বাংলার ‘খেলা’ উত্তরপ্রদেশে নিয়ে গেলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সঙ্গেই সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবকে পরামর্শ দিলেন, বাংলার ‘মডেল’ অনুসরণ করে স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে মহিলা, অনগ্রসর শ্রেণি সকলের হাতে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’, ‘স্টুডেন্টস ক্রেডিট কার্ডে’র মতো কিছু না কিছু তুলে দেওয়ার প্রকল্প ঘোষণা করতে।
মঙ্গলবার এখানে সমাজবাদী পার্টি অফিসের মাঠে অখিলেশের সমর্থনে মমতা যখন ভার্চুয়াল সভা করছেন, তখনই কিছু দূরে বিজেপির রাজ্য দফতরে দলের ইস্তাহার প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। অখিলেশের মঞ্চ থেকে বিজেপির উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘ভোট চাওয়ার আগে বিজেপি ক্ষমা চাক।’’ তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘হাথরসের মা- বোনেদের কাছে ক্ষমা চেয়েছ? উন্নাওয়ের জন্য ক্ষমা চেয়েছ? কৃষক আন্দোলনে গাড়ি চাপা দিয়ে মারার জন্য, এনআরসি এবং দাঙ্গার জন্য ক্ষমা চেয়েছ?’’ তাঁর দাবি, ‘‘উত্তরপ্রদেশের মানুষ বিজেপিকে ক্ষমা করবে না। দেশের মানুষ তোমাদের ক্ষমা করবে না।’’ করোনা মোকাবিলায় যোগী সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ করে মমতা এ দিন বলেন, ‘‘আপনারা জলে আগুন জ্বেলেছেন। এখানকার মৃতদেহ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাপের শেষ নেই। সেগুলি ভেসে মালদহে গেলে আমরা সৎকারের ব্যবস্থা করেছি।’’
বাংলায় গত বিধানসভা নির্বাচনে শাহই ছিলেন বিজেপির সেনাপতি। কলকাতায় ইস্তাহারও প্রকাশ করেছিলেন তিনিই। ওই ভোটে মমতার ‘খেলা হবে’ স্লোগান রীতিমতো আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল। অদ্ভুত সমাপতনে এ দিন লখনউয়ে দাঁড়িয়ে অখিলেশের জন্য সেই স্লোগানকেই হাতিয়ার করেন তিনি।
উত্তরপ্রদেশে অখিলেশই যে বিজেপির বিরুদ্ধে একমাত্র মুখ, মমতা ইতিমধ্যে তা বলেছেন। মঙ্গলবার লখনউয়ে সমাজবাদী পার্টি সদর দফতর থেকে ভার্চুয়াল সভার মাধ্যমে তৃণমূলনেত্রী আরও এক বার তা উল্লেখ করে বলেন, ‘‘নতুন ভোরের আলো নিয়ে আসতে পারেন অখিলেশ। আমি চাই, ওঁকে এগিয়ে দিয়ে আমরা— সিনিয়র নেতারা পিছন থেকে সাহায্য করব। আমাকে এখানে ডেকে সকলকে একজোট হওয়ার সেই বার্তা দিলেন অখিলেশভাই। এখানে বিজেপির সঙ্গে মুখোমুখি লড়াই করে অখিলেশ জিতবে এবং নতুন ইতিহাস গড়বে।’’ সেই সঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘‘বিজেপি উত্তরপ্রদেশে হারলে দেশেও হারবে।’’ এর আগে মমতাকে স্বাগত জানিয়ে অখিলেশ বলেন, ‘‘দেশের ঐক্য, সংহতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দিদি। তিনি সাম্প্রদায়িক শক্তিকে হারানোর ক্ষমতা রাখেন। দিদি এখানে আসায় বিজেপির সঙ্কটের মেঘ আরও ঘন হল।’’ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে এখানে প্রচারে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন অখিলেশ। মমতাও মনে করেছেন, জাতীয় রাজনীতিতে নিজের অবস্থান ‘অর্থবহ’ করে তুলতে উত্তরপ্রদেশে আসার প্রয়োজন রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘দেশের মধ্যে বৃহত্তম এই রাজ্য ভাল থাকলে গোটা দেশ ভাল থাকবে।’’ তাঁর বক্তৃতায় এসেছে গান্ধী, নেতাজি, রবীন্দ্রনাথ থেকে উত্তরপ্রদেশের লালবাহাদুর শাস্ত্রী, চরণ সিংহ প্রমুখের নাম। বলেছেন, ‘‘এই রাজ্য থেকেই দেশ বার বার প্রধানমন্ত্রী পেয়েছে।’’ যদিও জওহরলাল, ইন্দিরা, রাজীবের নাম মমতা উল্লেখ করেননি।
