E-Paper

এ বারে কি ফিরবে করিমগঞ্জের শ্রী

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখনও টাটকা। দাসপট্টিতে কলাবাগানে আশ্রয় নেওয়া মা ও দুই মেয়ের উপরেই এসে পড়েছিল গোলা। সে দিনের বেঁচে থাকা পু্ত্রসন্তান এখন এ নিয়ে কথা বলতে চান না। তরুণী শিক্ষিকা অপর্ণা দেব তখন নারীশক্তি বাহিনীর প্রধান ছিলেন।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৫
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছেন অপর্ণা দেব ও মৃন্ময় রায়।

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করছেন অপর্ণা দেব ও মৃন্ময় রায়। — নিজস্ব চিত্র।

কুশিয়ারার জলে ঘাই মারল একটা শুশুক। পতাকা লাগিয়ে একই জল কেটে চলছে দুই দেশের নৌকোগুলো। ও পারে সিলেটের জকিগঞ্জ। এ-দিকের পাড়ে দাঁড়িয়ে মৃন্ময় রায়ের চোখে জীবন্ত হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি। কাছেই আদালত চত্বরের গায়ে ছিল মৃন্ময়দের ভিটে। পাশেই থাকত সাঁজোয়া গাড়ির বহর। মৃন্ময় আঙুল দিয়ে দেখান, ‘‘গোলাগুলি থামলে এখানেই রাবারের বোটের সারির উপরে পাটাতন পেতে ভারতীয় সেনার জিপ গিয়েছিল ও পারে। পরে কর্নেল দেবনাথ দাস আমাদের ও-পারে নিয়ে যান। জমির এক জায়গা দেখি শুকনো রক্তে কালচে হয়ে রয়েছে। মেজর চমনলাল যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছিলেন সেখানে। রক্তে রাঙা মাটি এ পারে এনে তৈরি হয় স্মারকসৌধ।’’

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এখনও টাটকা। দাসপট্টিতে কলাবাগানে আশ্রয় নেওয়া মা ও দুই মেয়ের উপরেই এসে পড়েছিল গোলা। সে দিনের বেঁচে থাকা পু্ত্রসন্তান এখন এ নিয়ে কথা বলতে চান না। তরুণী শিক্ষিকা অপর্ণা দেব তখন নারীশক্তি বাহিনীর প্রধান ছিলেন। এখন স্ট্রোকে মাথা কাজ করে না। তবু মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে চাইলেই, জ্বলে ওঠে চোখ। বলেন, ‘‘সব মনে আছে!’’

ইন্দিরা গান্ধী ১১ জুন ভাষণ দেন করিমগঞ্জে। মুক্তিবাহিনী তখন নিয়মিত অস্ত্র প্রশিক্ষণ পেত ভারতীয় সেনার কাছে। ত্রিগুণা সেনের উদ্যোগে ও আজাদ হিন্দের প্রাক্তন সেনাকর্তা কর্নেল দেবনাথ দাসের নেতৃত্বে তৈরি সিভিল ডিফেন্স বাহিনীকেও অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। শেখানো হয়েছিল ট্রেঞ্চ তৈরি, আত্মরক্ষার নানা কৌশল। মৃন্ময়ের দিব্যি মনে আছে, এলএমজি ধরার কায়দা আর .৩০৩ রাইফেল থেকে গুলি ছোঁড়ার ফারাক। রামকৃষ্ণ মিশনে তৈরি হত বাহিনীর জন্য নিমকি-ভুজিয়া, রেলকর্মীরা জওয়ানদের জন্য ফ্রি ক্যান্টিন বানিয়েছিলেন। মৃন্ময়ের আক্ষেপ, ’২৪-এর আন্দোলনে যখন মুজিবের মূর্তি ভাঙা চলছে, মনে পড়ছিল রেডিয়োয় মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেসে আসা তাঁর ভাষণ। বেগম রোকেয়াসহ প্রায় ৭৫ হাজার শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল করিমগঞ্জে।

এর পর অনেক জল গড়িয়েছে কুশিয়ারায়। এখন ক্ষোভের সঙ্গে ঘর করেন করিমগঞ্জের মানুষ। দীর্ঘদিন কংগ্রেস বিধায়ক থাকায় নাম বদলে শ্রীভূমি হয়েও শ্রী ফেরেনি রাস্তাঘাটের।

রবীন্দ্র সদন গার্লস কলেজের অধ্যক্ষ সব্যসাচী রায়ের মতে, বিজেপি কোনও ভাবেই করিমগঞ্জকে বাগে আনতে পারছিল না। জনবিন্যাস অন্যতম কারণ। তাই সীমানা পুনর্বিন্যাসে বরাকের ২টি আসন কমানোর পাশাপাশি করিমগঞ্জে কলকাঠি নাড়া হয়। বিভিন্ন তদন্তের ভয় দেখিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস বিধায়ক কমলাক্ষ দে পুরকায়স্থকে দলে টেনে কাটিগড়া থেকে দাঁড় করিয়েছেন। উত্তর করিমগঞ্জের এলাকা এখন দক্ষিণে ঢুকেছে। জিতলে মন্ত্রীও হতে পারেন কমলাক্ষ। তেমন হলে হয়তো উন্নয়নের ছাপ পড়বে এই এলাকায়। কিন্তু যে সব এলাকা সংখ্যালঘুপ্রধান থেকে যাবে, সেখানে কতটা উন্নয়ন হবে বলা যাচ্ছে না।

লিংক রোডের ঘরে এখন লেখালেখি করেই দিন কাটছেশিক্ষিকা সুমনা চৌধুরী রহমানের। ভোটার তালিকা সংশোধনে যে একজনই শতাধিকের নাম কাটতে আবেদন জমা দিচ্ছে, এমন ভোট চুরি তিনি ধরে ফেলায় অনেকের নাম ‘বেঁচে গিয়েছে’। কিন্তু সাসপেন্ড হয়েছেন সুমনা। তিনি বলেন, ‘‘চাকরির জন্য দুর্নীতির সঙ্গে আপস করব না। এখানে যেচক্রান্ত চলছিল, সেই মডেল সারা রাজ্য ও দেশেই চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’’

সুমনাদের গ্রাম সুতারকান্দির কাছে, বাস শহরে। অবিভক্ত সিলেটের ভূমিপুত্র তাঁরা। আবার মৃন্ময়দের বাসও অনেক আগে থেকেই। অথচ, দিসপুরের নেতারা সুবিধামতো, এখানকার মানুষকে বহিরাগত, বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেন। একাত্তরের যুদ্ধে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া ও সিভিল ডিফেন্সের স্বেচ্ছাসেবক এক প্রৌঢ় বলেন, ‘‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমরাও ঝাঁপিয়েছিলাম, দিনরাত এক করে কাজ করেছিলাম শরণার্থীদের সাহায্য করতে। কিন্তু কালক্রমে দিসপুরকেন্দ্রীক রাজনীতি আমাদেরই বাংলাদেশি বানিয়ে দিল!’’

শাহ আবদুল করিম, সৈয়দ মুজতবা আলি, সৈয়দ মুর্তাজা আলি, খালেদ চৌধুরীদের এলাকার মানুষকে আজ বাংলাদেশের অবস্থা যেমন হতাশ করে, নিজেদের গায়ে লাগা তকমাটা হতাশ করে তার চেয়েও বেশি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Assam Karimganj

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy