রাহুল গান্ধীর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য এক বছর আগেও তামিলনাড়ুর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এমকে স্ট্যালিন ৩০টি শব্দ খরচ করেছিলেন। এক বছর অনেকটা সময়। এর মধ্যে স্ট্যালিনের নামের আগে ‘প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী’ শব্দটি জুড়ে গিয়েছে। তামিলনাড়ুতে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কংগ্রেসের সঙ্গে বদলে গিয়েছে ডিএমকের রাজনীতির সমীকরণও। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে খাটো হয়ে গেল স্ট্যালিনের শুভেচ্ছাবার্তাও। এ বার তিনি রাহুলের জন্য খরচ করলেন মাত্র ১৫টি শব্দ, গত বারের অর্ধেক!
শুক্রবার ৫৬ বছরে পা দিয়েছেন রাহুল। তাঁকে শুভেচ্ছা জানিয়ে স্ট্যালিন সমাজমাধ্যমে লিখেছেন, ‘‘মাননীয় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। আপনার সুস্বাস্থ্য এবং আনন্দ কামনা করি।’’ সংক্ষিপ্ত, মার্জিত পোস্ট। শুভেচ্ছা জ্ঞাপনের কোনও আড়ম্বর নেই তাতে। অথচ এক বছর আগে ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। ২০২৫ সালের এই ১৯ জুন স্ট্যালিন সমাজমাধ্যমে ‘ভাই’ বলে উল্লেখ করেছিলেন রাহুলকে। লিখেছিলেন, ‘‘আমার আদর্শগত ভাই রাহুল গান্ধীকে জন্মদিনের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাই। আমাদের মধ্যে কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমরা চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদ্দেশ্যগত ভাবে এক বন্ধনে আবদ্ধ।’’ স্ট্যালিন আরও লিখেছিলেন, ‘‘আপনি এমন দৃঢ় থাকুন, সাহসের সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়ে চলুন। উজ্জ্বল ভারতের লক্ষ্যে এই যাত্রায় আমাদের জয় হবেই।’’ এক বছরের ব্যবধানে দু’জনের মধ্যে কতটা দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে রাজনীতি, এই দুই পোস্ট থেকেই তার ইঙ্গিত মেলে।
আরও পড়ুন:
স্ট্যালিনের পোস্টের মাপা জবাব দিয়েছেন রাহুলও। লিখেছেন, ‘‘ভারতের সামগ্রিক ধারণা, আমাদের সংবিধান এবং যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধতাই আগামী দিনে আমাদের পথ দেখাবে। এটা আমাদের গণতন্ত্রের আত্মার লড়াই। বিজয়ী না-হওয়া পর্যন্ত আমরা এই লড়াই চালিয়ে যাব।’’ রাহুলের এই পোস্টে রাজনীতির অঙ্ক স্পষ্ট। তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে ডিএমকের ভরাডুবির পর বিজয়ী টিভিকের হাত ধরেছে কংগ্রেস। তাতে স্ট্যালিনের দল ক্ষুব্ধ। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে বিজেপির বিরোধিতায় ডিএমকে-কে কংগ্রেসের প্রয়োজন। রাহুল তাই সামগ্রিক ভারতের ধারণা এবং গণতন্ত্রের বৃহত্তর লড়াইয়ের কথা মনে করাতে চেয়েছেন স্ট্যালিনকে।
তামিলনাড়ুতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক আসনে জয় পেলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করতে পারেনি মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ের টিভিকে। তার জন্য অন্য কিছু দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল তাঁর। কংগ্রেস টিভিকে-কে সমর্থন করে সরকার গঠনে সাহায্য করেছে। তার পর থেকেই ‘শীতল’ হয়েছে রাহুল-স্ট্যালিন সম্পর্ক। কেন্দ্রে বিজেপি বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সঙ্গেও ডিএমকে কিছুটা দূরত্ব রচনা করেছে। জোটের শেষ বৈঠকে তাদের কোনও প্রতিনিধি যোগ দেননি। এমনকি, লোকসভায় আসন বিন্যাস পরিবর্তন চেয়ে স্পিকারকে চিঠি দিয়েছে ডিএমকে। তাঁদের সাংসদেরা আর কংগ্রেসের সঙ্গে বসতেই চান না!
অন্য দিকে, তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ও রাহুলকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করেছেন। লিখেছেন, ‘‘ভারতের উন্নয়নের জন্য, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার জন্য, সমাজের সর্ব স্তরের মানুষের কল্যাণের জন্য আপনি লড়াই চালিয়ে যান। আমি আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং সকল প্রচেষ্টায় সাফল্য কামনা করছি।’’ বিজয়কে জবাবে রাহুল লিখেছেন, ‘‘সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধতায়, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব। তামিলনাড়ুর মানুষের উন্নয়নের জন্য আমরা একসঙ্গে কাজ করে যাব।’’ লক্ষণীয়, স্ট্যালিনকে সর্বভারতীয় স্তরে ঐক্যের বার্তা দিয়েছিলেন রাহুল। বিজয়ের প্রতি তাঁর বার্তা আঞ্চলিক।
রাজ্যে বিজয়ের হাত ধরে রাখার পরেও রাহুলের ঐক্যের ডাকে কি সাড়া দেবেন স্ট্যালিন? বরফ কি গলবে? ডিএমকে-র ২২ জন সাংসদ রয়েছেন লোকসভায়। বিজেপির বিরোধিতা করতে গেলে তাঁদের ছাড়া এগোতে পারবে না কংগ্রেস। বিশেষত পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল এবং মহারাষ্ট্রে উদ্ধব সেনায় ভাঙনের পর রাহুলদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও দৃঢ় হয়েছে। তাই স্ট্যালিনের সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণে পরিবর্তন প্রয়োজন। রাহুল কী করেন, সেটাই দেখার।