দীর্ঘ অসুস্থতার পর ৯৪ বছর বয়সে দিল্লির এক হাসপাতালে শনিবার সকালে মারা গেলেন চিত্রশিল্পী সৈয়দ হায়দার রাজা। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে নিঃশব্দে এক যতিচিহ্ন পড়ল।
শিল্পরসিকেরা জানেন, এই যতিচিহ্ন পড়ছিল গত কয়েক বছর ধরেই। স্বাধীনতার প্রাক্কালে তৈরি হয়েছিল আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার অন্যতম পুরোধা ‘বোম্বে প্রোগ্রেসিভ আর্টিস্টস গ্রুপ’। সেই দলের মকবুল ফিদা হুসেন, তায়েব মেটা, ফ্রান্সিস নিউটন সুজা আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছেন। শনিবার চলে গেলেন রাজা। থেকে গেল তাঁর ক্যানভাসে ‘বিন্দু’, ‘প্রকৃতি-পুরুষ’, ‘কুণ্ডলিনী’ ইত্যাদি সিরিজে ফুটে ওঠা গতিময় বিমূর্ত চিত্রকলা। ‘সেই সব লেখক ও গায়কেরাই আমার প্রেরণা, যাঁরা কানে দেখেন, চোখে শোনেন’, এক বার বলেছিলেন রাজা। মনের অন্দরে হেঁটে ইন্দ্রিয়ের প্রথাসিদ্ধ জগৎকে উল্টেপাল্টে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। সেখানেই তাঁর ছবির আধুনিক তন্ত্রদর্শন। হাল আমলের হিন্দুত্বের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক ছিল না তাঁর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের দাঙ্গা দেখেছিলেন তিনি। মাঝে মাঝেই বলতেন, ঘৃণা, রক্ত ও বিচ্ছেদের বেদনা তাঁর বেড়ে ওঠার অংশ। সে কারণেই তাঁর প্রথম দিকের অনেক ছবিতে ছিল জনহীন ভুতুড়ে শহর, পাখিরাও সেখানে গান গায় না।
সেখান থেকে ক্রমে নিরন্তর এক পথ চলা। কখনও বড় ভাবে অ্যাক্রিলিকে ফুটে ওঠে এক বিন্দু, ধরা পড়ে ত্রিভুজের মায়াবী অনুষঙ্গ। ‘‘শিল্পকলা এক ধরনের ধ্যান। সে রঙের মাধ্যমে তোমাকে শান্ত, সমাহিত হতে শেখায়,’’
বলতেন রাজা।
এই শান্তায়ন ভারতীয় বীক্ষা ও ইউরোপীয় শিক্ষার মন্থনে তৈরি। মুম্বইয়ের জে জে স্কুল অব আর্টসের ছাত্র রাজা চল্লিশের দশকেই আধুনিক চিত্রকলায় ইউরোপীয় দর্শনের পাশাপাশি ভারতীয় অন্তর্জ্ঞানের খোঁজ করছিলেন। মুম্বইয়ের পাশাপাশি কলকাতাতেও গোপাল ঘোষের মতো শিল্পীরা তখন খুঁজছেন ভারতীয় আধুনিকতার অভিজ্ঞান। সেই খোঁজেই রাজা চলে গেলেন প্যারিস। ল্যান্ডস্কেপ আঁকায় আরও প্রাণিত হলেন। মধ্যপ্রদেশের ছেলে রাজার ততদিনে মা, বাবা দু’ জনেই মারা গিয়েছেন। জীবনসঙ্গিনীকেও খুঁজে পেলেন সেই ফ্রান্সে। জীবনের ছয়টি দশক ফ্রান্সেই কেটেছে তাঁর। ‘ফ্রান্স আমাকে আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল’— বলেছিলেন রাজা। দেশ তাঁকে ‘পদ্মবিভূষণ’ দিয়েছিল, পাশাপাশি ফ্রান্সও তাঁকে দিয়েছিল সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘লেজিয়ঁ দ্যনর’। ভারতীয় ছবির উত্থানে তিনি দিক নির্দেশক। কখনও তাঁর ছবি বিক্রি হয়েছে প্রায় ১৯ কোটি টাকায়, কখনও বা ১৮ কোটিতে। ছবির বাজারে রেকর্ড!
কিন্তু শিল্পীর শক্তিমত্তা তো অর্থনীতির কেজো হিসাবে নয়। কয়েক মাস আগেও বলেছিলেন, ‘শরীর ভাল থাকলে এখনও রং-তুলি নিয়ে বসি। রঙের দুনিয়ায় আজও অভিযান চালাতে ভাল লাগে।’’
বিশ্বসফর শেষে রঙের সেই অভিযাত্রার শেষ হল।