E-Paper

তেল: ভারতে ভান্ডার বাড়েনি জমির জটে

ভারতের বিপদের সময় অভাব মেটাতে আরও বেশি পরিমাণে তেল মজুত করার ভান্ডার বা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ তৈরির কাজ আটকে রয়েছে লাল ফিতের ফাঁসে! জমি অধিগ্রহণের জটে!

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৯:০৫

—প্রতীকী চিত্র।

চার বছর আগে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পরেই বিশ্ব জুড়ে জ্বালানির জোগান নিয়ে চিন্তা তৈরি হয়। তখনই চিন ঘর গোছাতে শুরু করেছিল। চিনের সরকারি তেল সংস্থাগুলি দেশজুড়ে বিপদের সময় অভাব মেটাতে তেল মজুত করার ভান্ডার তৈরি করতে শুরু করে। গত বছর বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬০ ডলারের ঘরেই ছিল। পরিবহণের জন্য তেলের প্রয়োজন কমলেও চিন লাগাতার তেল আমদানি বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এখন পশ্চিম এশিয়ায় অশান্তির ফলে বিশ্ব বাজারে অশোধিত তেলের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু চিন বিপুল পরিমাণে তেল মজুত করে রাখার সুবিধা পাচ্ছে।

উল্টো দিকে ভারতের বিপদের সময় অভাব মেটাতে আরও বেশি পরিমাণে তেল মজুত করার ভান্ডার বা ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ তৈরির কাজ আটকে রয়েছে লাল ফিতের ফাঁসে! জমি অধিগ্রহণের জটে! আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার মতে, যে কোনও দেশে সঙ্কটের কথা ভেবে ৯০ দিনের তেল মজুত রাখা দরকার। গত ফেব্রুয়ারিতে মোদী সরকারের তেলমন্ত্রী হরদীপ সিংহ পুরী নিজেই সংসদে বলেছিলেন, ভারতে ৭৫ দিনের তেল মজুত রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ শুরুর পরে তেল মন্ত্রকের সূত্রে জানানো হয়েছিল, ২৫ দিনের পেট্রল-ডিজেল ও ২৫ দিনের অশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এখন তেল মন্ত্রক শুধু বলছে, অশোধিত তেল বা পেট্রল-ডিজেলের কোনও অভাব নেই। যদিও ভারতে আমদানি করা তেলের দাম চিন্তার কারণ হয়ে উঠছে।

পাঁচ বছর আগে মোদী সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ বা তেল মজুতের ভান্ডার বাড়ানো হবে। কিন্তু এত দিনেও তা রূপায়িত হয়নি।

যুদ্ধ বা অন্য কোনও সঙ্কটের সময় বিদেশ থেকে তেল আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে পারে ভেবে সব দেশই তেল মজুত রাখে। এ দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ লিমিটেড এই কাজের দায়িত্বে। দেশের তিনটি জায়গায় এই সংস্থার মোট ৫৩.৩ লক্ষ টন অশোধিত তেল মজুত রাখার জন্য ভূগর্ভস্থ ভান্ডার রয়েছে। বিশাখাপত্তমে মোট ১৩.৩ লক্ষ টন তেল মজুত রাখা যায়। কর্নাটকের মেঙ্গালুরুতে ১৫ লক্ষ টন তেল মজুত থাকে। চেন্নাইয়ের পাদুরে মাটির নীচে প্রায় ২৫ লক্ষ টন তেল মজুত রাখা হয়।

এই মজুত রাখা ৫৩.৩ লক্ষ টন তেল দিয়ে দেশের কত দিনের পেট্রল-ডিজেলের চাহিদা মেটানো সম্ভব?

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের হিসেবে, মাত্র ৯ থেকে ১০ দিন! এর সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি তাদের তেল শোধনাগারে প্রায় ৬৫ দিনের মতো অশোধিত তেল মজুত রাখে। সব মিলিয়ে দেশের তেল মজুত রাখার ক্ষমতা ৭৫ দিনে পৌঁছয়। চিন ঠিক কত পরিমাণে তেল মজুত করে রাখার ভান্ডার তৈরি করেছে, সেই তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, চিন ছয় মাস থেকে এক বছরের প্রয়োজন মেটানোর মতো তেল মজুত রাখার ভান্ডার তৈরি করে ফেলেছে।

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, এ দেশে তেলের ‘স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ’ বাড়ানোর জন্য পাঁচ বছর আগে মোদী সরকার এখনকার ৫৩.৩ লক্ষ টন তেল মজুতের ভান্ডারের সঙ্গে আরও ৬৫ লক্ষ টন তেল মজুত রাখার ভান্ডারে তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, চেন্নাইয়ের পাদুরে আরও ২৫ লক্ষ টন তেল মজুতের জন্য মাটির নীচে ‘ক্যাভার্ন’ বা ভান্ডার তৈরি হবে। ওড়িশার চান্ডিখোলে ৪০ লক্ষ টন তেল মজুতের ভান্ডার তৈরি হবে। কিন্তু এখনও জমি অধিগ্রহণের কাজই শেষ হয়নি। ওড়িশায় জমি অধিগ্রহণ চূড়ান্ত পর্যায়ে বলে সরকারের দাবি। পাদুরে জমির জন্য আর্থিক লেনদেন শেষ করার কাজ চলছে।

কাজ এগোয়নি বলে ‘স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ’ তৈরির জন্য বরাদ্দ অর্থ খরচ করতে পারেনি মোদী সরকার। ২০২৩-২৪-এ এ জন্য ৫০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছিল। তার পরে বরাদ্দ কমিয়ে ৪০ কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু এক পয়সাও খরচ হয়নি। ২০২৪-২৫-এ ৪০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছিল। তার পরে বরাদ্দ কাটছাঁট করে ৩০ কোটি টাকা করা হয়। বাস্তবে ১৭.২৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ২০২৫-২৬-এ ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে শেষে বরাদ্দ কমিয়ে ২০ কোটি টাকা করা হলেও এখনও মাত্র ১৫.৫৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। আগামী অর্থ বছর, ২০২৬-২৭-এর জন্য মাত্র ২০ কোটি টাকাই বরাদ্দ হয়েছে।

সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ, আর ৭৫ দিনে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। আন্তর্জাতিক মাপকাঠি মেনে কেন্দ্রীয় সরকার দেশে ৯০ দিনের অভাব মেটানোর জন্য তেল মজুত রাখার ব্যবস্থা তৈরি করুক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Oil Fuel

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy