Advertisement
E-Paper

টেমসের তীরে তামিল রাজনীতি! ব্রিটিশ ক্রিকেট লিগেও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ-আস্ফালন, কাছে ভোট, তাই পাক ক্রিকেটারে তর্ক

মোট ৬৩ জন পাক ক্রিকেটার ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ খেলবেন বলে নিলামে নাম লিখিয়েছিলেন। মাত্র দু’জন দল পেয়েছেন। আবরারকে যেমন কিনেছে কাব্য মারানের দল, তেমন উসমান তারিককে কিনেছে অন্য একটি দল। তাদের মালিক অবশ্য ভারতীয় নন।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৩ মার্চ ২০২৬ ১৯:০২
Is Tamil Nadu Assembly Election the reason behind Sunrisers Leeds taking Pakistani cricketer Abrar Ahmed in The Hundred

(বাঁ দিক থেকে) আবরার আহমেদ, এমকে স্ট্যালিন, কাব্য মারান। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভারতের ২২ গজে ক্রিকেটের সঙ্গে জাতীয়তাবাদের সম্পর্ক নতুন নয়। পহেলগাঁওয়ে জঙ্গি হামলা, তার পরে পাকিস্তানকে ‘সবক’ শেখাতে ভারতের ‘সিঁদুর অভিযান’, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেই ক্রিকেটীয় জাতীয়তাবাদের আবেগ গত কয়েক মাসে আরও গাঢ় হয়েছে। কিন্তু তা শুধু ভারতীয় ভূখণ্ডেই সীমাবদ্ধ রইল না। ভারতীয় জাতীয়বাদের আস্ফালন ঘটল ব্রিটিশ ক্রিকেট লিগেও। যে তর্ক-বিতর্ক স্পষ্ট করে দিল টেমসের তীরে তামিল রাজনীতির ছায়া। সৌজন্যে এক পাকিস্তানি স্পিনার আবরার আহমেদ।

ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) অনুমোদিত ক্রিকেট লিগ ‘দ্য হান্ড্রেড’ শুরু হতে চলেছে। এই লিগে আটটি টিম খেলে। যার মধ্যে চারটির মালিক কোনও না কোনও ভারতীয় শিল্পগোষ্ঠী। ‘সানরাইজ়ার্স লিডস’ নামে দলটির মালিক তামিল শিল্পপতি কলানিধি মারান। যাঁর শিল্পগোষ্ঠীর নাম ‘সান গ্রুপ’। কলানিধির কন্যা কাব্য মারানই ক্রিকেটীয় বিষয় দেখাশোনা করেন। যেমন তিনি দেখভাল করেন আইপিএলে সানরাইজ়ার্স হায়দরাবাদ দলটির ক্ষেত্রেও। কলানিধি-কাব্যদের দল ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর নিলামে কিনেছে পাক স্পিনার আবরারকে। তাতেই তৈরি হয়েছে বিতর্ক। যে বিতর্ক বলছে, এই সিদ্ধান্তে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ আহত হয়েছে।

পাকিস্তানি স্পিনারকে কেনার পরে পরিস্থিতি এমনই হয়েছে যে, কাব্যদের টিমের ‘অফিশিয়াল এক্স হ্যান্ডল’ পর্যন্ত ‘সাসপেন্ডেড’ হয়ে গিয়েছে জাতীয়তাবাদীদের ক্রোধে। তার কোনও আনুষ্ঠানিক কারণ জানানো হয়নি। তবে সমাজমাধ্যম দুনিয়ার দস্তুর হল, কোনও হ্যান্ডলের বিরুদ্ধে গণহারে রিপোর্ট করলে তা ‘সাসপেন্ড’ করে দেন কর্তৃপক্ষ। এ ক্ষেত্রেও তেমনই কিছু করা হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কারণ, জাতীয়তাবাদীরা প্রথম থেকেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিলেন, কেন ভারতীয় মালিক পাকিস্তানি খেলোয়াড়কে টিমে নেবেন? এ আসলে দেশের অসম্মান। অনেকে কলানিধি-কাব্যদের ‘দেশদ্রোহী’ তকমা দিতেও পিছপা হননি।

