দলত্যাগ বিরোধী আইন এড়াতে তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী’ সাংসদরা লোকসভার মধ্যেই আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি দাবি করার বদলে ত্রিপুরার ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-এর সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার পরেও কপিল সিব্বল, অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির মতো আইনজীবীরা মনে করছেন, এই সাংসদদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাওয়া উচিত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তথা রাজ্যসভার নির্দল সাংসদ কপিল সিব্বলের বক্তব্য, “এখনই এই সাংসদদের সদস্যপদ খারিজ করে দেওয়া উচিত। তৃণমূলের সংসদীয় দলের বিদ্রোহীরা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে যেতে পারেন না। এটা তখনই সম্ভব, যদি মূল রাজনৈতিক দল, অর্থাৎ তৃণমূল অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা একটা রসিকতা।”
প্রথমে ঠিক ছিল, তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদরা লোকসভার স্পিকারের কাছে নিজেদের আলাদা গোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি চেয়ে এনডিএ-কে সমর্থনের ইচ্ছে প্রকাশ করবেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আগেই চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিলেন, একটি সংসদীয় দল ভেঙে লোকসভায় নতুন কোনও ‘ব্লক’ বা গোষ্ঠী তৈরি হতে পারে না। এ জন্য তৃণমূল নেতৃত্ব সুপ্রিম কোর্টে মামলারও প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রবিবার বিজেপি নেতা তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে তৃণমূলের বিদ্রোহী সাংসদদের বৈঠকের পরে ঠিক হয়, তাঁরা এনসিপিআই-তে মিশে যাবেন। সেই অনুযায়ীই তাঁরা লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দিয়েছেন।
আয়ারাম-গয়ারাম রাজনীতি বা এক দলের টিকিটে জিতে এসে অন্য দলে চলে যাওয়া ঠেকাতে ১৯৮৫ সালে সংবিধানে ৫২তম সংশোধনীর মাধ্যমে দশম তফসিল তথা দলত্যাগ বিরোধী আইন যোগ করা হয়েছিল। আইনজীবী তথা কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ অভিষেক মনু সিঙ্ঘভির মতে, “দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় না পড়ার দু’টি শর্ত রয়েছে। এক, একটি রাজনৈতিক দল অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশতে পারে। দুই, একই সঙ্গে সংসদীয় দলের দুই-তৃতীয়াংশ সেই রাজনৈতিক দলে চলে যেতে পারে। এই শর্ত পালন না হলে এই সাংসদরা দলত্যাগ বিরোধী আইনে পড়ে যাবেন। লোকসভার স্পিকার পাঁচ মিনিটে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ করে দিতে পারেন।”
আইনজীবীদের এই যুক্তি শুনে অন্যতম বিদ্রোহী সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “আমি যা জানি, দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ একসঙ্গে থাকলে কোনও সমস্যা হতে পারে না। এর পরে ওঁরা প্রয়োজনে কোর্টে যেতে পারেন।” প্রবীণ আইনজীবী তথা মিজোরামের অ্যাডভোকেট জেনারেল বিশ্বজিৎ দেব বলেন, “কেউ যদি দল ছেড়ে যান বা দলের হুইপ অমান্য করেন, তা হলে দলত্যাগ বিরোধী আইনে কোনও সাংসদ, বিধায়কের সদস্যপদ খারিজ হতে পারে। ব্যতিক্রম হল, যদি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য দল ভেঙে অন্য দলে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দলত্যাগ আইনে স্পিকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। যদিও ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, স্পিকারের সিদ্ধান্তের সীমিত বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা হতে পারে।”
তৃণমূলের মমতাপন্থী রাজ্যসভার সাংসদ সাগরিকা ঘোষ রবিবারও যুক্তি দিয়েছেন, সংবিধানের দশম তফসিল বা দলত্যাগ বিরোধী আইন এ বিষয়ে খুব স্পষ্ট। যদি মূল দল অন্য কোনও দলে মিশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত না নেয়, তা হলে তাঁরা দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় পড়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে তাঁদের সাংসদ পদ খারিজ হয়ে যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)