ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারায় বধূ নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই পুলিশ আর তড়িঘড়ি কোনও তদন্ত না করে এক কথায় অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে পারবে না। বুধবার এক রায়ে এই কথা জানিয়ে দিল সুপ্রিম কোর্ট।
বিচারপতি সি কে প্রসাদের বেঞ্চ আজ জানিয়েছে, বধূ নির্যাতন রুখতে যে আইন এক দিন ঢাল হিসেবে আনা হয়েছিল, আজ তাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিচারপতির নির্দেশ, অভিযোগের তদন্ত না করে এ বার থেকে এই ধারায় ঢালাও গ্রেফতার বা আটক করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ অফিসারকে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে গ্রেফতারের যুক্তি ও তথ্যপ্রমাণ পেশ করতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেটরাও যেন যান্ত্রিক ভাবে অভিযুক্তকে আটকে রাখার নির্দেশ না দেন। এর অন্যথা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোর্টের মতে, প্রথমেই গ্রেফতার, তার পরে বাকি কাজ এই ‘ঘৃণ্য’ ধারারই বিলুপ্তি দরকার। বস্তুত, সাত বছর বা তার কম কারাদণ্ড হতে পারে, এমন যে কোনও অপরাধের অভিযোগ পেলে পুলিশ যাতে যথাযথ তদন্তের আগে গ্রেফতারের পথে না হাঁটে, সমস্ত রাজ্য সরকারকে তা নিশ্চিত করতে বলেছে সর্বোচ্চ আদালত। এই গোত্রের অপরাধগুলির মধ্যেই একটি হল বধূ নির্যাতন। ৪৯৮এ ধারায় এই অভিযোগ আনা হলে তা জামিন-অযোগ্য এবং পরোয়ানা ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা যায়। কোর্টের বক্তব্য, সেই পরোয়ানা ছাড়া কাউকে গ্রেফতারের প্রয়োজন আছে কি না, এ ক্ষেত্রে আগে পুলিশকে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
কোর্টের সাফ কথা, এক শ্রেণির গৃহবধূ তাঁদের অসন্তোষের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন এই আইনকে। বিচারপতিরা বলেছেন, “হেনস্থার সহজতম রাস্তাই হল স্বামী ও তাঁর আত্মীয়দের গ্রেফতার করিয়ে দেওয়া। অজস্র ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, স্বামীর শয্যাশায়ী ঠাকুর্দা-ঠাকুমা, দীর্ঘদিন বিদেশে থাকা ননদদেরও এই অভিযোগে জুড়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদেরও গ্রেফতার করা হয়েছে।”
এই প্রসঙ্গে তথ্যও পেশ করেন দুই বিচারপতি। তাঁরা জানান, ২০১২ সালে ৪৯৮এ ধারায় গ্রেফতার হয়েছেন মোট ১ লক্ষ ৯৭ হাজার ৭৬২ জন। এর এক-চতুর্থাংশ মহিলা। স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে, এর মধ্যে শাশুড়ি ও ননদরা রয়েছেন। সারা দেশে মোট গ্রেফতার হওয়া মানুষের মধ্যে ৬% এই ধারায় অভিযুক্ত। আর মোট অপরাধের বিচারে চুরি ও হামলার পরেই রয়েছে পণের জন্য বধূ নির্যাতন মোটের ৪.৫%।
অথচ পরিসংখ্যান বিচার করলে দেখা যাচ্ছে, ৯৩.৬ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রে চার্জশিট জমা পড়লেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মাত্র ১৫ শতাংশ। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়েছে, শুধু হেনস্থা করার জন্যই এই ধারা ব্যবহার করেছেন সংশ্লিষ্ট বধূ। কিন্তু এই ধারা প্রয়োগ করে যাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদের স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে। প্রকাশ্যে হেনস্থা তো হতে হয়েইছে, তার উপরে সেই ঘটনার ক্ষত রয়ে গিয়েছে চিরদিনের জন্য।
এই প্রসঙ্গে পুলিশকেও দুষেছেন বিচারপতিরা। তাঁরা বলেছেন, স্বাধীনতার ৬ দশক পরেও এ দেশের পুলিশ পরাধীন আমলের মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। জনতার বন্ধু হওয়ার বদলে হেনস্থার অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশ। আর গ্রেফতারির ঢালাও ক্ষমতা পুলিশে দুর্নীতির সম্ভাবনাও বাড়িয়ে তুলেছে।
দেশে পণপ্রথা বিলোপ এবং বধূ নির্যাতন রোধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারা প্রয়োগ করা হয়। এই আইন তৈরির উদ্দেশ্য ছিল, নির্যাতিত বধূরা যাতে দ্রুত বিচার পান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ, এই আইনের অপব্যবহার হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের এ দিনের রায়ের পরে সেই অভিযোগ অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল বলে মনে করছেন অনেকে। তবে এর ফলে কি সত্যিকারের নির্যাতিতাদের বিচার পেতে অসুবিধা হবে, উঠেছে সেই প্রশ্নও।