কলানিধি যেমন শিল্পপতি, তেমনই তাঁর মারান পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও রয়েছে। কলানিধির ভাই অর্থাৎ কাব্যের কাকা দয়ানিধি মারান তামিলনাড়ুর শাসকদল ডিএমকে-র সাংসদ। কেন্দ্রে ইউপিএ সরকারের সময়ে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি এবং বস্ত্রমন্ত্রী ছিলেন। তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অধুনাপ্রয়াত এম করুণানিধির ভাগ্নে এই মারান ভ্রাতৃদ্বয়। সেই সম্পর্কের নিরিখে তাঁরা তামিলনাড়ুর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিনেরও তুতো ভাই। দয়ানিধি এবং কলানিধির বাবা মুরাসোলি মারান ছিলেন তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মন্ত্রী এবং ৩৬ বছরের সাংসদ।

এই বিতর্ক আরও ‘তাৎপর্যপূর্ণ’ হয়ে উঠেছে সামনে তামিলনাড়ুর বিধানসভা ভোট থাকায়। সেই ভোটে সরাসরি লড়াই হবে ডিএমকে বনাম বিজেপির। দাক্ষিণাত্যে বহুদিন ধরেই জমি পাওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। কিন্তু বিন্ধ্য পর্বতমালার ওপারে এখনও সে ভাবে বিকশিত হতে পারেনি নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহের দল। কেন্দ্রের শাসক হলেও দক্ষিণে বিজেপির রমরমা নেই। এ বারেও তারা ডিএমকে-কে হটিয়ে রাজ্যের ক্ষমতা দখল করতে পারবে, তেমন সম্ভাবনা কম। এই রাজনীতির আবহেই ক্রিকেটীয় মোচড়টি এসেছে। বিজেপির লড়াই যে ডিএমকে-র সঙ্গে, সেই ডিএমকে-র সঙ্গে ব্রিটিশ ‘হান্ড্রেড’ লিগের দলের মালিক কাব্য-কলানিধির রাজনৈতিক পরিচয় জুড়ে রয়েছে। ফলে পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে কিনে জাতীয়তাবাদীদের রোষানলে পড়েছেন কাব্য-কলানিধি। কারণ, রাজনৈতিক সমীকরণের কারণেই যত সহজে অন্যান্য দলের মালিকদের পাকিস্তানি ক্রিকেটারকে অচ্ছুত রাখতে বলা যায়, তা কাব্য-কলানিধিকে বলা যায় না। বললেও তাঁরা তা মানবেন, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই।

পারিবারিক ভাবে মারান পরিবারের ছোট একটি প্রকাশনা সংস্থা ছিল। তাকে কয়েক লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসায় পরিণত করার নেপথ্য কারিগর কলানিধি। তাঁর সংস্থা ‘সান নেটওয়ার্ক’ দেশের অন্যতম বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক। মারান ভ্রাতৃদ্বয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক খুব মধুর না-হলেও পরিবারের সঙ্গে দ্রাবিড় রাজনীতির সত্তা নিবিড় ভাবে জড়িয়ে রয়েছে। ডিএমকে-র রাজনীতির মূল পুঁজিই ‘দ্রাবিড় গরিমা’। তথাকথিত ভারতীয় জাতীয়তাবাদের সঙ্গে যার দূর দূর পর্যন্ত কোনও সম্পর্ক নেই। আবার যে জাতীয়তাবাদীরা কলানিধিদের বিরুদ্ধে রে-রে করে নেমেছেন, তাঁদের অনেকেই বিজেপি সমর্থক। বিজেপির দেশপ্রেমের ‘লাইনের’ সঙ্গেও এই অংশের ভাষ্যের মিল রয়েছে। কিন্তু মতাদর্শগত ভাবে ডিএমকে একেবারে বিজেপির উল্টো মেরুতে অবস্থান করে। সেই সূত্রেই প্রশ্ন উঠছে, ভোটমুখী তামিলনাড়ুতে কৃত্রিম ভাবে জাতীয়তাবাদের হাওয়া তুলতেই ব্রিটিশ ক্রিকেট লিগের ২২ গজকে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না। আবার অনেকের এ-ও দাবি, ভারতের মতো ইংল্যান্ডের মাটিতে পাক ক্রিকেটারদের নেওয়া নিয়ে কোনও নিষেধাজ্ঞা না-থাকায় পরিকল্পনা করেই আবরারকে কিনে নিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে চেয়েছেন মারান পিতা-পুত্রী। তাতে ‘দ্রাবিড় গরিমা’ আরও বেশি করে প্রতিষ্ঠিত করা যাবে।