দেশে বিজেপিকে হারাতে আঞ্চলিক দলগুলির জোট গড়ার কথা মমতা আগে বলেছেন। এ দিনও সেই ডাক দেন তিনি। কটাক্ষ করেন, ‘বসন্তের কোকিল’দের। তাঁর মন্তব্য, ‘‘জানেন তো, রাজনীতির এই কোকিলরা শুধু ভোটের সময় আসে। সারা বছর ঘরে বসে থাকে। কেউ দিল্লিতে, কেউ হায়দরাবাদে।’’ পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর লক্ষ্য এক দিকে যেমন কংগ্রেস, অন্য দিকে আসাদুদ্দিন ওয়েইসির ‘এমআইএম’-এর মতো দল।
প্রাক্ নির্বাচনী বিভিন্ন সমীক্ষায় উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পাল্লা ভারী বলে দেখানো হলেও মমতা তা মানতে নারাজ। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে বিজেপির শীর্ষনেতারা স্লোগান দিয়েছিলেন, ‘ইস বার ২০০ পার।’ সেই সুর টেনে মমতার পাল্টা স্লোগান, ‘‘ইস বার অখিলেশ ৩০০ পার।’’ সভা যেহেতু ভার্চুয়াল তাই সরাসরি উপস্থিতি খুব বেশি ছিল না। আমন্ত্রিত এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি মিলিয়ে ছিলেন কয়েকশো। বাংলায় তিনি যেমন করেছিলেন, তেমন করেই ভিড়ের উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘কি, খেলা হবে তো?’’ তারপর মঞ্চ থেকে একটি লাল ফুটবল ছুঁড়ে দেন ভিড় লক্ষ্য করে। পার্টি অফিসের বাইরে রাস্তায় তখন উচ্চকণ্ঠে স্লোগান শুরু হয়ে গিয়েছে, ‘খেলা হবে, খেলা হবে।’
মমতাকে কটাক্ষ করতে ছাড়েননি বঙ্গ বিজেপির নেতারা। বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, ‘‘এই রাজ্যের বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের এক জন উত্তরপ্রদেশের যাদব পরিবারকে সাহায্য করতে গিয়েছেন। দেশের আঞ্চলিক দলগুলি এক-একটি প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির মতো কাজ করছে। অখিলেশ যাদবের আমলে উত্তরপ্রদেশ দুষ্কৃতীদের স্বর্গরাজ্য ছিল। সেই উত্তরপ্রদেশ বর্তমানে যোগীজির শাসনে উত্তমপ্রদেশে পরিণত হয়েছে। সেই উত্তমপ্রদেশে এখন মুখ্যমন্ত্রী গিয়েছেন, যদি একটু অশান্ত করা যায় সেখানে।” ভোটের প্রচার করতে বাংলা থেকে গিয়ে যিনি 'গণতন্ত্রের পাঠ' দিচ্ছেন, তাঁর 'হাতে রক্ত' লেগে আছে বলে মন্তব্য বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর। বাংলায় ভোট-পরবর্তী হিংসার অভিযোগ ফের তুলে এনেছেন বিরোধী নেতা।
মমতাকে নিয়ে লখনউয়ে আগ্রহ লক্ষ্য করা গিয়েছিল সোমবার তিনি পৌঁছনোর সময় থেকেই। শহরের নানা জায়গায় তাঁর এবং অখিলেশের ছবি-সহ হোর্ডিংও দেখা গিয়েছে। এ দিন সকালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে হোটেলের গেটে জড়ো হন ব্রাহ্মণ সমাজের প্রতিনিধিরা। ছিল ঘণ্টার ধ্বনি, আর শঙ্খনাদ। বেরনোর আগেই মমতা নেমে এসে তাঁদের সঙ্গে দেখা করেন। ‘রাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ সমাজে’র ওই প্রতিনিধিদলে যুবকদের সংখ্যা ছিল বেশি। ওই দলের নেতা আশুতোষ পাণ্ডে বলেন, ‘‘দিদির সঙ্গে আছি। তাই উত্তরপ্রদেশে অখিলেশ যাদবের সঙ্গে থাকব।’’ তাঁরা মমতার এই ‘ভারতযাত্রা’র প্রতি সমর্থনও জানান। হোটেলের গেটে জড়ো হন উত্তরপ্রদেশের পেনশন-বঞ্চিত সরকারি কর্মচারীরাও। মমতা তাঁদের বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে পেনশন নিয়ে সমস্যা নেই। এখানেও যাতে এই সব সমস্যার সমাধান হয়, সেই জন্যই বিজেপিকে সরিয়ে অখিলেশকে ক্ষমতায় আনতে হবে।’’ তাঁরাও জানান, অখিলেশের পক্ষে থাকবেন।
উত্তরপ্রদেশের দ্বিতীয় পর্বের প্রচারে অখিলেশকে সঙ্গে নিয়েই বারাণসীতে সভা করবেন মমতা। আপাতত স্থির আছে, ২ মার্চ তিনি বারাণসীতে পৌঁছবেন। সভা ৩ মার্চ।