Advertisement
০২ মার্চ ২০২৪
Anti BJP Alliance

মতভেদ ভুলে নমনীয় হতে হবে: রাহুল, আমরা সকলে একজোট: মমতা, পরবর্তী বিরোধী বৈঠক হবে শিমলায়

প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকের পরে বিরোধী নেতাদের যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বললেন, ‘‘আমরা একজোট। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করব।’’

পটনায় বিজেপি-বিরোধী নেতাদের বৈঠক।

পটনায় বিজেপি-বিরোধী নেতাদের বৈঠক। ছবি: পিটিআই।

আনন্দবাজার অনলাইন ডেস্ক
পটনা শেষ আপডেট: ২৩ জুন ২০২৩ ১৮:১১
Share: Save:

পারস্পরিক মতবিরোধ রয়েছে। কিন্তু তা অতিক্রম করতে হবে নমনীয়তা রেখে। নিজেদের আদর্শকে সামনে রেখে একজোট হয়ে ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে দেশের ক্ষমতা থেকে হটাতে হবে বিজেপিকে। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নীতীশ কুমারের পটনার বাড়িতে ১৫টি বিরোধী দলের বৈঠক শুক্রবার বিকেলে এই বার্তা দিল। যেখানে বিজেপিকে দেশের ক্ষমতা থেকে সরানোর বিষয়ে একজোট হলেন রাহুল গান্ধী ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যদিও সাংবাদিক বৈঠকে দু’জনে বসেছিলেন একই টেবিলের দু’প্রান্তে।

বিরোধী নেতাদের বৈঠকে থাকলেও ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ ভাবে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে হাজির ছিলেন না দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীওয়াল এবং পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে নীতীশ কারও নাম না করে বলেন, ‘‘কয়েক জনের বিমান ধরার কথা ছিল। তাঁরা তাই চলে গিয়েছেন।’’ যদিও কংগ্রেসের একটি সূত্র জানাচ্ছে, পটনায় বৈঠকে দিল্লিতে আমলাতন্ত্রের দখল নিয়ে কেন্দ্রের বিতর্কিত অর্ডিন্যান্সের প্রসঙ্গ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কেজরীওয়াল। নরেন্দ্র মোদী সরকার ওই অর্ডিন্যান্সকে পাকাপাকি করতে লোকসভায় বিল আনলে কংগ্রেস তা সমর্থন করবে কি না, স্পষ্ট জানতে চান তিনি।

প্রায় তিন ঘণ্টার বৈঠকের পরে সকলের হয়ে প্রথম বলেন বৈঠকের আয়োজক নীতীশই। তাঁর কথায়, ‘‘বৈঠক খুব ইতিবাচক হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পরবর্তী বৈঠকে কে কোথায় লড়বে, তার খুঁটিনাটি চূড়ান্ত হবে।’’ বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তার পরেই রাহুলকে বলার অনুরোধ জানান। কিন্তু রাহুল কিছু বলতে চাননি। তিনি তাঁর পাশে-বসা মল্লিকার্জুন খড়্গেকে বলতে বলেন। সম্ভবত খড়্গে কংগ্রেসের সভাপতি বলেই। কারণ, ওই যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে দলের শীর্ষনেতা বা নেত্রী হিসেবেই সকলে তাঁদের বক্তব্য জানিয়েছেন। খড়্গে ঘোষণা করেন, ‘‘পরবর্তী বৈঠক হবে হিমাচল প্রদেশের শিমলায়।’’ ওই বৈঠক জুলাই মাসের ১০ বা ১২ তারিখ হতে পারে বলেও খড়্গে জানান। প্রসঙ্গত, শিমলা হিমাচল প্রদেশের রাজধানী। যে রাজ্যের দখল এখন কংগ্রেসের হাতে।

খড়্গের পরেই রাহুল বলেন, ‘‘কিছু দিন পরেই পরবর্তী বৈঠক হবে। বিরোধী জোট গড়ার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’’ রাহুল আরও বলেন, ‘‘আমাদের মধ্যে ছোটখাটো মতপার্থক্য হবে। কিন্তু আমাদের নমনীয় হয়ে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ, আমরা একসঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রাক্তন সাংসদ রাহুল বলেন, বিজেপি ভারতীয় সংস্কৃতির শিরদাঁড়ায় আঘাত করছে। যে নীতি এবং আদর্শের উপর ভিত্তি করে ভারত তৈরি হয়েছিল, তার উপরেই আঘাত করছে।

তৃণমূলের একাংশের দাবি, রাহুলের ‘নমনীয়’ হওয়ার বক্তব্য লোকসভা নির্বাচনে মমতার ‘তত্ত্ব’ (যে দল যেখানে শক্তিশালী, তাকে সেখানে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ার সুযোগ দিতে হবে। অর্থাৎ, বাংলায় আসনরফা বা সমঝোতা বা জোটের ক্ষেত্রে তৃণমূলই শেষ কথা বলবে)-এর দিকে ইঙ্গিত করছে। অনেকের মতে, রাহুল ‘নমনীয়’ হওয়ার কথা বলে মমতাকে বার্তা দিলেন। যদিও কংগ্রেস মনে করছে, রাহুল আদতে মমতাকেই নমনীয় হওয়ার বার্তা দিয়েছেন।

পটনার বৈঠককে জোটের প্রথম পদক্ষেপ বলেই মনে করা হচ্ছে। জোটের ‘মুখ’ কে হবেন, তা ভোটের আগে না পরে ঠিক হবে— সে সব কথা আলোচনার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু শুক্রবার যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বিরোধী বৈঠকের আয়োজক নীতীশ যে ভাবে সকলের আগে রাহুলকেই জোটের তরফে প্রথম মুখ খোলার অনুরোধ জানিয়েছেন, তা যথেষ্ট ‘তাৎপর্য’ বহন করছে।

রাহুলের পরেই বলেন মমতা। তাঁর প্রস্তাবেই পটনাকে এই বৈঠকের ‘উপযুক্ত স্থান’ হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছিল। মমতা বলেন, ‘‘আমরা একজোট। আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবে লড়াই করব।’’ তাঁর কথায়, ‘‘ওরা (বিজেপি) মনে করে, ইতিহাস বদলে দিতে হবে! আমরা বলতে চাই, বিহার থেকেই শুরু হবে ইতিহাসরক্ষার লড়াই।’’ শরদ পওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, মেহবুবা মুফতির মতো নেতারাও পারস্পরিক মতবিরোধ দূরে সরিয়ে একজোট হয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা বলেছেন।

শুক্রবার দুপুরে পটনায় মুখ্যমন্ত্রী নীতীশের সরকারি বাসভবনে ১৫টি বিরোধী দলের শীর্ষ নেতানেত্রীরা লোকসভা ভোটে বিজেপি বিরোধী জোট গড়ার বিষয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। তৃণমূল নেত্রী মমতা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন বৈঠকে। ছিলেন রাহুল ও খড়্গে, কেজরীওয়াল, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পিডিপি সভানেত্রী মেহবুবা মুফতি, জম্মু-কাশ্মীরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ন্যাশনাল কনফারেন্স নেতা ওমর আবদুল্লা, ডিএমকে প্রধান তথা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনের মতো বিরোধী নেতারাও। তাঁরা ছাড়া বৈঠকে ছিলেন এনসিপি প্রধান শরদ পওয়ার ও তাঁর কন্যা সুপ্রিয়া সুলে, জেএমএম প্রধান তথা ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী হেমন্ত সোরেন, সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, সিপিআই সাধারণ সম্পাদক ডি রাজা, সিপিআইএমএল (লিবাবেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য, মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা শিবসেনা (বালাসাহেব) প্রধান উদ্ধব ঠাকরে এবং উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদবের মতো নেতারা। আরজেডি প্রধান লালুপ্রসাদ এবং তাঁর পুত্র তথা বিহারের উপমুখ্যমন্ত্রী তেজস্বী যাদবকেও বিরোধী নেতাদের বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা গিয়েছে।

তবে যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে কেজরীওয়াল এবং ভগবন্ত মানের অনুপস্থিতি তাল কাটবে কি না, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। যদিও নীতীশ বিষয়টিকে খানিকটা লঘু করেই দেখাতে চেয়েছেন। প্রশ্ন করা হলে নীতীশ কারও নাম না করে বলেছেন, কয়েক জন বিমান ধরার তাড়ায় চলে গিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, পটনায় বৈঠক শুরুর আগেই বৃহস্পতিবার থেকে বিষয়টি নিয়ে কংগ্রেস-আপ চাপান-উতোর শুরু হয়ে গিয়েছিল। দিল্লিতে আপ মুখপাত্র প্রিয়ঙ্কা কক্কর বলেছিলেন, ‘‘আমরা জানতে পেরেছি, ওই অর্ডিন্যান্স নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের সঙ্গে কংগ্রেসের গোপন সমঝোতা হয়েছে। তাই অর্ডিন্যান্স বিরোধিতায় সামিল হবে না কংগ্রেস।’’ জবাবে দিল্লির কংগ্রেস নেতা সন্দীপ দীক্ষিত বলেছিলেন, ‘‘কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্ব পটনায় গিয়েছেন বিজেপি-বিরোধী ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ে শামিল হওয়ার বার্তা দিতে। অর্ডিন্যান্স নিয়ে কেজরীওয়ালের সঙ্গে দর কষাকষি করতে নয়।’’

আপ প্রধান কেজরীওয়াল কংগ্রেসের উপরে ‘চাপ’ বাড়িয়ে চলতি সপ্তাহেই রাজস্থান এবং মধ্যপ্রদেশের আসন্ন বিধানসভা ভোটে লড়ার ঘোষণা করেছেন। রাজস্থানের গঙ্গানগরে সভাও করেন তিনি। এর পরে বুধবার ‘প্রত্যাঘাত’ করে কংগ্রেস। গুজরাতে আপের সহ-সভাপতির পদে থাকা বশ্রাম সগাথিয়া-সহ সে রাজ্যের কয়েক জন কেজরী-ঘনিষ্ঠকে টেনে আনা হয় ‘হাত’ শিবিরে। সূত্রের খবর, দিল্লিতে শীলা দীক্ষিতের সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায়-আসা কেজরীওয়ালকে কোনও ভাবেই বাড়তি জায়গা দিতে রাজি নয় কংগ্রেস। এমনকি, আমলাতন্ত্রের দখল নিয়ে মোদী সরকারের সম্ভাব্য বিলের বিরোধিতায় যখন অন্য বিরোধীরা কেজরীওয়ালের পক্ষে, তখন কংগ্রেস তার সমর্থনের বিষয়টি এখনও ঝুলিয়ে রেখেছে। যদিও মমতা পটনায় বৈঠকের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে দাবি করেছেন, ‘‘স্বৈরাচারী কেন্দ্রীয় সরকার যে বিল আনবে, আমরা ঐক্যবদ্ধ ভাবেই তার বিরোধিতা করব।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE