আমেরিকার ধনকুবের তথা যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের ফাইলে নরেন্দ্র মোদীর নাম এবং ঘুষ কেলেঙ্কারিতে মোদীর ঘনিষ্ঠ শিল্পপতি গৌতম আদানিকে আমেরিকার সমন— এই দুইয়ের চাপেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শর্ত মেনে বাণিজ্য চুক্তি করতে রাজি হয়েছেন বলে রাহুল গান্ধী আজ অভিযোগ তুললেন। তাঁর দাবি, ‘‘প্রধানমন্ত্রী ভয়ঙ্কর চাপে রয়েছেন। হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তির যে বেলুন ফোলানো হয়েছিল, তা ফেটে যেতে পারে। তাই তিনি আপস করে ফেলেছেন।’’ তিনি এ সব কথা সংসদে বলতে চাইছিলেন বুঝেই তাঁকে সংসদে বিতর্কে বলতে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে রাহুলের অভিযোগ।
গত কাল রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা নিয়ে বিতর্কে রাহুল প্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নরবণের ‘অপ্রকাশিত বই’ তুলে ধরে অভিযোগ করেন, ২০২০ সালে পূর্ব লাদাখে চিনের সেনা ট্যাঙ্ক নিয়ে কৈলাস রেঞ্জের দিকে এগোচ্ছিল। সেনাপ্রধান তা জানানোর পরেও প্রধানমন্ত্রী কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এরপরেই রাজনাথ সিংহ, অমিত শাহরা রাহুলকে বাধা দেন। রাহুল অনড় থাকায় অধিবেশন ভন্ডুলহয়ে যায়।
লোকসভায় রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা নিয়ে আজ দুপুরে আলোচনা শুরুর পরে রাহুল ফের নবরণের অপ্রকাশিত বইয়ের উল্লেখ করেন। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত ওই বইয়ের বিশেষ অংশ যাচাই করে তিনি সত্য বলছেন বলে রাহুল শংসাপত্রও জমা দেন। লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা তাঁর চেয়ারে ছিলেন না। তেলুগু দেশমের কৃষ্ণ প্রসাদ টেনেটি সভাপতিত্ব করছিলেন। তিনি আপত্তি তোলেন। তাঁর সঙ্গে রাহুল ও অন্য কংগ্রেস সাংসদদের তর্কাতর্কি হয়। রাহুল রাষ্ট্রপতির বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলছেন না বলে তাঁর বক্তৃতা থামিয়ে কৃষ্ণ প্রসাদ একে একে সপা, ডিএমকে সাংসদদের নাম ডাকেন। ডাকেন তৃণমূলের শতাব্দী রায়কে। শতাব্দী স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তিনি বলবেন না। কৃষ্ণ প্রসাদ তখন এনডিএ সাংসদদের বলতে ডাকেন।
রাহুলকে বলতে না দেওয়ায় কংগ্রেস, তৃণমূল, সিপিএম-সহ বিরোধী সাংসদরা দল বেঁধে ওয়েলে নেমে পড়েন। অনেকে লোকসভার সেক্রেটারি জেনারেলের টেবিলের পাশে উঠে পড়েন, স্পিকারের চেয়ারের সামনে গিয়ে কাগজ ছিঁড়ে উড়িয়ে দেন।অধিবেশন মুলতুবি হয়ে যায়। এক ঘণ্টা পরে অধিবেশন শুরু হলে কংগ্রেসের মানিকম টেগোর-সহ সাত কংগ্রেসি সাংসদ, সিপিএমের এস বেঙ্কটেশনকে সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়। তাঁরা সংসদ ভবনের সিঁড়িতে ধর্নায় বসে পড়েন। সেখানেও যোগ দেন শতাব্দী। লোকসভার অধিবেশন সারা দিনের জন্য মুলতুবি হয়ে যায়।
রাহুলের অভিযোগ, চিন ও জেনারেল নরবণের বইয়ের প্রসঙ্গ নিছক বাহানা। আসলে তিনি এপস্টিন ফাইলস এবং তার চাপে নরেন্দ্র মোদীর বাণিজ্য চুক্তিতে রাজি হয়ে যাওয়া নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তুলবেন বুঝেই বিজেপি বাধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘জেনারেল নরবণের বিবৃতি আসল বিষয় নয়। সেটা উনি জানেন। আমিও জানি। আসল কথা হল, প্রধানমন্ত্রীকে আপস করানো হয়েছে।’’
আমেরিকার ধনকুবের ও যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিনের সঙ্গে বিশ্বের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগাযোগ ছিল। সেই সংক্রান্ত কিছু ফাইল সম্প্রতি আমেরিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তার একটি ফাইলে নরেন্দ্র মোদীর উল্লেখ রয়েছে। এপস্টিন ২০১৭-র ৯ জুলাই একটি ই-মেলে লিখেছিলেন, ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী পরামর্শ নিয়েছেন। ইজরায়েলে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের লাভের জন্য নাচগান করেছেন। ওঁদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে। তাতে কাজ হয়েছে।’’ ওই বছরের ৪-৬ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর ইজরায়েল সফর নিয়ে এই ই-মেল বলে মনে করা হচ্ছে। বিদেশ মন্ত্রক এ সব ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল। রাহুলের দাবি, ‘‘এক দিকে নরেন্দ্র মোদীর আর্থিক কাঠামো, অন্য দিকে তাঁর ভাবমূর্তি, এই দুই চাপে প্রধানমন্ত্রী আতঙ্কিত। যারা ওঁর ভাবমূর্তি তৈরি করেছিল, তারাই এখন সেই ভাবমূর্তি ভাঙতে শুরু করেছে।’’
শাসক শিবিরের এ দিনের সিদ্ধান্তের ফলে বিরোধী শিবির এককাট্টা। তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে বলতে দিতেই হবে। এ বিষয়ে গোটা বিরোধী শিবির এক মেরুতে।’’ রাহুল সন্ধ্যায় লোকসভার স্পিকারকে চিঠি লিখে অভিযোগ জানিয়েছেন, ‘সংসদের ইতিহাসে এই প্রথম, সরকারের চাপে, স্পিকারকে বাধ্য করা হল তিনি যাতে বিরোধী দলনেতাকে রাষ্ট্রপতির বক্তৃতায় বলতে বাধা দেন। এটা গণতন্ত্রে কালো ছাপ। তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’ কেন্দ্রীয় বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গয়ালের পাল্টা দাবি, ‘‘রাহুল গান্ধী আবোল-তাবোল অভিযোগ তুলছেন। তাঁর সঙ্গে তৃণমূল, সমাজবাদী পার্টি ডিএমকে যোগ দিয়েছে। তাঁরা নেতিবাচক রাজনীতি করছেন।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)