কলাগুরু বিষ্ণুপ্রসাদ রাভা তখন ক্যানসারে আক্রান্ত। সেই খবর পেয়ে প্রাথমিক ভাবে কিছু টাকা জোগাড় করে পাঠিয়েছিলেন তাঁর অনুরাগী নাটক পাগল যুবক অচ্যুৎ লহকর। তিনি রাজ্যে তখন তুমুল জনপ্রিয়। পরে নাটক থেকে পাওয়া টাকা আর দলের অন্যদের চাঁদা মিলিয়ে তা নিয়ে তিনি পৌঁছন বিষ্ণু রাভার বাড়িতে। অসুস্থ কলাগুরু তাঁর কাছে ক্ষমা চেয়ে জানান, বড় দারিদ্র্যে দিন কাটছিল। ভাল করে খাওয়া জোটেনি। তাই অচ্যুতের পাঠানো টাকায় চিকিৎসা না করিয়ে পেট ভরে কয়েক দিন ভালমন্দ খেয়েছেন।
৪৭ বছর আগের সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল এ বার।
কলাগুরুর মতোই দারিদ্র্য আর অবহেলা সঙ্গী করে আজ বরপেটা জেলার পাঠশালায় নিজের বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন অসমে ভ্রাম্যমাণ থিয়েটারের প্রাণপুরুষ অচ্যুৎ। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিলেন তিনি।
১৯৩১ সালের ৯ জুলাই বরপেটা জেলার পাঠশালায় অচ্যুৎবাবুর জন্ম। ৩২ বছরের অচ্যুতের নেতৃত্বে পাঠশালা হরিমন্দিরের সামনের চাতালে ১৯৬৩ সালের ২ অক্টোবর ‘নটরাজ’ নাট্যদল তাদের প্রথম নাটক মঞ্চস্থ করে। সেটি ছিল নটসূর্য ফণী শর্মার লেখা ‘ভোগজরা’। ওই দিন থেকেই অসমে ভ্রাম্যমাণ নাট্যদলের যাত্রা শুরু। ভ্রাম্যমাণ নামটি অবশ্য দিয়েছিলেন রাধাগোবিন্দ বরুয়া। এখন যা ‘মোবাইল থিয়েটার’ নামে পরিচিত। নটরাজ থিয়েটারের প্রথম দিকের নাটকগুলির মধ্যে ছিল— হায়দর আলি, জেরেঙার সতী, আল্লাহ-ঈশ্বর, টিকেন্দ্রজিৎ। পরে অচ্যুৎবাবু রচিত, পরিচালিত নাটকগুলি ছিল বাংলার নকশাল আন্দোলনের পটভূমিতে তৈরি এরিনা, অজেয় ভিয়েতনাম, ঊষা, বেউলা, আমেরিকার পুতলা, ডক্টরবাবু, আমি হেনু মানুহ নহয়। ১৯৭২ সালে ‘ব্ল্যাক মানি’ নাটকটি নিয়ে সিনেমাও তৈরি করেন তিনি। ছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দীপাবলী’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক। ‘বেউলা’ ছিল নটরাজ থিয়েটার তথা অসমে মোবাইল থিয়েটারের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা হিট। টানা চল্লিশ বছর নটরাজ ওই নাটক মঞ্চস্থ করে। দল নিয়ে বিহার, মধ্যপ্রদেশেও নাটক করেছেন লহকর।
বর্তমানে রাজ্যে প্রায় ষাটটি ভ্রাম্যমাণ নাট্যদল বছরে ৯ মাস রাজ্যজুড়ে নাটক করে। তাঁদের অনেক পরিচালক-অভিনেতা অবশ্য ভ্রাম্যমানের জনকের নাম জানেন না। এক সময় ‘মঞ্চ প্রভাকর’ খেতাব পাওয়া অচ্যুৎবাবু ১৯৯৭ সালে কমল কুমারী পুরস্কার পেয়েছিলেন। আলোকবৃত্তে আসা সম্ভবত সেই শেষ বার। এরপর তাঁকে নিয়ে বিক্ষিপ্ত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়েছে। হয়েছে একটি তথ্যচিত্র। রচিত হয়েছে জীবনী। কিন্তু ক্রমশ একাকীত্ব ও দারিদ্র্যে ডুবে যাওয়া অচ্যুৎবাবু সমাজ থেকে প্রাপ্য সম্মান পাননি। তাঁর বাড়ির অদূরেই এখনকার বিখ্যাত মোবাইল থিয়েটার ‘আবাহন’-এর মূল মঞ্চ। কিন্তু সেখানে ভিড় জমানো জনতা মঞ্চ প্রভাকরের নামই শোনেনি।
বছর তিনেক আগে প্রবন্ধকার জ্যোতির্ময় তালুকদারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অচ্যুৎবাবু জানিয়েছিলেন— মানুষের ভুলো মনের কথা নিয়ে বিষ্ণু রাভা, ভূপেন হাজরিকা, নাট্যকার-অভিনেতা ব্রজ শর্মারা তাঁকে সাবধান করেছিলেন। কিন্তু তিনি তখন গর্ব করে বলেছিলেন, মাঝপথে নাট্যচর্চা ছাড়তে তিনি আসেননি, বরং আরও অনেক ব্রজ শর্মার হাসপাতালের বারান্দায় অবহেলায় মরে যাওয়ার ইতিহাস বদলাতে এসেছেন তিনি।
কিন্তু তেমন বদল হয়তো আনতে পারলেন না তিনিও।
বর্তমানে মোবাইল থিয়েটারগুলি প্রতি শো বাবদ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেয়। এক দফায় সাধারণত তিনটি শো করে তারা। অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কয়েক লক্ষ টাকা পান। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন চলচ্চিত্রের নায়ক-নায়িকারাই। তাঁদের পারিশ্রমিক দাঁড়ায় বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৭০ লক্ষ টাকা।
কিন্তু অচ্যুৎবাবুকে মনে রাখেনি বর্তমান প্রজন্ম। তাঁর পরিজনরা জানান, সন্ধে হলেই অস্থির হয়ে উঠতেন বৃদ্ধ লহকর। বলতেন, ‘‘এক সময় আমি যেখানে দাঁড়াতাম, সেখানেই মানুষ জমে যেত। আজ অন্ধকারে একা বসে থাকতে হয়।’’ তাঁর সাধের নটরাজ থিয়েটার চার দশক দাপিয়ে বেড়ানোর পরে লোকসানের ভার বইতে না পেরে ২০০৩ সালে বন্ধ হয়ে যায়। হাতে গড়া দলের আলোকসজ্জা, প্রজেক্টর, গাড়ি, আসবাব আর পোশাক বিক্রি করে মাত্র দেড় লক্ষ টাকা পেয়েছিলেন অচ্যুৎবাবু।
ছাত্র সংগঠন আসু, মোবাইল থিয়েটারের খ্যাতনামা পরিচালকদের অনেকে, অসমীয় চলচ্চিত্রের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অনেকেই মনে করেন, অন্তত পদ্মশ্রী সম্মান অচ্যুৎবাবুর প্রাপ্য ছিল। তাঁর হাতে গড়া নাট্যকর্মীরা সাহিত্য অকাদেমি পেয়েছেন। কিন্তু সরকারের উদাসীনতায় কোনও জাতীয় সম্মান জোটেনি অচ্যুৎবাবুর কপালে।
শেষমেষ অবশ্য রাজ্যের তরফে খানিক সম্মান জুটল। তবে মৃত্যুর পরে। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল অচ্যুৎবাবুর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে রাজ্যিক মর্যাদায় তাঁর সৎকারের আয়োজন করার জন্য বরপেটা জেলার জেলাশাসক ও এসপিকে নির্দেশ দিয়েছেন।