রাজনীতি সব সময়েই ধারণার বশবর্তী। তা থেকেই এই বিতর্কে অনেকে তামিলভূমের রাজনীতি এবং ভোটের ছায়া দেখছেন। যদিও পাল্টা এই প্রশ্নও উঠছে যে, এমন জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তামিলভূমে বিজেপি আদৌ দাগ কাটতে পারবে কি না। তাঁদের বক্তব্য, তামিলভূমে যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ দিয়ে প্রভাব তৈরি করা যাবে না, তা জানেন বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বও। সেই কারণেই নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধনে হাতে তামিল সংস্কৃতির প্রতীক ‘সেঙ্গল’ নিয়ে ঢুকেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে এ কথা ঠিক, এই বিতর্কের মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোথাও বিজেপি নেই। যেমন আনুষ্ঠানিক ভাবে নেই ডিএমকে-ও। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের ধারণায় রয়েছে দু’পক্ষই।

মোট ৬৩ জন পাক ক্রিকেটার ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ খেলবেন বলে নিলামে নাম লিখিয়েছিলেন। কিন্তু দু’জন দল পেয়েছেন। আবরারকে যেমন কিনেছে কাব্যের দল, তেমন উসমান তারিককে (বিচিত্র বোলিং অ্যাকশনের জন্য ইতিমধ্যেই ক্রিকেটদুনিয়ায় পরিচিত) কিনেছে অন্য একটি দল। তাদের মালিক অবশ্য ভারতীয় নন। ফলে তারিকের দল পাওয়া নিয়ে কোনও বিতর্কও নেই। মারানেরা ছাড়া ‘দ্য হান্ড্রেড’-এর বাকি তিনটি দলের মালিকানা রয়েছে সঞ্জীব গোয়েন্‌কা, রিলায়্যান্স গোষ্ঠী এবং জিএমআর গোষ্ঠীর হাতে। ঘটনাচক্রে, এই চার শিল্পগোষ্ঠীর দল রয়েছে আইপিএলেও।

আইপিএলের জন্য কলকাতা নাইট রাইডার্স নিলামে কিনেছিল বাংলাদেশের পেসার মুস্তাফিজুর রহমানকে। তা নিয়েও বিতর্ক তীব্র আকার নেয়। শেষমেশ বিসিসিআইয়ের (মতান্তরে, অমিত শাহের পুত্র তথা আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহের) নির্দেশে মুস্তাফিজুরের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। মুস্তাফিজুরকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় কলকাতা। সেই বিতর্কের জেরে সদ্যসমাপ্ত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যোগই দেয়নি বাংলাদেশ। উল্লেখ্য, মুস্তাফিজুরকেও ‘হান্ড্রেড’-এর একটি দল কিনেছে। তবে তার মালিক ভারতীয় নন। ফলে তাঁকে নিয়ে আর নতুন করে কোনও বিতর্ক হয়নি।

Tamil Nadu Assembly Election Pakistani Cricketer Abrar Ahmed The Hundred Kavya Maran MK Stalin
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy