক্ষদর্শীর এ-ও দাবি, তিনিই অ্যাম্বুল্যান্স ডেকেছিলেন। কিন্তু গাজ়িয়াবাদের ওই আবাসনে অ্যাম্বুল্যান্স ঢোকে ঘটনার প্রায় এক ঘণ্টা পর।

মঙ্গলবার রাতে গাজ়িয়াবাদে একটি আবাসনের ১০তলা থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে তিন নাবালিকার। সম্পর্কে তারা তিন বোন। বড় বোনের নাম বিশাখা, মেজো প্রাচী এবং ছোট পাখি। তাদের বয়স যথাক্রমে ১৬, ১৪ এবং ১২ বছর। পরিবার এবং পুলিশ সূত্রে খবর, তিন বোনের মোবাইল গেমে তীব্র আসক্তি ছিল। তারা কোরিয়ান গেম খেলত। সর্বদা ফোনে বুঁদ হয়ে থাকা মেয়েদের যদি বাবা-মা শাসন করতেন, তারা সমস্বরে বলত, ‘‘এই গেম আমাদের জীবন!’’

গাজ়িয়াবাদের ভারত সিটির বাসিন্দা অরুণ সিংহ জানান, রাত ২টোর দিকে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একবার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। আলো-আঁধারিতে তিনি দেখতে পান কেউ একজন বারান্দা থেকে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছে। যুবকের কথায়, ‘‘আমি দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম বলে বুঝতে পারছিলাম না, উনি পুরুষ না মহিলা। কোনও বয়স্ক ব্যক্তি না নাবালক। আমি স্ত্রীকে ফোন করে বললাম, যে কেউ লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের কিছু করা উচিত। স্ত্রী ভেবেছিলেন, কারও দাম্পত্যকলহ।’’

অরুণ জানান, ফোনে কথা বলতে বলতে তিনি দেখতে পান, রেলিংয়ে বসে থাকা একজনকে টেনে নামানোর চেষ্টা করছেন আর একজন। প্রথম চেষ্টায় তিনি সফলও হন। প্রত্যক্ষদর্শীর কথা, ‘‘আমি ভেবেছিলাম ওঁরা কোনও দম্পতি। যিনি লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন, তিনি পুরুষ। এবং তাঁকে তাঁর স্ত্রী থামানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু কয়েক মিনিট পর তিনি আবার বারান্দার রেলিংয়ের ধারে উঠে গেলেন। আমি ফোন করে কাউকে তা বলার আগেই দেখলাম, রেলিংয়ের উপরে বসে থাকা ব্যক্তিকে আরও দু’জন নামানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু ওই ব্যক্তি নাছোড়। তিনি লাফ দেন। এর পর বাকি দু’জনও লাফ দেন।’’

পরে অরুণ জানতে পারেন, তিনি কোনও স্বামী-স্ত্রীকে দেখেননি। দেখেছিলেন, নাবালক তিন বোনকে। যুবক জানান, তিনি দ্রুত নীচতলায় গিয়ে পুলিশে খবর দেন। অ্যাম্বুল্যান্সও ডাকেন। কিন্তু তাঁর মতে, তাদের পৌঁছোতে ঘণ্টাখানেক লেগে যায়।

অরুণের দাবি, সময়মতো তিন নাবালিকাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো তারা বেঁচে যেত। আক্ষেপের সুরে তিনি বলেন, ‘‘যে দেশে পিৎজ়া, বার্গার এবং মুদিখানার জিনিসপত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া হয়, সেখানে অ্যাম্বুল্যান্স পৌঁছোতে এক ঘন্টা সময় লেগে যায়। এটা দুঃখজনক। কিন্তু কঠোর বাস্তব।’’

গাজ়িয়াবাদ-কাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী আরও জানিয়েছেন, তিনি অ্যাম্বুল্যান্সের জন্য ১০-১৫ বার ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রতি বার নানা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন করা হয়েছে।

মধ্যবয়স্ক চেতন কুমার জানান, বুধবার ভোরে ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে বারান্দা দিয়ে ঝাঁপ দেয় তাঁর তিন মেয়ে। কারণ, তাঁদের গেম-আসক্ত তিন মেয়ের কাছ থেকে মোবাইল ছাড়িয়ে নিয়েছিলেন তিনি। ঘরে একটি চিঠি পাওয়া গিয়েছে। যেটি সুইসাইড নোট বলে মনে করছে পুলিশ। কাঁচা হাতে লেখা, ‘‘ইস ডায়েরি মে জো কুছ ভি লিখা হ্যায় ওহ্ সব পড় লো। কিঁউকি ইয়ে সব সচ হ্যায় (এই ডায়েরিতে লেখা সবকিছু পড়ো। কারণ, এর সবই সত্যি)।’’ তাতে আরও লেখা, ‘‘আমি সত্যিই দুঃখিত। দুঃখিত, বাবা।’’ শেষে একটি কান্নার ইমোজি দেওয়া। পকেট ডায়েরিটির আট পাতা ধরে গেমিং এবং মোবাইল ব্যবহারের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। মনে করা হচ্ছে, নোটটি লিখেছে বড় বোন।

জানা গিয়েছে, তিন মেয়ের চিৎকার এবং তাদের মাটিতে পড়ার শব্দ এতটাই তীব্র ছিল যে বাবা-মা, প্রতিবেশী এবং আবাসনের নিরাপত্তারক্ষীদের ঘুম ভেঙে যায়। বিশাখা-প্রাচী-পাখির বাবা-মা দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকেন। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে!

Ghaziabad Deaths Uttar Pradesh
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy