বিহারে ছিল অন্যের নাম বাদ দেওয়ার হুড়োহুড়ি। পশ্চিমবঙ্গে ঠিক তার উল্টো। অন্যের নাম বাদ দেওয়ার যত দাবি, তার প্রায় পাঁচ গুণ নাম যোগ করার আবেদন জমা পড়েছে। তৃণমূল শিবিরের বিশেষ করে আশঙ্কা, বিজেপি এই সময়কালে অন্য রাজ্যের লোকেদের রাজ্যের ভোটার তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ায় গত ১৬ ডিসেম্বর খসড়া তালিকা প্রকাশে প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার নাম বাদ গিয়েছিল। এসআইআর-এর আগে ভোটার তালিকায় প্রায় ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ নাম ছিল। খসড়া তালিকা প্রকাশের পরে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে ‘ক্লেম-অবজেকশন’-এর জন্য। কারও নাম ভুল করে বাদ গেলে তিনি নাম যোগ করার আবেদন জানাতে পারেন। তেমনই ভোটার তালিকায় অন্য কারও নাম নিয়ে আপত্তি থাকলে তা বাদ দেওয়ার জন্যও আর্জিজানাতে পারেন।
শনিবার, ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের হিসেব বলছে, অন্যের নাম বাদ দেওয়ার জন্য ৩৮ হাজার ২১৪টি আবেদন জমা পড়েছে। তার প্রায় পাঁচ গুণ—১ লক্ষ ৯০ হাজার ৪৬৩টি আবেদন জমা পড়েছে নাম যোগ করার জন্য। প্রথম দিকে দিনে ১ থেকে ২ হাজার করে নাম যোগের আবেদন জমা পড়ছিল। এখন কোনও দিন ৪ থেকে ৬ হাজার, কোনও দিন ৭ থেকে ৮ হাজার আবেদন জমা পড়ছে। এর সঙ্গে খসড়া তালিকা প্রকাশের আগেই নাম যোগ করার জন্য কমিশনের কাছে ৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৭৫টি আবেদন জমা রয়েছে। এ সব নাম যাচাই করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যোগ হবে।
বিহারের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো দেখা গিয়েছিল। বিহারে এসআইআর খসড়া তালিকায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছিল। তার পরে এক মাসে নাম যোগের আবেদনের ছয় গুণ অন্যের নামে আপত্তি জমা পড়েছিল। ৩০ হাজারের মতো আবেদন ছিল নাম যোগের জন্য। এর ছয় গুণ, আরও ১ লক্ষ ৯৭ হাজারের মতো নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য জমা পড়েছিল। বিহারে রাজনৈতিক শিবিরে প্রশ্ন উঠেছিল, বিজেপি কি আরজেডি-কংগ্রেসের সমর্থকদের ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দিতে উদ্যোগী হয়েছিল? ভোটের পরে তার সঙ্গে অভিযোগ উঠেছিল, দিল্লি, হরিয়ানার মতো বিহারে বিজেপি অন্য রাজ্যের ভোটারদের নাম ঢুকিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের ছবি দেখে রাজনৈতিক শিবিরে প্রশ্ন উঠেছে, তৃণমূল থেকে বিজেপি, সব দলই নিজেদের সমর্থকদের ভোটার তালিকায় নাম ঢোকাতে তৎপর? না কি বিজেপি অন্য রাজ্যের লোকদের নাম এ রাজ্যের ভোটার তালিকায় ঢোকানোর চেষ্টা করছে? তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, বিজেপি অন্য রাজ্য থেকে লোক এনে বাংলার ভোটার তালিকায় নাম ঢোকাবে। তৃণমূল সূত্রের ব্যাখ্যা, পশ্চিমবঙ্গে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই নাম যোগের দাবি ও অন্যের নামে আপত্তি জানানোর সময় রয়েছে। যাঁদের নাম খসড়া তালিকায় ছিল কিন্তু বাদ পড়েছে, তাঁদের সঙ্গে নতুন যে কেউ নির্বাচন কমিশনের ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করে নাম যোগের আবেদন জানাতে পারবেন।
অন্য রাজ্যের কোনও ব্যক্তির নাম কি পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় উঠতে পারে? নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, অন্য রাজ্যের ভূমিপুত্র হলেও কেউ যদি ইদানিং পশ্চিমবঙ্গেই থাকেন বলে প্রমাণ দেখিয়ে আবেদন করেন, তা হলে তাঁর নাম রাজ্যের ভোটার তালিকাতেই থাকা উচিত। কমিশন সমস্ত নথি খতিয়ে দেখেই ভোটার তালিকায় নাম তুলবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, বিহারের ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী ও মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতে খসড়া তালিকায় যথেষ্ট বেশি হারে নাম বাদ পড়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গে মালদা, মুর্শিদাবাদ, দিনাজপুর, নদিয়ার মতো বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে খসড়া তালিকায় নাম বাদের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশের আশেপাশে। কিন্তু উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতায় তা ২৪ থেকে ২৬ শতাংশের আশেপাশে। অথচ বিজেপির দাবি ছিল, সীমান্তবর্তী মুসলিম অধ্যুষিত জেলাগুলিতেই বিপুল সংখ্যক বেআইনি অনুপ্রবেশকারী, ভুয়ো ভোটার রয়েছে।
বিজেপি সূত্রের দাবি, সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে অনেক অনুপ্রবেশকারীর নাম ঢুকে গিয়েছে। কমিশন যেমন নিজে নোটিস পাঠাচ্ছে, তেমন বিজেপির তরফ থেকেও বেআইনি ভোটারদের চিহ্নিত করা হবে। স্থানীয় স্তরে কমিশনের সাত নম্বর ফর্ম পূরণ করে বিজেপি কর্মীরা ওই সব নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানাবেন। নতুন বছরের ছুটির রেশ কাটলেই কাজেগতি আসবে।
তৃণমূল সূত্রের বক্তব্য, যাঁদের নাম খসড়া তালিকায় বাদ গিয়েছে, তাঁদের অনেকেই খাঁটি ভোটার। যেমন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় খসড়া তালিকায় ‘মৃত’ বলে চিহ্নিত ভোটারদের তাঁর মঞ্চে হাজির করেছেন। এইসব ভোটাররাও তাঁদের নাম যোগ করার আবেদন জানাবেন। সেইসঙ্গে বিজেপি যাতে বাইরের লোক ভোটার তালিকায় ঢোকাতে না পারে, সে দিকে নজর রাখা হচ্ছে। কংগ্রেস, সিপিএম সূত্রের বক্তব্য, অন্যায় ভাবে যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁদের ৬ নম্বর ফর্ম পূরণ করে নাম যোগ করার আবেদন করতে স্থানীয় কর্মীরা সাহায্য করছেন। এখনও পর্যন্ত নাম যোগের আবেদন ১ লক্ষ ৯০ হাজার মতো হলেও ১৫ তারিখের মধ্যে তা অনেকটাই বেড়ে যাবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)