ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়ে মায়ের কোলেপিঠেই মানুষ। বেড়ে ওঠেন দারিদ্রের সঙ্গে টানা লড়াই করে। হাইস্কুলের গন্ডি পেরনোর আগেই সংসারের ভার কাঁধে তুলে নেন। রোজগারের টানে নেমে পড়তে কাজে। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং ঠিকাদার হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। ক্রমশ আসেন ভোটের রাজনীতিতে। প্রথমে জেলা পরিষদ সদস্য, এখন বিধায়ক।
এটাই ৪৩ বছরের নিজামুদ্দিন চৌধুরীর সংক্ষিপ্ত জীবনলিপি। হাইলাকান্দি জেলার পাঁচগ্রামের বাসিন্দা তিনি। ওই এলাকাতেই রয়েছে উপত্যকার একমাত্র ভারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, কাছাড় কাগজ কল। সেখানে বাঁশ এবং কয়লা সরবরাহের মধ্যে দিয়েই জীবনের উত্থান। পরে পরিবহণ ব্যবসায়ও বরাক উপত্যকার পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন নিজামুউদ্দিন। সম্পদের সঙ্গে বাড়তে থাকে প্রভাব-প্রতিপত্তি। খুব ভাল খেলোয়াড় না হলেও উপত্যকার বিভিন্ন মাঠে ফুটবল দল নিয়ে গিয়েছেন। ‘নিজাম ভাইয়ের ফুটবল দল’-এর বেশ নামডাক রয়েছে এলাকায়।
নিজামুদ্দিনের পরিবারে রাজনীতি করার পরিবেশ কোনও দিনই ছিল না। ২০০৮ সালে আচমকা রাজনীতিতে নামার পরিকল্পনা নেন তিনি। প্রথমে সরাসরি নিজে মাঠে নামেননি। মা ফাতুন বিবি চৌধুরীকে জেলা পরিষদ নির্বাচনে পাঁচগ্রাম কালীনগর আসনে নির্দল প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করান। মা প্রার্থী হলেও কার্যত লড়েন ছেলে। তাই ফাতুন বিবির পরাজয়ে হারলেন আসলে নিজামুদ্দিনই। তিনি অবশ্য আজও হাইলাকান্দির রায় পরিবারের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে বলেন, ‘‘চক্রান্ত করে হারানো হয়েছিল আমার মাকে।’’ নিজামুদ্দিনের ভাষায়, ‘‘সমস্ত চক্রান্ত তখন মুখ বুজে সহ্য করেছি। অপেক্ষা করেছি সঠিক সময়ের।’’
২০১৩ সালে জেলা পরিষদের নির্বাচনে ওই একই আসনে তিনি নিজে নির্দল প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সে বার কংগ্রেস প্রার্থী জওহরলাল চক্রবর্তীকে পরাজিত করে জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে গৌতম রায়ের আহ্বানে কংগ্রেসে যোগ দেন। এ ভাবেই নিজামবাবুর রাজনীতির মূল স্রোতে তাঁর পা রাখা।
একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হওয়া সত্ত্বেও কেন রাজনীতিতে এলেন? উত্তর দিতে গিয়ে কিছুটা ভাবুক হয়ে যান আলগাপুরের বিধায়ক। পাঁচগ্রামের প্রাসাদসদৃশ অট্টালিকায় বসে বলেন, ‘‘সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আলগাপুর এক পশ্চাদপদ অঞ্চল। রাজনীতির নামে দীর্ঘদিন ধরে এখানে লুন্ঠন চলেছে। মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। হাইলাকান্দির রায় পরিবারের শাসনে কার্যত আলগাপুর মরুভূমি হয়ে গিয়েছিল। তাই মানুষের জন্য, নিজের এলাকার জন্য কিছু করার তাগিদে রাজনীতিতে আসি।’’ তাঁর কথায়, রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়া জনকল্যাণের কাজ করায় সমস্যা হয়। তাই গত বিধানসভা নির্বাচনে তিনি সরাসরি রায় পরিবারের বিরুদ্ধে আলগাপুরে ভোটযুদ্ধে নামেন। তবে তার আগে কংগ্রেস ছাড়েন। যোগ দেন বদরউদ্দিন আজমলের দলে। ত্রিমুখী লড়াইয়ে তিনি বিজেপি প্রার্থী কৌশিক রাইকে হারিয়ে বিধায়ক নির্বাচিত হন। গৌতম রায়ের পুত্র, কংগ্রেস প্রার্থী রাহুল রায় তিন নম্বর স্থান পান।
নিজামুদ্দিন বলেন, ‘‘আমি জানতাম, এই লড়াই আমার জন্য কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ হবে। এক দিকে রায় পরিবারের প্রতিনিধি। অন্য দিকে, প্রবল মোদী হাওয়া। তবু আমার মাকে অন্যায় ভাবে ভোটে হারানোর বিচার চেয়ে মানুষের কাছে ভোট ভিক্ষা করেছি। মানুষ আমাকে বিপুলভাবে জয়ী করেছেন।’’ তাঁর দাবি, ‘‘আমি সংগ্রাম করতে ভয় পাই না।’’ এই প্রসঙ্গে তিনি ২০০২ সালে ১৪দিন মিজোরামের জেলে থাকার কথা উল্লেখ করেন। বাঙালি নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে সে বার তাঁকে জেল খাটতে হয়েছিল।
এ ভাবে বিভিন্ন সময়ে অন্যায়ের প্রতিবাদ জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।
এখন বিধায়ক হিসেবে কী কী করতে চান? দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরেন আলগাপুরের বিধায়ক। বললেন, ‘‘যখন প্রার্থী ছিলাম অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এখন বিধায়ক। তাই আমাকে সে সব প্রতিশ্রুতি রূপায়ণে কাজ করতে হবে।’’ তাঁর কথায়, এলাকার গরিব মানুষের পাশে থেকে কাজ করবেন তিনি। তাঁর কাছে এসে কোনও মানুষ যাতে নিরাশ হয়ে না ফেরেন, সে দিকে তীক্ষ নজর তাঁর। আলাগাপুরে সমস্যা অনেক। পানীয় জল, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, বিদ্যালয়ের সমস্যা-সহ হাজারো মুশকিলের ঘেরাটোপে বন্দি এই বিধানসভা আসন। তাঁর কথায়, ‘‘আমাকে এই সব সমস্যার সমাধান করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হলেও এই এলাকায় কখনও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি। গভীর অন্ধকারে ডুবে আছে এই অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা।’’ সমস্ত সমস্যা কাটিয়ে উঠে আলগাপুর একদিন শহর হবে— এখন এই স্বপ্ন দেখেন নিজামুদ্দিন চৌধুরী।
ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিতে আসা নিজামবাবুর রাজনৈতিক গুরু কে—গৌতম রায় না বদরউদ্দিন আজমল? অনেকটা ঘুরিয়ে উত্তর দিলেন নতুন বিধায়ক। বললেন, গৌতম রায় আগাগোড়া একজন রাজনীতিক। আর বদরউদ্দিন আজমল প্রথমে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, পরে রাজনীতিক। দু’জনের ভাবনার ধরন, কাজের নমুনা সবই আলাদা। ‘গুরু’ শব্দটি সচেতনভাবে এড়িয়ে গিয়ে তিনি জানান, এআইইউডিএফ-এর বিধায়ক হিসেবে দল প্রধান অবশ্যই বদরউদ্দিন আজমল। তবে গৌতম রায়ের সঙ্গে যে এক সময় খুব ভাল সম্পর্ক ছিল, স্বীকার করেন তিনি।
কথা প্রসঙ্গে বিধায়ক বলেন, তিনি দুই মাঠে খেলেছেন—ফুটবলের মাঠ আর রাজনীতির মাঠ। দুই মাঠের খেলার মধ্যে ব্যবধান হচ্ছে ফুটবল মাঠে বল নিয়ে কারুকার্য দেখাতে হয়। গোল মিস করা কিংবা গোল খাওয়া খেলারই অঙ্গ। খেলতে গিয়ে কোনও ভুল হলে কারও কোনও ক্ষতির আশঙ্কা নেই। কিন্তু রাজনীতির মাঠে কোনও ভুল সিদ্ধান্ত নিলে মানুষের তা মানুষের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই তাঁর মতে, ফুটবল মাঠের চাইতে রাজনীতির মাঠের খেলা অনেক কঠিন। ব্যবসায়ী থেকে পঞ্চায়েত প্রতিনিধি হয়ে বিধায়ক, জীবনটাকে কী ভাবে উপভোগ করছেন? নিজামুদ্দিনের জবাব, ‘‘আজকাল আমার বাড়ি সাধারণ মানুষের দখলে চলে গিয়েছে। অনেক সময় বিছানাতেও কেউ কেউ উঁকি মেরে সমস্যার কথা বলে থাকেন। অবসর বলে আর কিছু নেই।’’